গোলাপবাগান থেকে ফিরে ব্রতীন তিনতলায় গেল তার ঘরের চাবি চাইতে। সকালে বেরোবার সময় ঘরে তালা দিয়ে চাবিটা রেখে গেছল দেবীর কাছে। দিনরাতের কাজের লোক কমলের মা তাকে চাবি দিয়ে বলল, ‘দিদিমণি এই মাত্তর বেরোল। পাশের মল্লিকদের বাড়িতে গেছে ওদের বড়ো মেয়ে এসেছে।’
বড়ো মেয়ে মানে বাসন্তী। কত বছর ওকে দেখেনি মনে করার চেষ্টা করল ব্রতীন স্নান করার সময়। সন্ধেবেলায় স্নান না করলে রাতে ঘুম আসে না। অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে এম এ পাশ করে বাসন্তী বেলেঘাটায় একটা স্কুলে পড়াত, মাসকয়েক পরে ব্রতীন শোনে বাসু বর্ধমানে একটা কলেজে পড়াচ্ছে কলকাতা থেকে যাতায়াত করে। মুম্বইয়ে থাকার সময় শোনে বাসুর বিয়ে হয়েছে এক ডবলু বি সি এস-এর সঙ্গে। তারপর শোনে বাসু কলকাতার উইমেনস কলেজে পড়াচ্ছে। বছর পনেরো আগে ওকে শেষ দেখেছে বাসস্টপে তখন বাসুর বিয়ে হয়ে গেছে। ব্রতীন আগেই বাসস্টপে অপেক্ষা করছিল, ভিড় দেখে সে একটা বাস ছেড়ে দেয়। বাসু আসে তারপর। তাকে দেখে যথারীতি বাসু হাসে, একটু দূরে দাঁড়ায়। ব্রতীন এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘কোথায়?’
‘শ্বশুরবাড়ি, সরকার হাটে।’
‘সেটা আবার কোথায়?’
বাসু হেসে ফেলে। ওর গজদাঁত আর বাঁ গালের টোল দেখতে ব্রতীনের বরাবরই ভালো লাগে। সেদিন আরও ভালো লাগল। বাসু আর আগের মতো রোগা নেই। ব্লাউজের চাপে ঘাড়ের মাংস ফুলে রয়েছে, কোমরে চর্বির ভাঁজ হালকাভাবে পড়েছে। গায়ের রং উজ্জ্বল হয়ে সোনার মতো, নিতম্ব ভারী হয়েছে। বাসুকে বেশ সুন্দর আর সুখী মনে হয়েছিল ব্রতীনের। বিবাহ সুখের হলে মেয়েদের রূপ খুলে যায় বলে সে শুনেছে, বাসু তার জ্যান্ত নির্দশন।
‘সবাই বলে সেটা আবার কোথায়। সবাইকে উত্তর দিতে দিতে মুখ ব্যথা হয়ে গেছে। সরকার হাট হল বেহালা ছাড়িয়ে ঠাকুরপুকুরেরও দক্ষিণে একটা জায়গা, নতুন বসত হচ্ছে।’
‘কর্তা শুনেছি সরকারি অফিসার, কোথায়?’
‘স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে।’
‘এখনও কলেজে পড়াচ্ছ?’
‘হ্যাঁ, তবে ছাড়ব। কলকাতা-বর্ধমান যাতায়াত আর পারছি না। ছেলেকে যে সময় দেব তারও সময় আর পাচ্ছি না।’
‘ছেলের বয়স কত?’
‘দু বছর।
‘এখান থেকে বেহালার দিকে টানা কোনো বাস যায় না, তোমাকে নিশ্চয় এসপ্ল্যানেডে বাস বদলাতে হবে।’ ব্রতীন হাত তুলে একটা খালি ট্যাক্সি থামাল। ‘আমি গোলপার্ক যাব, চলো তোমাকে নামিয়ে দেব।’
ব্রতীন যাবে বউবাজার ছোটোমাসির বাড়ি মাকে আনতে। কাল থেকে অনসূয়া ছোটোবোনের বাড়িতে রয়েছেন। ‘গোলপার্ক যাব’ এই মিথ্যা কথাটি কেন বলল, তাই নিয়ে ব্রতীনের তখন চিন্তা করার অবকাশ ছিল না। ব্রতীনের ডাক শুনে বাসন্তী দ্বিরুক্তি না করে ট্যাক্সিতে উঠে পড়ল।
‘এই পাতাল রেলের কাজ যে কবে শেষ হবে। সাত-আট বছর আগে দেখেছি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে আজও চলছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখো।’ জানলা দিয়ে ব্রতীন বাইরের দিকে তাকাল।
‘এটা হলে খুব সুবিধে হবে।’ ছোট্ট মন্তব্য করে বাসন্তী কী যেন ভাবতে শুরু করল। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে ট্যাক্সিটা ঝাঁকুনি দিতে দিতে মন্থর গতিতে চলেছে। জানলা দিয়ে মুখ বার করে ব্রতীন দেখছে রাস্তার মাঝে গর্ত করে লোহার বিম দিয়ে খাঁচার মতো কাঠামো বানানো, তার উপর কংক্রিটের ছাদ হবে। কিছু পরেই রাস্তা খোঁড়ার কাজ চলছে। উটের মতো গলা নামিয়ে রাস্তা ঠোকরাচ্ছে যন্ত্রচালিত মোটা শাবল। লোকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখছে। রাস্তার ভাঙা টুকরো কুড়িয়ে যন্ত্রই ঢেলে দিচ্ছে লরিতে। লরি চলে যাচ্ছে ফেলে দিয়ে আসতে। কোথায় ফেলছে? ব্রতীন মনে মনে ফেলার জায়গাটা খুঁজতে লাগল।
‘তুমি এখনও বিয়ে করোনি? কবে আর করবে?’
অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন! এটা প্রশ্ন না কৌতূহল? দরকার কী এমন কৌতূহলের। দুটো প্রশ্ন একসঙ্গে করেছে, ‘করোনি?’ আর ‘কবে করবে?’ প্রথমটার উত্তর জেনেই দ্বিতীয়টা করেছে। ব্রতীন হাসল।
‘না এখনও করিনি।’ এবার সে তৃতীয় প্রশ্নটা আশা করল, ‘কেন করোনি?’
‘করার মতো মেয়ে এখনও পেলে না?’
ব্রতীন চুপ করে রইল। বাসন্তী আড়চোখে তার মুখ লক্ষ করে নিল তা সে বুঝতে পারল।
‘ঠিকই বলেছ।’
‘মিশুকে হলে পেয়ে যেতে।’
‘আমি মিশুকে নই তোমায় কে বলল?’ ব্রতীন তাকাল ওর মুখের দিকে। বাসন্তী জানলার দিকে মুখ ফেরাল, ঠোঁটের কোণ টিপে থাকায় গালে টোল পড়েছে।
‘কেউ বলেনি। আমি জানি।’
‘কবে জানলে?’
‘অনেক দিন।’ বাসন্তী জানলার বাইরে মগ্ন হওয়ার চেষ্টা করল।
কতদিন? ব্রতীন বছরগুলো ঠেলেঠেলে পিছিয়ে গিয়ে আটকে গেল একতলার পড়ার ঘরে। দুজনের মাঝখানে উমাপদবাবু একাগ্রমনে টেবলে ঝুঁকে এগারোর উপপাদ্য তাকে বোঝাচ্ছেন। বাসন্তী উমাপদবাবুর পিঠের উপর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে, মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি, বাড়ি যাবার জন্য বই খাতা গুছিয়ে বাসন্তী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। সন্তর্পণে সে চোখ তুলল, পলকের জন্য চোখাচোখি। হ্যাঁ, অনেকদিন আগে তো বটেই। সে কোনোদিনই মিশুকে হতে পারেনি। পারলে কী হত?
‘তুমিও তো মিশুকে নও।’ কথাটা বলে ব্রতীনের মনে হল এটা কোনো মন্তব্য নয়, অভিযোগের মতো তার নিজের কানেই শোনাল।
‘জেঠিমাকে বলব তোমার জন্য মেয়ে দেখতে নইলে চিরকাল আইবুড়োই থেকে যাবে।’
