‘গুণো, তুই এই ধরনের রসিকতার অভ্যেসটা এখনও ছাড়তে পারলি না।’ ব্রতীন কথাগুলো বলেও ভরসা পেল না গুণো সত্যি না মিথ্যে রসিকতা করছে।
‘এই বয়সেই তো রসিকতা করব রে।’ হাত তুলে ঘড়ি দেখে গুণেন্দ্র বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এখনও এল না, তিনটেয় বলেছিলুম। বতু বড়োজোর আধঘণ্টা। ততক্ষণে বাইরের সোফাটায় শুয়ে ঘুমিয়েও নিতে পারিস।’
ব্রতীন ওর বলার ভঙ্গি থেকে বুঝতে পারল রসিকতা নয়, সত্যিই একটা মেয়ে আসবে। তাকে ভালোছেলে বলে যে চিমটিটা কাটল সেটা যে তাকে নাড়া দেয়নি, সে যে এসব ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপ করে না, যথেষ্ট আধুনিক খোলামনের এটা বোঝাতে সে হালকা চালে বলল, ‘মেয়েটা কে, কোত্থেকে জোগাড় করলি?’
‘আমার খুব ঘনিষ্ঠ একজনের বিউটি পার্লার আছে এই কাছেই সার্কুলার রোডে। ছ-টা মেয়ে কাজ করে তার মধ্যে তিনটে এন্টারটেইন করে সেজন্য ওখানেই ঘর আছে। কলকাতায় এখন ব্যবসাটা ভালো চলছে।’
‘তখন ফোনে কথা বললি ছোটকু নামে একজনের সঙ্গে, সেই কি মালিক?’
‘কারেক্ট। ওর দুটো অ্যাম্বাসাডার আমি ভাড়া নিই, পার্লারের ব্যাপারে পুলিশের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে দিয়েছি তবে সেজন্য অন্যায় কোনো সুযোগ কখনো নিইনি। টাকা না দিয়ে কোনো মেয়েকে এখানে আনিনি। অবশ্য ইচ্ছে করলে ফ্রি সার্ভিস ডিমান্ড করতে পারি, ছোটকু সেটাই চায় তাহলে আমাকে হাতে রাখতে পারবে। দু-তিনশো টাকার জন্য এইসব নোংরা বাজে লোকের কাছ থেকে অনুগ্রহ নেবার প্রবৃত্তি হয় না।’
ব্রতীন দেখল গুণেন্দ্রর চোখের পাতা নেমে আসছে, কথা সামান্য জড়িয়ে যাচ্ছে। এখন সে নিশ্চিতভাবে বুঝে গেছে রসিকতা নয়। সত্যিই একটি মেয়ে আসছে, এখনই। কৌতূহল মেটাবার জন্য এবার সে তৈরি।
হালকাভাবে কলিং বেলে ‘টুংটাং’ বেজে উঠল একবার। আলতো করে বোতাম টিপেই ছেড়ে দেওয়া কুণ্ঠিত শব্দটা কারোর হাজিরা জানান দিল। ব্রতীন তাকাল গুণেন্দ্রর মুখের দিকে।
‘এসেছে। বতু আমাকে আর ওঠাসনি, খুলে দিয়ায়।’
ব্রতীন উঠে গিয়ে দরজা খুলল। প্রথমেই তাকাল মুখে এবং অবাক হয়ে গেল। এ তো তিরিশ বছর আগের, বারান্দায় চন্দনাকে ছোলা খাওয়াত সেই মেয়েটি! সেই গঙ্গা মাটির মতো রং, সেই উঁচু কপাল ভুরু নাক, সেই চোখ তবে সুর্মা দিত না, সেই চুল তবে এমন উড়ুক্ষে থাকত না। ব্রতীনের ঠোঁটে ফিকে হাসি দেখে মেয়েটিও হাসল। হালকা গোলাপি রং ঠোঁটে। উপরের পাটির ঝকঝকে দুটো দাঁতের আধখানা দেখা গেল। আশ্চর্য এত মিলও হয়। আজই সে জেনেছে ওর নাম ছিল বুড়ি। তাকে সে একরঙা খয়েরি রঙের এমন সালোয়ার কামিজ ওড়না গায়ে দেখেনি, এমন ছিপছিপে লম্বাও ছিল না। কিন্তু এর মুখখানি বুড়ির ছাঁচে বসানো, মুখের রংও। মুখটুকু ছাড়া আপাদমস্তক ঢাকা, ঢোলা কামিজের প্রান্ত হাঁটুর নীচে নেমে রয়েছে। কামিজের গলায় বগলে সোনালি সুতোর কাজ। কমদামি কাপড়ের পোশাক। এমন ঢাকা শরীর দেখে ব্রতীন বুঝতে পারল না মেয়েটি কতটা স্বাস্থ্যবতী, আন্দাজ করল বয়স কুড়ির কাছাকাছি।
‘গুণোবাবু আছেন?’ নীচু খসখসে গলায় জিজ্ঞাসা করল।
‘আছে, ভেতরে এসো।’ ব্রতীন সরে দাঁড়াল।
ভিতরে ঢুকেই মেয়েটি ডানদিকে শোবার ঘরের দিকে তাকাল।
ব্রতীন শুনেছে ও আগে এই ফ্ল্যাটে এসেছে সুতরাং ঘরটা চেনে এবং জানে ওই ঘরেই তাকে যেতে হবে।
‘কে রে মলি নাকি?’ ভিতর থেকে গুণেন্দ্রর গলা ভেসে এল।
‘হ্যাঁ, আমি।’
‘এ ঘরে আয়।’
মলি শোবার ঘরে গেল। ওর কাঁধ থেকে ঝুলছে বাস কন্ডাক্টরদের মতো খয়েরি রঙের নকল চামড়ার ব্যাগ। ব্রতীন লক্ষ করল ওর হাঁটা আর জুতো। চকচকে খয়েরি রঙের সিন্থেটিক চামড়ার পাম্প শু, প্রায় পাঁচ ইঞ্চি লম্বা সরু হিল। প্রথম পদক্ষেপেই বাঁ পা টলে গেল। ব্রতীন বুঝে গেল হাই হিলে মলি অভ্যস্ত নয়। কেন যে পরে এমন জুতো!
‘দরজাটা বন্ধ কর।’ গুণেন্দ্রর গলা শোনা গেল।
ব্রতীন দেখল দরজার পাল্লা ভেজানোর সময় মলি তার দিকে তাকিয়ে ছিল নির্বিকার দৃষ্টিতে। সোফায় বসে সে তিন দিকে তাকাল। দেখার মতো কিছু নেই। সারা বাড়ি শব্দহীন। শব্দ ঢোকার কোনো পথ থাকে না ফ্ল্যাটবাড়ির বাইরের দরজা বন্ধ থাকলে, শব্দ আসতে পারে শুধু জানলা দিয়ে। রাস্তায় মোটর চলার আর হর্নের শব্দ আবছাভাবে ঘরে ঢুকছে। মাথার পিছনে দুটো হাত জড়ো করে সোফায় হেলান দিয়ে সে যতটা সম্ভব পা দুটো সামনে ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করল। কিছু একটা এখন তাকে ভাবতে হবে। কী ভাবা যায়? এখন ওরা ঘরে কী করছে? এটা তার কাছে কুৎসিত একটা ভাবনা বলে মনে হল। সে কোনোভাবেই এখন পারবে না ওদের দুজনকে নগ্ন অবস্থায় কল্পনা করতে। তার শিক্ষা রুচি ধমক দিয়ে তাকে কুঁকড়ে দিল। এমন একটা অবস্থার মধ্যে যে তাকে পড়তে হবে কিছুক্ষণ আগেও সে জানত না। গুণেন্দ্র যখন বলল, ‘এখন কিন্তু একটা মেয়ে এখানে আসবে,’ শোনামাত্র তখন যে ধাক্কাটা সে পেয়েছিল তার জের থেকে মস্তিষ্কের কোষগুলো এখনও উদ্ধার পায়নি।
হঠাৎ তার মনে হল শোবার ঘরের বন্ধ দরজার ওধার থেকে যেন ক্ষীণ শব্দ হল মোবাইল ফোন বেজে ওঠার। সে উৎকর্ণ হল। গুণেন্দ্রর গলা, বেশ উত্তেজিত। আধ মিনিট পর দড়াম করে দরজা খুলে বেরিয়ে এল গুণেন্দ্র। খালি গা শুধু জাঙ্গিয়া পরা, এক হাতে জামা আর ট্রাউজার্স অন্য হাতে ফোন। দৃষ্টি উদভ্রান্তের মতো।
