‘থাকি না, মন্দ তো লাগছে না। তোমার কেমন লাগছে?’
‘মন্দ তো লাগছে না।’ বাসন্তী চোখ ফিরিয়ে এনে তাকাল এবং হাসল কানের উপর থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে।
এরপর আর তাদের কথা হয়নি। চৌরঙ্গিতে সুরেন ব্যানার্জি রোডের মোড়ে বাসন্তী নেমে যাবার সময় বলল, ‘আবার কবে দেখা হবে কে জানে।’
ট্যাক্সি এগিয়ে গিয়ে ঘুরল বউবাজারে যাবার জন্য। ফেরার সময় ব্রতীন দেখল অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জটলার মধ্যে বাসন্তী হাতব্যাগটা বুকের কাছে ধরে দাঁড়িয়ে পরনে সবুজ খোলে খয়েরি বরফিকাটা নকশার তাঁতের শাড়ি। বাসন্তীকে সেই তার শেষবারের মতো দেখে নেওয়া।
স্নান করে এসে ব্রতীন খাটে শুয়ে পড়ল, পরনে পাজামা পাঞ্জাবি। কমলের মা জানতে এসেছিল ভাত খাবে কি না, ঢাকা দেওয়া আছে খেলে গরম করে দেবে। সন্ধ্যাবেলায় ভাত খাওয়ার মতো খিদে তার হয়নি। গুণোর সঙ্গে যে খেতে যাবে তা ঠিক করা ছিল না। গুণেন্দ্রর কথা মনে পড়তে সে মুখ ফিরিয়ে টেবলে রাখা চশমাটা আর চাবিটাকে দেখে নিল। ও দুটো দেখে তার মলিকে অর্থাৎ নিমিকে মনে পড়ল সেই সঙ্গে বুড়িকেও। বুড়ি বেশিদিন বাঁচবে না। অভাব নিয়ে ওইরকম বস্তির ঘরে থেকে ওর রুগণ শরীর যক্ষ্মাকে ঠেকাতে পারবে না। তখন মেয়েটার কী হবে? তারও তো স্বাস্থ্য বলে কিছু নেই। যে ব্যবসা শুরু করেছে তাতে যে কোনোদিনই এইডস ওকে ধরতে পারে। মারা গেলে বেঁচে যাবে মা আর মেয়ে দুজনেই। জীবনকে দেওয়ার মতো কোনো পুঁজিই তো ওদের নেই।
চিন্তাটা বিষণ্ণতার দিকে চলে যাচ্ছে, ব্রতীন অস্বচ্ছন্দ বোধ করল। একটা বই পেলে ভালো হত। আলমারিতে কিছু পুরনো বাংলা বই এখনও সাজানো রয়েছে। ব্রতীন উঠে গিয়ে কাচের পাল্লা খুলে বইগুলো সাবধানে নাড়ল। মলাটগুলো ঢিলে, পাতাগুলো ভিজেভিজে, জোড়া লেগে কালো ছ্যাতলা পড়েছে, বিন্দু বিন্দু ফুটো পোকায় কাটার জন্য। একটা বই দেখে সে চমকে উঠল : ‘বাগদি ডাকাত!’ ক্যালেন্ডারের মোটা কাগজের মলাট। মা-র কাজ। মলাটে মোটা অক্ষরের লাল কালি দিয়ে বইয়ের নাম লেখা। এটা সেই পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কেনা, মা ছোঁ মেরে বইটা নিয়ে বলেছিল, ‘আমি আগে পড়ব, সেই কবে পড়েছিলুম।’
সেই কবে পড়েছিলুম, ব্রতীন মনে মনে আওড়াল অনসূয়ার কথাগুলো। বইটা খুলেই চোখ পড়ল ছয়ের অধ্যায়ে। পড়তে শুরু করল দাঁড়িয়েই :
‘ঘোর বন। গাঢ় অন্ধকার। নাগিনী উচ্ছ্বাসে ফুলে উঠেছিল। এখন তার দেহ একটু একটু করে কমে আসছে। কিন্তু স্রোতের বেগ তখনও প্রখর, সেই স্রোতধারা ধরে একখান নৌকা দক্ষিণ দিকে ছুটে চলেছে।
‘তার আরোহীরা সকলেই নীরব, তীরের এক জায়গা থেকে হঠাৎ ঘোর ঘর্ঘর শব্দ হতে লাগল। মনে হল, রাত্রির সেই পাথরের মতো জমাট অন্ধকার ও নিস্তব্ধতাকে কে যেন খুব মোটা দাঁতওয়ালা বিষম ভারী করাত দিয়ে চিরছে। এক একবার প্রচণ্ড জোরে তার গায়ে আঘাত করছে; সেই সময় শব্দ হচ্ছে-‘হুম-হুম’। তবুও সেই অন্ধকারের একটি কণাও খসে পড়ছে না।’
তিরিশ-বত্রিশ বছর আগে পড়তে পড়তে যেমন শরীর ছমছম করেছিল, এখন আবার সেই অনুভূতি সে পেল। বই হাতে নিয়ে সে খাটে এসে বসল। একটা বালিশ টেনে নিয়ে বগলের নীচে রেখে কাত হয়ে পড়ল। এগারোটা পাতা পড়া হয়েছে তখন সিঁড়িতে পায়ের শব্দ আর দেবীর গলা শুনতে পেল, ‘কমলের মা, বড়দা ফিরেছে?’ উত্তরটা সে শুনল, ‘অনেকক্ষণ!’ দেবী এবার তার সঙ্গে কথা বলতে আসবে। ব্রতীন বইটা বন্ধ করে হাসিমুখে দরজার পরদার দিকে তাকিয়ে রইল। পরদা সরিয়ে ঢুকল দেবী। মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে বলল ‘এসো বাসুদি, আছে।’
বাসন্তী পরদা সরাল। বছর পনেরো আগে ট্যাক্সি থেকে শেষ দেখার পর বাসুকে সে আবার দেখছে। ব্রতীন উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুটে বলল, ‘আরে বাসু!’ তারা প্রায় অপরিচিতের মতো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল।
ভোরের প্রথম আলোয় ধীরে ধীরে চরাচর স্বচ্ছ হয়ে ওঠার মতো ব্রতীনের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। কত বছর পর দেখা! গত দশবছরে চারবার সে কলকাতায় এসেছে, শেষ এসেছে তিনবছর আগে। একবারও বাসুর সঙ্গে তার দেখা হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। কী বলবে ভেবে না পেয়ে ব্রতীন আচমকা বলে উঠল, ‘তোমার চুলে পাক ধরেছে বাসু, এর মধ্যেই!’
প্রশ্ন এবং বিস্ময় জড়ানো রয়েছে কথাটায়। বাসন্তী উত্তর দেবার দায় এড়িয়ে বলল, ‘আমি জানতুম প্রথমেই চুলের দিকে চোখ পড়বে, প্রত্যেকেই ওই এককথা বলে, এর মধ্যেই চুল পাকিয়ে ফেললে? যেন ইচ্ছে করে আমি পাকিয়েছি, বয়স হলে চুল তো পাকবেই।’
দেবী বলল, ‘কই বড়দার তো পাকেনি। তোমরা তো একবয়সি।’
‘পেকেছে কী পাকেনি তুই জানিস?’ বাসন্তী চোখ বড়ো করে তাকাল দেবীর দিকে। ‘কত রকমের কলপ এখন বাজারে কিনতে পাওয়া যায়, ছোড়দা হবার জন্য বড়দারা এখন চুলে লাগাচ্ছে।’
ব্রতীনের একটু অবাক লাগল বাসন্তীর কথায় এবং কথা বলার ঢঙে। কেমন যেন প্রগলভের মতো লাগছে। কখনো তো দুটোর বেশি তিনটে কথা বলত না আর সেজন্যই সে বাসুর সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহ পেত না। কালো মাথায় কয়েকটা রুপোলি চুল বেশ ভালোই লাগছে ব্রতীনের। মেয়েদের থেকে ছেলেদের চুল আগেই পাকে। তার কাছাকাছি বয়সি কোনো মেয়ের মাথায় পাকাচুল সে এখনও অন্তত দেখেনি।
