‘কেলেঙ্কারি হয়েছে রে বতু, বাসটা অ্যাকসিডেন্ট করেছে!’ ট্রাউজার্সটা ডান পায়ে গলাতে গলাতে বলল, ‘রানাঘাটের কাছে, আমি যাচ্ছি এখন…….সামনে দিয়ে আসছিল একটা মিনিবাস……তুই থাক, মেয়েটা তোর কাছে রইল…..টাকা-ফাকা যা দেবার দিয়ে দোব।’……গুণেন্দ্র কুঁজো হয়ে বাঁ পায়ে ট্রাউজার্স গলাতে গিয়ে বেটাল হয়ে পড়ে যাচ্ছিল দরজার পাল্লায় হাত রেখে সামলাতে গেল, পাল্লাটা খুলে গেল আর গুণেন্দ্র মেঝেয় পড়ে গেল কাত হয়ে।
তখন ব্রতীন দেখতে পেল খাটে পা ঝুলিয়ে অবাক ভীত চোখে বসে মলি, কামিজটা কোমর পর্যন্ত নামানো, ব্রেসিয়ারটা ঘাড় থেকে পাখির ভাঙা ডানার মতো ঝুলে রয়েছে। গুণেন্দ্র মেঝে থেকে ওঠার আগেই মলি খাট থেকে লাফিয়ে নেমে গুণেন্দ্রকে হাত ধরে টেনে তুলল।
‘আমার বন্ধুকে দেখিস।’ কোমরে বেল্ট আঁটতে আঁটতে বলল গুণেন্দ্র। ‘সতেরো বছর ব্যবসা করছি এই প্রথম এমন ঘটল।’ গুণেন্দ্রর চোখে উদবেগ, কণ্ঠস্বর উত্তেজিত।
ব্রতীন কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়ানো মলির মুখের দিকে তাকাল। মুখটা বিমূঢ়।
‘গুণো এখন তুই কোথায় যাবি?’
‘রানাঘাট হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিল কলকাতায় অপারেটারের অফিসে। ওরাই আমাকে ফোন করল, না মরে-টরেনি তবে সিরিয়াসলি ইঞ্জিওরড হয়েছে দুজন জাপানি।’ জুতোর ফিতে বেঁধে উঠে দাঁড়াল গুণেন্দ্র। জামাটা পরতে গিয়ে তার মনে পড়ল গেঞ্জি পরা হয়নি।
‘গেঞ্জিটা এনে দে।’
মলি দ্রুত গেঞ্জি দিল। মাথা দিয়ে গেঞ্জিটা গলিয়ে সে হাওয়াই শার্টটা পরে নিয়ে বলল, ‘এখন রানাঘাট যাব। তালাচাবি রইল, পরে চাবিটা তোর কাছ থেকে নিয়ে নেব।’ দু-হাত দিয়ে চাপড়ে চুল ঠিক করে সে মলির দিকে তাকাল, ‘ছোটকুকে বলে দিস যা শুনলি আর বতুকে তোর কাছে রেখে গেলুম, যত্ন করিস, চলি।’
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামার খটখট শব্দ ব্রতীন শুনল। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার তর সয়নি। খোলা সদর দরজার দিকে তাকিয়ে সে বসে রইল। মলি এগিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। শূন্য দৃষ্টিতে ব্রতীন তার দিকে তাকাল। গত পাঁচ মিনিটে একটা সাইক্লোন যেন তার সারাদিনে গড়ে ওটা বাস্তবকে অলীক করে দিল।
প্রায় ফিসফিসিয়ে মলি বলল, ‘ঘরে আসবেন?’
‘না। তুমি ওটা ঠিক করে পরে নাও।’ ব্রতীন আঙুল দিয়ে রুগণ স্তনদুটিতে দেখাল। মলি ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। মিনিট দুয়েক পরে বেরিয়ে এল জুতো পরে, শরীর কামিজে ঢাকা। মুখ চোখ স্বাভাবিক। হাতে গুণেন্দ্রর ফেলে যাওয়া সানগ্লাসটা।
‘গুণোবাবু যত্ন করতে বলে গেছেন।’
ওর বলার সুরে ব্রতীন মজা পেল।
‘তুমি এখানে বসো।’ সোফায় চাপড় দিয়ে ব্রতীন বলল, ‘তোমার পদবি কী?’
মলি ব্রতীনের পাশে বসে বলল, ‘রায়’।
‘মলি ডাকনাম না ভালো নাম?’
‘দুই-ই।”
‘থাকো কোথায়?’
‘বিরাটি।’
‘কীভাবে আসো।’
‘ট্রেনে।’
‘বাড়িতে কে কে আছে?’
‘ভাই বোন, বাবা মা, দিদি। কথা না শুনলে গুণোবাবু রেগে যাবে।’
‘রেগে গেলে কী হবে?’
‘ছোটকুদাকে বলে দিলে আমাকে পার্লারে হয়তো আর রাখবে না। গুণোবাবুর কথা দেখেছি ছোটকুদা খুব মানে। ঘরে যাবেন না?’ মেয়েটির স্বরে অস্পষ্ট আবেদন। ব্রতীনের মায়া হল ওর মুখ দেখে। মলি অন্যমনস্কের মতো হাত রাখল ব্রতীনের আঙুলের উপর। ব্রতীন হাত সরিয়ে নিল না তবে অস্বস্তিতে রইল।
‘পার্লারের নাম কী?’
‘মুনলাইট।’
‘তুমি কতদূর পড়েছ?’
‘ক্লাস টেন পর্যন্ত, এ বছর মাধ্যমিক দেওয়ার কথা ছিল।’
‘দিলে না কেন?’
‘বাবার কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে ছোটো ছোটো চারটে ভাইবোন যখন কান্না শুরু করে তখন পরীক্ষা-টরিক্ষা মাথায় উঠে যায়।’ মলির স্বরে আবেগ ফুটে উঠল। ব্রতীন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলল, মেয়েটা ভালো।
‘তোমাকে এই লাইনে আনল কে?’
‘আমাদের স্কুলেরই একটা মেয়ে। আমি জানি আমি দেখতে ভালো নই, তবু বয়স্ক লোকেরা আমাকে সবথেকে বেশি পছন্দ করে।’ মলির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘বয়স্ক লোকেরা তোমাকে পছন্দ করে কিন্তু আমি কী খুব বয়স্ক লোক?’ ব্রতীনের স্বরে কৌতুক ফুটে উঠল। উত্তর দিতে মলি দ্বিধাগ্রস্ত। ব্রতীন তার হাত সরিয়ে দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। ‘আমি বোম্বাইয়ে থাকি। আমার সঙ্গে তিনজন মেয়ের আলাপ আছে, একজন মারাঠি, একজন গুজরাতি, একজন গোয়ানিজ। কেউ আমাকে বয়স্ক বলেনি, তুমি আমাকে না জেনেই বয়স্ক ধরে নিলে। ব্যাড, ভেরি ব্যাড। আমার বয়স কত বলে মনে হয়?’
মলি সতর্কভাবে বলল, ‘তিরিশ।’
‘ঠিক করে আবার বলো।’
‘পঁয়ত্রিশ।’
‘আবার বলো।’
‘একটুও বাড়িয়ে বলব না আপনাকে চল্লিশের একটা দিনও বেশি মনে হয় না। আপনার একদমই ইচ্ছে হচ্ছে না ঘরে যেতে?’
‘না’। ব্রতীন কড়াভাবেই বলল এবং বলে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অপ্রতিভ হয়ে চোখ নামিয়ে হাতে ধরা চশমাটা নাড়াচাড়া করতে করতে মলি বলল, ‘এটা আপনার কাছে রেখে দিন, গুণোবাবুকে দিয়ে দেবেন।’
‘এখন তুমি কোথায় যাবে, পার্লারে?’
‘না। ছুটি দিয়ে দিয়েছে আজকের মতো।’
‘বাড়ি যাবে?’
মলি মাথা নেড়ে ব্যাগের ফিতেটা ঘাড়ের উপর ঠিক করে রেখে বলল, ‘ক-টা বাজে?’
ঘড়ি দেখে ব্রতীন বলল, ‘চারটে।’
‘অহহ।’ মলি যেন হতাশ হল। ‘এখনও দু-ঘণ্টা খোলা থাকবে।’
‘তাতে তোমার কি কোনো অসুবিধে হবে?’ ব্রতীন কথাটা বলেই বুঝল প্রশ্নটা ব্যক্তিগত হয়ে গেল, উচিত হয়নি।
