কিন্তু মুখখানি!
ব্রতীন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই তো সেই বুড়ি। তিরিশ বছর আগে যাকে একটুখানির জন্য বারান্দায় দেখতে পাবে বলে আশু দেব লেনের মোড়টা ঘুরত শ্বাসবন্ধ করে। দেখতে পেলেই মনে হত এক হাজার গোলাপ বুকের মধ্যে ফুটে উঠল। শরীর যেমনই হোক মুখের সেই আদল চোখের সেই চাহনি এখনও রয়ে গেছে।
‘কোথায় পা ভাঙল? দেখো দিকি কী মুশকিলে ফেললি। এনাকে কোথায় পেলি?’
‘আমাদের পার্লারে। উনি সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন আমি নামছি। সিঁড়িতে জল ছিল হড়কে পড়ে গেলুম। উনি তুলে ধরে ডাক্তারখানায় নিয়ে গেলেন, ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিল। তারপর উনি ট্যাক্সি করে নিয়ে এলেন।’
ব্রতীন অবাক হয়ে নিমির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী নির্বিকার মুখে বানিয়ে বলল! এবার সে বুঝতে পারল মেয়েটা তাকে যা বলেছে, বাবা, ভাইবোন, দিদি, বিরাটিতে বাড়ি, গোলাপবাগানের মাসি, সবই মিথ্যে এমনকী নিজের নামটাও। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছে কি না বিশ্বাস হচ্ছে না। ওকে নিমি বলে ডাকল দুজন, এটাই ওর আসল নাম। তবে পার্লারে কী কাজ করে সেটা ওর মা বোধহয় জানে না।
‘আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।’ মলির মা তক্তাপোশে হাত বুলিয়ে বলল।
ময়লা নীল চাদরে ঢাকা পাতলা তোশকটার চিটচিটে কালো একটা কোণ বেরিয়ে। ব্রতীন ইতস্তত করে নিমির পাশে বসল। এই মানুষটাই তিরিশ বছর আগের সেই মেয়েটি কি না জানার কৌতূহল প্রবলভাবে তাকে পেয়ে বসেছে। যদি সঠিক হয় তা হলে আজও কি ওর মনে আছে মাথায় ছোলা ছুড়ত, একদিন একটা পাকানো কাগজও ছুড়েছিল।
‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব, আপনি কি কোনোদিন আশু দেব লেনে থাকতেন?’
কয়েক সেকেন্ড ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নিমির মা বলল, ‘কেন বলুন তো? হ্যাঁ থাকতুম। আমার বাপের বাড়ি সতেরোর চার আশু দেব লেন।’
‘দোতলায় একটা বারান্দা ছিল, একটা চন্দনা পাখি ছিল।’
উজ্জ্বল হয়ে উঠল নিমির মা-র চোখ। গলার কণ্ঠা ওঠানামা করল। ‘আপনি কী ও-পাড়ায় থাকতেন?’
‘না, ও-পাড়া দিয়ে স্কুলে যেতাম। তখন দেখেছি পাখিটাকে ছোলা খাওয়াতেন।’
ব্রতীন দেখল তিরিশ বছরের ওপার থেকে ভেসে আসছে স্মৃতি নিমির মা-র দুটি চোখে। মনে করার চেষ্টা করছে। তিরিশ বছর এমন কিছু বেশি সময় নয়। হেসে ফেলল। এবার মনে পড়ে গেছে। ব্রতীনও হাসতে শুরু করল।
‘মনে পড়েছে? আপনার নাম তো বুড়ি, তাই না?’
‘হ্যাঁ।’
‘নামটা আজই জানলুম। সকালে ও-পাড়ায় গেছলুম, একটা লোককে জিজ্ঞেস করতেই বলল, বুড়ি? সে তো গোলাপবাগান বস্তির একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে। নিমির মুখের সঙ্গে আপনার মুখের ভীষণ মিল, ওকে দেখেই আপনার কথা মনে পড়ে, তারপর ও যখন বলল গোলাপবাগান যাবে তখন কেন জানি মনে হল, আচ্ছা একবার গিয়ে দেখি তো সেই মেয়েটিই কি না। তা হলে আমাকে মনে পড়েছে?’
বুড়ি মাথাটা বাঁদিকে অনেকখানি হেলিয়ে দিল। নিমির চোখে বোকার মতো চাহনি। সে ওদের দুজনের মুখের দিকে পালটাপালটি তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করল। একটা ব্যাপার বুঝেছে এই লোকটা যখন স্কুলে পড়ত তখন মাকে চিনত।
‘তখন বয়স অনেক কম ছিল, বুঝতুম না অনেক কিছুই।’ বুড়ির স্বর নদীর ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া সান্ধ্য বাতাসের মতো। স্মৃতির কণাভরা, স্নিগ্ধ তাপজুড়ানো। ওর চোখ দেখে ব্রতীন অনুমান করল, একে একে ছবির মতো অতীত দিনগুলো আঁকা হয়ে যাচ্ছে মনের পটে।
‘কম বয়সটা তো সেই জন্যই, না বুঝে অনেক কিছু করে ফেলা যায়। আর যায় বলেই কম বয়সটা চিরদিন কমই থেকে যায়।’ ব্রতীন কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়াল।
‘চললেন?’
বুড়ির গলার স্বরে কী যেন রয়েছে। ব্রতীন ‘হ্যাঁ’ বলতে গিয়েও পারল না। বুড়ির চাহনিতে চাপা হাসির ছটা, যেন জানত ব্রতীন যাবে না এবং গেল না বলেই চোখদুটি হেসে উঠল। তারা প্রায় সমবয়সি কিন্তু অভিজ্ঞতায় অসম স্তরে। তিরিশ বছর আগে তারা ছিল একই স্তরে। তারপর থেকে একজন উঠেছে অন্যজন পড়েছে। দুজনের আজ আর একই স্তরে ফিরে আসা সম্ভব নয় ব্রতীন তা জানে। শুধু স্মৃতি দিয়ে বয়স কমিয়ে কতটা আর সমান সমান হওয়া যায়। সে আবার তক্তাপোশে বসল।
‘নিমি চলফেরা করতে না পারলে আমি মুশকিলে পড়ে যাব। সংসারে একমাত্র রোজগেরে তো ও-ই। আমি আর ক-টা টাকাই বা রোজগার করি। চারদিন কাজে বসতে পারিনি, কত কাজ পড়ে রয়েছে, ওই দেখুন না।’ বুড়ি ক্লান্ত আঙুল তুলে ঘরের জানলার দিকটা দেখাল।
ব্রতীন দেখেছিল কিন্তু বিশেষভাবে নজর করেনি। একটা বেডকভারে ঢাকা সেলাই মেশিন। তার উপর পাট পাট স্তূপ করে রাখা সাদা-হলুদ-সবুজ রঙের কাপড়। বুড়ি বলল, ‘সায়ার কাপড়। মাপ করে কেটে দিয়ে যায় আমি সেলাই করে দি। এখনও চল্লিশটা পড়ে রয়েছে। পুজোর জন্য কাজ এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে, করে দিতে না পারলে অন্য লোককে দিয়ে দেবে।’
ব্রতীন বলল, ‘কাজ করার আর কেউ নেই?’ সে লক্ষ করেছে বুড়ির সিঁথি, সিঁদুর নেই সুতরাং তার প্রশ্নটা অবান্তর।
বুড়ি হাল ছেড়ে দেওয়া স্বরে বলল, ‘আর আমার কে থাকবে, নিমির বাবা তো দশ বছর আগে শক খেয়ে মই থেকে পড়ে মরে গেল। গরমেন্টের চাকরি করত। তারপর থেকেই তো আমরা দুজন টেনেটুনে চালাচ্ছি।’
ব্রতীন ভাবল জিজ্ঞাসা করবে, বাপের বাড়ির কেউ সাহায্য করে না? কিন্তু জিজ্ঞাসাটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নাক গলানোর মতো হয়ে যাবে। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করা মেয়ের সঙ্গে বাপের বাড়ির সম্পর্ক তিক্ত হবে, এটা তো জানা কথাই। অনেক কথা জিজ্ঞাসা করার আছে যা ঠাট্টার ছলেও এই বয়সে জিজ্ঞাসা করা যায় না, বিশেষত বেশি মাত্রায় পাকা মেয়ের সামনে।
