লিফট উপরে রয়েছে। বোতাম টিপে গুণেন্দ্র দাঁড়িয়ে। ‘গুণো ক-টা ফ্ল্যাট এখানে?’
‘প্রতি তলায় তিনটে করে তবে দোতলায় পুরোটাই নার্সিংহোম বাড়ির মালিকের। ফ্ল্যাট একুশটা।’
‘মালিক এখানে থাকে?’
‘তিনতলায় থাকে দুটো ফ্ল্যাটে দুই ভাই। বড়োজন ডাক্তার আর ছোটোজন মাফিয়া সর্দার।’
এক প্রৌঢ় দম্পতি এসে দাঁড়াল তাদের পাশে, চেহারা ও পোশাকে অবাঙালিত্ব প্রকট। গুণেন্দ্র চুপ করে গেল। লিফট নেমে এল, বেরিয়ে এল দুটি বাচ্চচা মেয়ে, সালোয়ার কামিজ পরা মাঝবয়সি মহিলা আর স্যুট টাই পরা এক যুবক। ওরা চারজন লিফটে ঢুকল। গুণেন্দ্র পাঁচ নম্বর বোতাম টিপে লোকটির দিকে তাকাতে সে বলল, ‘ফোর।’ গুণেন্দ্র চার নম্বরটা টিপে দিল।
ছ-তলায় লিফট থেকে তারা বেরোল, দু-দিকে পাঁচ হাত চওড়া প্যাসেজ। আলো কম। দু-দিকে দুটি ও সামনে একটি ফ্ল্যাট। দরজাগুলো এক পাল্লার। গুণেন্দ্র ডানদিকে এগোল। পকেট থেকে চাবি বার করে দরজায় ঝোলানো বড়ো তালাটি খুলে ভিতরে ঢুকে আলো জ্বালল পাখা চালাল। ভিতরে ঢুকেই ভ্যাপসা বাসি গন্ধ পায় ব্রতীন। গুণেন্দ্র একটা একটা করে তিনটি জানালা খুলে দিল। সোফা আর সেন্টার টেবল দেখে ব্রতীন বুঝল এটা বসার ঘর। এর একধারে স্নানের আর রান্নার ঘর অন্য ধারে ছোটো দুটি শোবার ঘর পাশাপাশি, একটির বন্ধ দরজায় তালা ঝুলছে।
গুণেন্দ্র তালাবিহীন শোবার ঘরে ঢুকে জানলা দুটো খুলল। বাইরেই রাস্তা। ব্রতীন ওকে অনুসরণ করে ঘরে ঢুকল। একটা ডাবলবেড খাট। রঙিন ফুলকাটা চাদরে ঢাকা ফোমের গদি। দুটো বালিশ। একটা স্টিলের আলমারি তার মাথায় রাখা দেড়হাত লম্বা মাটির সরস্বতী। গলায় দড়ির মতো শুকনো মালা ঝুলছে। বোঝা যায় একটা পরিবার এই ফ্ল্যাটে থাকত কিন্তু আপাতত থাকে না। দুটো জানলার মাঝে একটা দরজা, গুণেন্দ্র সেটা খুলল। ছোট্ট বারান্দা, কোমর সমান দেয়ালে ঘেরা। প্রত্যেক দরজায় পরদা টাঙাবার রড লাগানো কিন্তু পরদা নেই।
‘বাথরুমটা কোথায় রে?’ ব্রতীন জিজ্ঞাসা করল। গুণেন্দ্র আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার আগে সে মুখে চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে তোয়ালে খুঁজল, পেল না। ঘরে এসে দেখল গুণেন্দ্রর গেঞ্জি জামা প্যান্ট খাটের গায়ে ঝুলছে, সে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে চিত হয়ে চোখ বুজে শুয়ে, পাখা ঘুরছে। মাথার বালিশের পাশে চশমা আর মোবাইলটা।
‘লুঙ্গি পেলি কোথা থেকে?’
‘এখানেই রাখা ছিল।’ উঁচু গোলাকার পেটে হাত বুলোতে বুলোতে গুণেন্দ্র চোখ না খুলে বলল। ‘একটু বেশি খাওয়া হয়ে গেছে ফ্রায়েড রাইসটা।’
‘আমারও। একটা প্লেট দুজনে ভাগাভাগি করে খাওয়া যেত।’
ব্রতীন বালিশটা টেনে বগলের নীচে রেখে কাত হল গুণেন্দ্রর পাশে। ‘বলার গল্পটা এবার শেষ কর। দারুণ ইন্টারেস্টিং।’
‘ওখানে একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলুম ওই বুড়ি হচ্ছে বিশ্বভারতীর এক ইতিহাসের প্রোফেসারের মা, নাম বলল প্রদীপ না প্রণব দাশগুপ্ত, থাকে কী এক পল্লিতে, চোদ্দো-পনেরো বছর আগের কথা নাম-টাম অত আর মনেও নেই। আমার তখন দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় নেই, পার্টি রওনা দিয়েছে বাসের দিকে। কলকাতায় ফিরে বলাকে বললুম তোর বউকে দেখলুম শান্তিনিকেতনে। শুনে ও চমকে উঠে বলল, সেকী ওতো লছমনঝোলায় মরে গেছে। তখন কী ইচ্ছে হল জানিস, মারি পেটে একটা লাথি, বললুম গাঁজা গুলগপ্পো আমার কাছে মারিসনি, শান্তিনিকেতনে গিয়ে খোঁজ নে। দিন তিনেক পরে শুনলুম বলার বউ ফিরে এসেছে। একদল সাধু নাকি পাহাড়ের গায়ে অজ্ঞান অবস্থায় বউকে কুড়িয়ে পায়, নিজেদের আশ্রমে নিয়ে গিয়ে শেকড়-বাকড় খাইয়ে বাঁচিয়ে তোলে কিন্তু স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। দু-মাস পর হঠাৎ স্মৃতি ফিরে আসে তখন স্বামীর নাম ঠিকানা বলে। সাধুরা টেলিগ্রাম করে বলাকে-একেবারে হিন্দি ফিল্মের গপ্পো, আশ্চর্যের কী জানিস সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছিল। বলা আমার পা ধরে বলে গুণো কাউকে ব্যাপারটা বলিসনি, তোর বউকেও নয়। বতু বিশ্বাস কর সত্যি সত্যি কাউকে ব্যাপারটা বলিনি, বউকেও নয়। হাজার হোক বলা ছেলেবেলার বন্ধু। মানুষটা ভালো। আর মানুষ তো ভালোয় মন্দয় মিশিয়েই হয়। ভগবান ওকে চেহারায় মেরে দিয়েছে ওর তো কিছু করার নেই। শুধু তোকেই আজ প্রথম বললুম তুই এখানে থাকিস না বলে।’
ব্রতীন আবার গুণেন্দ্রের চরিত্রের একটা দিক আবিষ্কার করে স্নিগ্ধ বোধ করল। সে বলল, ‘তুই নিশ্চিন্ত থাকিস কাউকে বলব না, অবশ্য কাকেই বা বলব। আমার চেনাজানাদের মধ্যে কেউ বলাকে চেনে না।’
‘বতু এখন কিন্তু একটা মেয়ে এখানে আসবে।’
ব্রতীন হতভম্ব হয়ে উঠে বসে গুণেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। আচমকা মাথার উপর জোরে কিল মারলে যে অবস্থা হয় এখন তার সেইরকম মনে হচ্ছে। কথাগুলোর বিস্তৃত ব্যাখ্যা তার মস্তিষ্ক চাইল।
‘একজনই আসবে, ভেবেছিলুম দুজনের কথা বলব। তোর সঙ্গে এতক্ষণ কাটিয়ে মনে হল তুই এখনও আগের মতো ভালো ছেলেই রয়ে গেছিস তাই একজনকেই পাঠাতে বললুম।’
ব্রতীন ভালো করে গুণেন্দ্রর মুখ লক্ষ করল। ঠাট্টা করছে না তো! বদ রসিকতা গুণো করতে পারে বিশেষ করে স্কুল জীবনের বয়সে ফিরে যাবার জন্য যখন ওর শখ হয়েছে। তখন তারা ক্লাস টেন-এ পড়ে। একদিন স্কুল ছুটির পর গুণোর সঙ্গে সে হেঁটে ফিরছে। ট্রামস্টপে তিন-চারজন লোকের সঙ্গে একটি স্কার্ট পরা বইখাতা বুকে জড়িয়ে ধরা টকটকে ফরসা রঙের মেয়েও দাঁড়িয়ে ছিল। গুণো দেখে বলল, ‘গাল দুটো দেখেছিস, আপেল! টিপে দিতে ইচ্ছে করছে।’ গুণো দাঁড়িয়ে পড়ে স্টপ থেকে প্রায় পনেরো মিটার দূরে। ট্রাম আসতে লোকগুলি উঠল, মেয়েটিও। স্টপ ছেড়ে ট্রাম চলা শুরু করামাত্র গুণো হাতের বইগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে শুধু বলল, ‘টিপে দিয়ে আসি।’ ট্রাম তখন সবে গতি নিয়েছে সে শিউরে উঠে দেখল গুণো চলন্ত ট্রামের হাতল ধরে টুক করে উঠে পড়ল। তার বুকের মধ্যে তখন ধুকপুকুনি শুরু হয়। বিশাল একটা কেলেঙ্কারির জন্য নিজেকে তৈরি করে সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গুণোর যা পাগলাটে স্বভাব, গাল তো টিপবেই তারপর যা ঘটবে সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে-ট্রামের লোক পেটাতে পেটাতে ওকে নামাচ্ছে। পাঁচ সেকেন্ড বড়োজোর কেটেছে, সে দেখল অদ্ভুত ভারসাম্য রেখে গুণো ট্রাম থেকে নেমে পড়ে হাত তুলে তাকে ডাকছে। সে দৌড়ে যেতেই ও বলল, ‘উঠেই দেখি সামনে সেজো পিসেমশাই, খুব বেঁচে গেছি।’
