‘আঠারো।’
ডাক্তার চার-পাঁচটা বাক্য লিখে কাগজটা ব্রতীনের হাতে দিলেন। সে দিল মলির হাতে।
ব্রতীন নম্রস্বরে বলল, ‘আপনার ফি কত?’
মহিলা উত্তর দিলেন, ‘একশো টাকা আর ব্যান্ডেজের জন্য দশ টাকা।’
ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ে জুতো ঢুকল না, ডান পায়ে জুতো পরে মলি একপাটি হাতে নিয়ে ব্রতীনের মুখের দিকে তাকাল। ব্রতীন বুঝল, কোলে তুলে নিতে হবে।
মলিকে কোলে নিয়ে গেটের কাছে এসে ব্রতীন বিস্মিত দারোয়ানকে বলল, ‘ভাই একে একটু বসতে দেবে, আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে আনি।’
পায়ের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে দারোয়ান তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে মলিকে বলল, ‘জরুর! আপ বৈঠিয়ে।’
‘কোথায় যাবে, স্টেশনে?’
‘না। মাসির বাড়ি যাব, দর্জিপাড়ায় গোলাপবাগান স্ট্রিট।’
ব্রতীন প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না নিজের কানকে। গোলাপবাগান! ঠিক শুনেছে তো!
‘কী বললে, গোলাপবাগান?’
‘হ্যাঁ।’
ব্রতীনের চোখ থেকে মলির মুখ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে ফুটে উঠল সকালে শোনা নাম বুড়ির মুখটা। আশ্চর্য মিল দুটো মুখের, আশ্চর্য গোলাপবাগান নামটা। বুড়ি কাছেই থাকত আশু দেব লেনে। একটা বিরাট বস্তির পাশ দিয়ে গোলাপবাগান রাস্তাটা। যেদিন ইচ্ছা হত সে ওটা ধরে স্কুলে যেত। বস্তির বাইরের দিকে ছিল নানান ধরনের দোকান। ওখানেই কি না যেতে চাইল মলি? সে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি গোলাপবাগানে যাবে, ঠিক বলছ?’
‘হ্যাঁ, মাসি থাকে, পৌঁছে দেবেন?’ কাতর চোখে মলি মিনতি জানাল।
একটা ট্যাক্সি গেটের মুখে দাঁড়াল। ব্রতীন ছুটে গেল।
‘দর্জিপাড়া যাব, যাবেন?’
ট্যাক্সিওয়ালা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ভবানীপুর যাব।’
ব্রতীন এধার-ওধার তাকিয়ে খালি ট্যাক্সি দেখতে পেল না। বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়াল। হু হু করে গাড়ি চলেছে, খালি ট্যাক্সির দেখা নেই। গাড়ির স্রোতের মধ্য দিয়ে মিটার ফ্ল্যাগ তোলা একটি ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে ‘ট্যাক্সি ট্যাক্সি’ চিৎকার করে হাত তুলে ডেকে দেখল ড্রাইভার তার দিকে একবার তাকাল মাত্র, দাঁড়াল না। মিনিট তিনেক পর তাকে অবাক করে তার পাশের রাস্তা থেকে একটা খালি ট্যাক্সি বেরিয়ে এল এবং দর্জিপাড়ায় যেতে রাজি হল।
ব্রতীনের বাহু ধরে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মলি ট্যাক্সিতে উঠল। পথে ব্রতীন একবারই কথা বলল, ‘কালকেই এক্স-রে-টা করিয়ে নিয়ো।’ গোলাপবাগান বস্তির সামনে ব্রতীনের হাত ধরে মলি নামল।
‘এবার যেতে পারবে তো?’ ব্রতীন ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখে বলল। এই ট্যাক্সিতেই সে বাড়ি ফিরে যাবে ভেবে রেখেছে। বস্তির একটা মুদির দোকানে দুজন বাচ্চচা খদ্দের দাঁড়িয়ে। ট্যাক্সি থেকে মলিকে নামতে দেখে কৌতূহলী হয়ে তারা তাকিয়ে রয়েছে। পাশের চুলকাটার দোকানে একমাত্র নাপিতটি একজনকে দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছে। পান সিগারেটের দোকানদার মাচায় বসে, তার নীচে মুড়ি ছোলার দোকান। মলি অসহায় চোখে তার উপর চোখ বুলিয়ে বুঝল কেউ তার সাহায্যে আসবে না। চেনা একজনকেও সে দেখতে না পেয়ে বলল, ‘আমাকে একটু ধরে পৌঁছে দেবেন?’
পঁয়ষট্টি টাকা ভাড়া চুকিয়ে ব্রতীন ট্যাক্সি ছেড়ে দিল। ইট-পাতা সরু পথ রাস্তা থেকে বস্তির ভিতর ঢুকে গেছে। ব্রতীন যতদূর মনে করতে পারল পথটা আগে মাটির ছিল একপাশে ছিল মাটির খোলা ড্রেন এখন সেটা সিমেন্ট বাঁধানো। ইলেকট্রিক পোস্ট। রাস্তার ধারে একতলা বাড়িগুলো একই রয়েছে, চুন-সুরকির দেওয়ালের ঘর, টিনের বা টালির ছাদ। তবে আগের থেকে পরিচ্ছন্ন বলে তার মনে হল।
এক হাতে তার বাহু ধরে হাঁটতে মলিকে জখম পা-টা জমিতে রাখতে হচ্ছে। যতবারই রাখছে যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করছে দাঁত চেপে।
‘আর কতটা?’
‘ওই বাড়িটার পাশের গলিতে।’ মলি জুতোধরা হাত তুলে দশ-বারো মিটার দূরের বাড়িটা দেখাল। ব্রতীন পাঁজাকোলা করে মলিকে তুলে নিয়ে গলির দিকে এগোল। একটা বাড়ির জানলা থেকে স্ত্রীলোক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল রে তোর নিমি?’
গলি দিয়ে ঢোকার জন্য ব্রতীনকে পাশ ফিরতে হল। মাত্র দু-হাত চওড়া গলিটা।
‘এই যে এই বাড়িটা।’
ব্রতীন দরজার সামনে দাঁড়াল। নীচু ছোটো দরজা। মলি হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে দরজার কড়া টানতেই ওধারে ‘খট’ শব্দ হল ছিটকিনি পড়ার।
আবার পাশ ফিরে ব্রতীনকে ঢুকতে হল। ছোটো ঘর, দুটি ছোটো জানলা, ঘরে আলো খুবই কম। তক্তাপোশে ময়লা সবুজ শাড়ি-পরা এক স্ত্রীলোক শুয়ে। মলিকে দু-হাতে কোলে নিয়ে একজন অপরিচিত পুরুষকে ঢুকতে দেখে স্ত্রীলোকটি অবাক হয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে গায়ের কাপড় ঠিকঠাক করতে করতে ভীত স্বরে বলে উঠল, ‘নিমি! কী হয়েছে?’
মলিকে তক্তাপোশের উপর বসিয়ে দিয়ে ব্রতীন বলল, ‘পা মচকেছে কিংবা হয়তো গোছের হাড় ভেঙেছে, এক্স-রে করলে সঠিক জানা যাবে।’
স্ত্রীলোকটি নেমে এসে আলোর সুইচ টিপল। কম পাওয়ারের খোলা বালব। মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে ব্রতীনের দিকে ফিরে দাঁড়াল। সরু কাঁধ, রুগণ দেহ, কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে, গালদুটি বসে গিয়ে হনুর হাড় প্রকট হয়ে রয়েছে, উচুঁ কপালটা শুধু চামড়ায় মোড়া, রগের উপর ফুলে রয়েছে শিরা দুটো। বাহুদুটি শীর্ণ। ব্রতীন পলকেই বুঝে গেল অপুষ্টিতে ভুগছে, নানান ব্যাধি শরীরটাকে জীর্ণ করে দিয়েছে।
