‘আপনি এখন কী করেন? ক-টি ছেলেমেয়ে?’
ব্রতীন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিল। হাসি চেপে বলল, ‘বোম্বাইয়ে কুড়ি বছর আছি। ওখানে একটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করি। ছেলেমেয়ে নেই, বিয়েই করিনি। সংসারে শুধু মা।’
বুড়ি অবাক হয়ে বলল, ‘বিয়ে করেননি, কেন!’
প্রশ্ন নয় বিস্ময়। চাকরি করে অথচ বিয়ে করেনি এমন পুরুষ মানুষ পৃথিবীতে থাকতে পারে? বুড়ি যেন এই প্রথম এমন একটা লোককে দেখছে। নিমিও অবাক হয়ে তাকিয়ে। এতক্ষণ সে ওদের কথা শুনে যাচ্ছিল চুপ করে, এইবার বলল, ‘বললেন তিনটে মেয়ের সঙ্গে আলাপ আছে!’
‘আলাপ থাকলেই কি সেটা প্রেম? তিনজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। ওদের স্বামীরা আমার বন্ধু। আর বিয়ে করিনি কেন? করতেই হবে এমন কোনো মাথার দিব্যি আছে কি? আসলে আমি ঝাড়া হাতপায়ে থাকতে ভালোবাসি। বিয়ে মানেই তো নানান ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়া।’
বুড়ি বলল, ‘মা বলে না বিয়ে করার জন্য?’
‘বলত। বলে বলে হাল ছেড়ে দিয়েছে। যাই হোক নিমি কাল তুমি অবশ্যই এক্সরে করে এখানকার কোনো ডাক্তারকে দেখাবে। আর ওই জুতো জোড়া কখনো পরবে না।’ ব্রতীন উঠে দাঁড়াল।
‘চললেন?’
এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বুড়ি বলল কথাটা। ব্রতীন ওর চোখে আর হাসি দেখতে পেল না। সে নিমির মাথায় চুল নাড়িয়ে এলোমেলো করে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল, এখানে থাকার আর কোনো আগ্রহ তার নেই, কৌতূহল মিটে গেছে। বস্তি থেকে রাস্তায় পা দিয়েই তার মনে হল বুড়ির ভালো নামটা তো জানা হল না! পর মুহূর্তেই সে নিজেকে বলল, জানার দরকার কী, জীবনে আর তো দেখা হবে না। সে হাতঘড়িতে সময় দেখল এখান থেকে বাড়ি যেতে কত মিনিট লাগবে? স্কুলে পড়ার সময় তার ঘড়ি ছিল না, কলেজে ভরতি হতে মা দিয়েছিল বাবার দামি রোলেক্স ঘড়িটা, সেটা এখন তোলা আছে।
জোরে হেঁটে ব্রতীনের বাড়ি পৌঁছতে ছ-মিনিট লাগল। দোতলাটা তাদের অংশের, তিনতলাটা কাকার। মেয়ে দেবীকে নিয়ে থাকেন বিপত্নীক ক্ষীরোদপ্রসাদ, বয়স উনসত্তর, মেয়ে দেবী ছাড়া আছে এক ছেলে শিবপ্রসাদ, সে থাকে শিলিগুড়িতে। রায়চৌধুরী পরিবারের তিনটি কয়লার খনি ছিল ঝরিয়ায়।
সেগুলো সরকারের হাতে চলে যাবার পর ক্ষীরোদপ্রসাদ যে টাকা খেসারত হিসাবে তাঁর ভাগে পেয়েছিলেন তাই দিয়ে শিলিগুড়িতে হোটেলের ব্যবসায়ে নামেন। বগলাপ্রসাদ তখন মৃত। অনসূয়া তার নাবালক ছেলে ব্রতীনকে লেখাপড়ার দিকে এগিয়ে দেবার জন্য বিষয়-সম্পত্তির বোঝা আর বাড়াতে চাননি, শ্বশুরবাড়ির দোতলায় বড়ো তিনটি ঘর আর বারান্দা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন।
ক্ষীরোদপ্রসাদের প্রগাঢ় ইচ্ছা ছিল সপ্রতিভ, সুদর্শন, বলিয়ে কইয়ে ইংরাজি নবিশ, ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবার। জামাই যেন পাঁচজনকে বলার মতো জামাই হয়। সল্ট লেকে যে জমিটি কিনেছিলেন সেখানে একতলা একটি বাড়ি করে দিয়ে এবং শিলিগুড়ির হোটেলের স্বত্ব লিখে দিয়ে তিনি শিবপ্রসাদকে পরিবার থেকে আগেই আলাদা করে দিয়েছেন। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে শিবপ্রসাদের পরিচয় ‘হোটেলওয়ালা শিবু’, সে কোনোক্রমে বি এ পাস কিন্তু ব্যবসায়ে সফল, দার্জিলিংয়ে একটি পুরনো হোটেল কেনার কথাবার্তা পাকা করতে এখন কলকাতায় এসেছে। ক্ষীরোদপ্রসাদের বাসনা তাঁর ছেলে পূরণ করতে পারেনি, শিবু ধুতি-পাঞ্জাবি থেকে জিনসে উত্তীর্ণ হওয়ায় চূড়ান্ত ব্যর্থ, ইংরেজিতে দ্রুত বাক্যালাপ একদমই পারে না ভগবতীচরণ আর্য বিদ্যালয়ের এই ছাত্রটি।
পৈতৃক বাড়ির নিজের অংশ ক্ষীরোদপ্রসাদ ইচ্ছাপত্র মারফত দেবীকে দান করে রেখেছেন এবং অন্যান্য অস্থাবর জিনিস ও নগদ কয়েক লক্ষ টাকা। দেবীকে সব কিছু দিয়ে যান তার বিবাহ বিচ্ছেদের পর এবং শিবপ্রসাদের অনুরোধে। শিবু কখনো উঁচু গলায় বাবার সঙ্গে কথা বলেনি, তর্ক করা তো দূরের কথা। একবারই শুধু রেগে উঠে বলেছিল, ‘শখ মিটেছে তো! উচ্চচশিক্ষিত ফরফর করে ইংরিজি বলিয়ে জামাই করার শখ মিটেছে তো! তোমার জন্যই দেবীর আজ এই অবস্থা। না দেখেশুনে শুধু মুখের কথা শুনেই বিয়েটা দিলে। একবার খোঁজখবরও নিলে না ছেলেটার চরিত্র কেমন। হাজার হাজার মাইল দূরে কোথায় ন্যাশভিল ফিস্ক ইউনিভার্সিটি আর কোথায় কলকাতা। ওর ভবিষ্যৎ কী হবে সেটাই এখন ভাবো। কোথায় থাকবে, কী খাবে!’
ক্ষীরোদপ্রসাদ মুখ নীচু করে শুনে যাচ্ছিলেন। শুকনো গলায় বলেছিলেন, ‘তুই দেখবি তোর বোনকে।’
শিবপ্রসাদ বলে, ‘তাই দেখব। নাগদ যা টাকাকড়ি আছে আর এই বাড়ি ওকে দিয়ে দাও, কালই উকিলের কাছে যাও, আমার কিছু চাই না। উইলের সাক্ষী আমি হব।’
অবাক হয়ে ক্ষীরোদপ্রসাদ বলেন, ‘তোর কিছুই চাই না!’
‘না চাই না। আমি যা পেয়েছি তাই দিয়ে আমার চলে যাবে। যদি পুরুষমানুষ হই তাহলে এই জীবনেই এর বিশ গুণ বাড়াব কিন্তু দেবী তো তা পারবে না। ও বহু বছর বাঁচবে, ওর কথা ভাবো।’
ব্রতীন এসব কথা পরে কাকার মুখে শুনেছিল। এরপর থেকে শিবুকে সে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। গতদিন সন্ধ্যায় শিবু এসেছিল বাবার সঙ্গে দেখা করতে বউকে নিয়ে। বহু বছর পর শিবুর সঙ্গে তার দেখা হল। শিবুর সল্ট লেকের একতলা বাড়ি এখন দোতলা। শিলিগুড়ি থেকে এলে তারা দোতলায় থাকে। একতলাটা ভাড়া দিয়েছে ব্রতীনের বন্ধুর ভাই সলিলকে। রবিবার শিবুর বউ দুপুরে সল্ট লেকের ফ্ল্যাটে খেতে বলেছে ননদ ও ভাসুরকে।
