‘অসুবিধে আর কী, এই সময়েই কাজ বেশি হয়। দুটো টাকা আসত।’
‘এখানে যে এলে সেজন্য টাকা পাবে? কিছুই তো হল না। গুণো তো সময়ই পেল না।’
‘সেজন্য আমি তো দায়ী নই, টাকা ঠিকই পাব।’
‘ওখানে আর কী করো, মেয়েরা আসে?’
‘বিউটি পার্লারে তো মেয়েরাই আসবে!’ মলি অবাক হল এমন বোকার মতো প্রশ্নে। ‘পুরুষরাও আসে। চুল কাটি, ফেসিয়াল করি, কলপ লাগাই, ভ্রূ প্লাক করি, ম্যাসেজ করে দি। এসবের জন্য অবিশ্যি আলাদা মাইনে পাই।’ মলি এবার উৎসাহিত হয়ে উঠল, ‘আপনি ম্যাসেজ করাবেন?’
‘না। এবার আমি যাব।’ ব্রতীন উঠে দাঁড়াল। গুণেন্দ্র চশমাটা বুক পকেটে রেখে তালা চাবিটা তুলে নিল। মলিও উঠে দাঁড়াল।
‘তাহলে আমি যাই।’
‘এসো।’
খটখট শব্দ তুলে মলি দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ব্রতীন ওর জুতোর শব্দ শুনে বুঝল সাবধানে একটা একটা ধাপে পা রেখে নামছে।
হঠাৎ একটা কুকুরের ডাক আর মলির ভীত চীৎকার ভেসে এল। কোনো ফ্ল্যাট থেকে কুকুর বেরিয়ে পড়েছে। ডাকের গভীরতা থেকে ব্রতীনের মনে হল বড়ো কুকুর বোধহয় অ্যালশেসিয়ান। ভয় পেলে মলি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামছে। ব্রতীন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াল। লিফটে নামলে ওকে কুকুরের সামনে পড়তে হত না। খট খট শব্দ বেশ দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে, বোধহয় ছুটে নামছে। কুকুরটাকে এক মহিলাকণ্ঠ ধমক দিতেই ওর ডাক আর দরজা বন্ধের শব্দ হল। সেই সঙ্গেই ব্রতীনের কানে এল হুড়মুড়িয়ে কারোর পড়ে যাওয়ার শব্দ।
মলি পড়ে গেল না কি! ব্রতীন সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে শুরু করল। চারতলার ল্যান্ডিংয়ে মলি কাত হয়ে পড়ে রয়েছে। ব্রতীন দুটো কাঁধ ধরে ওকে বসাল। নির্জন সিঁড়ি, সব ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। মলি ডান হাতটা উঁচু করে বলল, ‘তুলে দিন।’
ব্রতীন হাতটা ধরে হালকা শরীর একটা ছোট্ট টানেই উঠে এল। দাঁড়িয়েই মলি যন্ত্রণায় মুখ বিকৃতি করে বাঁ পা সামান্য তুলে দেওয়াল ধরে দাঁড়াল।
‘কী হল, চোট লেগেছে?’
‘ব্যথা করছে।’ বাঁ পা মেঝেয় রেখে দাঁড়িয়েই পা-টা তুলে নিল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো। কান্নাধরা গলার মতো স্বরে বলে উঠল, ‘আমি হাঁটতে পারব না।’
‘তুমি দাঁড়াও, দরজায় তালাটা দিয়ে আসি।’
ব্রতীন দুটো করে সিঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেল। ফ্ল্যাটে ঢুকে তালাটা হাতে নিয়ে চারধারে তাকাল। জানলাগুলো খোলা, বন্ধ করার সময় এখন নেই, থাক খোলা। সে আলো-পাখা বন্ধ করে দরজায় তালা লাগিয়ে নেমে এসে দেখল দেয়ালে দুটি হাত রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে মলি দাঁড়িয়ে। অসহায় করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে ফেলে যাবেন না তো?’
‘এই অবস্থায় কী ফেলে যাওয়া যায়। তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে এখুনি। অ্যাঙ্কেলটা ভেঙেছে কি না দেখতে হবে। অমন একটা জুতো পরেছ কেন?’ ব্রতীন ধমকে উঠল। ‘যা পরে হাঁটতে পারো না, তা পরার দরকার কী?’
‘কুকুরটা যেভাবে দাঁত বের করে এগিয়ে এল তাতে আপনিও ভয় পেতেন। হাঁটতে পারব না আমায় একটু ধরে নামিয়ে দেবেন?’
‘বাড়ি যাবে কী করে? শেয়ালদা স্টেশন পর্যন্ত নয় ট্যাক্সিতে পৌঁছে দিতে পারি, তারপর?’
ব্রতীন দেখল মলির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দ্রুত কী কী যেন চিন্তা করে নিচ্ছে। সত্যিই বিপদে পড়েছে মেয়েটি। এই পা নিয়ে ট্রেনে উঠে একা বিরাটি যাওয়া সহজ কাজ নয়।
‘আগে চলো তো, পরে দেখা যাবে। হাঁটতে পারবে? জুতো খুলে হাতে নাও।’
বাঁ হাতে জুতো জোড়া, ডান হাত দিয়ে ব্রতীনের বাহু ধরে কোনোক্রমে মলি দুটো ধাপ নেমে দাঁড়িয়ে গেল। দু-চোখ ভিজে। ‘আমাকে হামাগুড়ি দিয়ে নামতে হবে, তাও বোধহয় পারব না।’
বাক্য ব্যয় না করে ব্রতীন মলিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। বাসি সেন্টের একটা ক্ষীণ গন্ধ ওড়না থেকে পাওয়া ছাড়া অনুভবে ব্রতীন আর কিছু পেল না। দোতলায় পৌঁছে সে ‘সার্কাস নার্সিংহোম’ লেখা কাঠের বোর্ড দেখে খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।
বড়ো ঘর। ডানদিকে একটা টেবলে বসে এক বয়স্কা মহিলা, টেবলে দু-তিনটে খাতা। ব্রতীনের মনে হল রিসেপশনিস্ট।
‘একে একবার দেখতে হবে, সিঁড়িতে নামতে গিয়ে পড়ে গেছে। ডক্টর আছে?’ মলিকে নামিয়ে দিল। একহাতে টেবলের কিনার ধরে সে দাঁড়াল, অন্য হাতে জুতো। একটা খালি চেয়ার দেখে ব্রতীন ওকে ধরে বসিয়ে দিল।
মহিলা কথা না বলে ভিতরের একটা ঘরে চলে গেলেন। একটু পরেই হাতকাটা গেঞ্জি আর ট্রাউজার্সপরা একটি লোক ঘুম-জড়ানো চোখে এসে বললেন, ‘কী হয়েছে, পা ভেঙেছে না মচকেছে?’ দেওয়ালের দিকে রোগীকে শুইয়ে পরীক্ষা করার টেবলটা দেখিয়ে বললেন, ‘যান শুয়ে পড়ুন। কোথায় পড়েছেন?’
ব্রতীন বলল, ‘চারতলার সিঁড়ি থেকে, কুকুরের তাড়া খেয়ে।’
‘লাম্বাদের কুকুর। ভীষণ পাজি ওটা। কেন যে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে না।’
মলিকে তুলে ব্রতীন টেবলে শুইয়ে দিল। ডাক্তার তিন মিনিট ধরে বাঁ পায়ের গোছ ঘুরিয়ে বাঁকিয়ে টিপে পরীক্ষা করে একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘মনে হয় না ভেঙেছে, একটা এক্স-রে করিয়ে নিন, আপাতত ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি, হাঁটাচলা একদম বন্ধ।’
ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিলেন। প্যাডে লিখতে গিয়ে বললেন, ‘নাম কী?’
‘মলি রায়।’ মলি বলল।
‘বয়স?’
