‘কাকে ফোন করলুম বুঝতে পারলি না। আচ্ছা বতু, তুই কী লক্ষ করেছিলি বলাটা আমাকে দেখেও না দেখার ভান করল!’
‘কেমন যেন তোর ওপর রেগে উঠল। তোর পাড়াতেই তো থাকে, দেখাসাক্ষাৎ হয়?’
‘খুব কম। আমাকে ও আর সহ্য করতে পারে না, কারণ একটা অবশ্য আছে, ভালোই কারণ। নে, খেয়ে ফেল।’ গুণেন্দ্র অধৈর্য স্বরে বলল। ব্রতীন গ্লাস তুলে নিল, এটা তার দ্বিতীয় গ্লাস। গুণেন্দ্র তার চতুর্থ গ্লাস ভরল।
‘বলার চেহারাটা তো দেখেছিস, আমরা ওকে বেঁটে বলি আসলে বামন বলাই উচিত। ওর বিয়ে হচ্ছিল না এইজন্যই। এম এ পাস, নিজেদের বাড়ি, বাপ-মা নেই, ভালো চাকরি ভালো বংশ, দুটো ভাই দুজনই ভালো চাকরি করে। এমন ছেলেকে তো পাত্রীপক্ষ লুফে নেবে। কিন্তু লুফতে এসেও পিছিয়ে যায় শুধু ওর হাইট দেখেই। রোগাকে মোটা করা যায় মোটাকে রোগা কিন্তু বেঁটেকে লম্বা করার কোনো উপায় এখনও বেরোয়নি, হ্যাঁ রে বেরিয়েছে কি?’
ব্রতীন মাথা নাড়ল।
‘শেষমেশ একটা মেয়ে আর আপত্তি না করে বিয়ে করতে রাজি হয়। বিয়েতে বলা আমাকে সপরিবারে নেমন্তন্নও করেছিল। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে বউটির কাঁধের কাছে ওর মাথা পৌঁছাত। গোলমালটা শুরু হল এখান থেকেই। বলার পাশের বাড়িতে আমার বউয়ের বন্ধু থাকে তার কাছ থেকেই শুনেছি। প্রায় ঝগড়াঝাটি হত ওদের। বলা সন্দেহ করত বউকে, প্রেম করছে। কার সঙ্গে করছে সেটাই খুঁজে মরত। কাউকে না পেয়ে ক্ষেপে উঠত, গায়ে হাত তুলত।’ গুণেন্দ্র গ্লাস শেষ করে আবার ভরে নিল। স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর কিন্তু দুটো চোখ ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। ঘরে ঢুকল একজোড়া তরুণ ছেলেমেয়ে। ছেলেটির হাতে হেলমেট। ঘরের লোকেদের মুখগুলো দেখে নিয়ে বেয়ারাকে চাপা গলায় কী বলল। ব্রতীন ওদের হাবভাব দেখে সম্পর্কটা বুঝে নিল।
‘যা বলছিলুম,’ গুণেন্দ্র খেই ধরে শুরু করল, ‘মেন্টাল টর্চার সহ্য করতে না পেরে ওর বউ কাউকে কিছু না বলে একদিন পালিয়ে গেল। বলা খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল গোপনে, লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না, এমনকী ভাইদেরও নয়। পাড়ার লোকেদের বলল, বউ এক বস্ত্রে বাপের বাড়ি গেছে হঠাৎই বাবার স্ট্রোক হবার খবর পেয়ে, ও নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। বলা শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শুনল বউ সেখানে যায়নি। বউয়ের আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে খোঁজখবর করল, পেল না। দু-মাস কেটে গেছে, বলার তখন আধপাগলা অবস্থা, পুলিশে জানাবে কিনা ভাবছে। প্রচুর মিথ্যে কথা বলে যেতে হচ্ছে। শেষকালে রটাল বাবা-মায়ের সঙ্গে লছমনঝোলা যাবার পথে পাহাড় থেকে পা পিছলিয়ে খাদে পড়ে বউ মরে গেছে।’
ব্রতীন অবাক হয়ে বলল, ‘সে কী রে, বউকে মেরে ফেলল!’
‘ফেলল। তারপর শোন না, আমি ট্যুরিস্ট নিয়ে শান্তিনিকেতন গেছি বাসে। উত্তরায়ণে গাইড রবীন্দ্রনাথের বাড়ি ট্যুরিস্টদের দেখাচ্ছে। আমিও দেখছি। বাড়ির সামনের মাঠে তখন এক বুড়ির সঙ্গে দেখি একটি মেয়েকে। লাঠি হাতে পা পা করে বুড়ি হাঁটছে, আর মেয়েটি হাত ধরে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে, মনে হল যেন বলার বউ। ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলুম মুখটা ভালো করে দেখার জন্য। নাইনটি পারসেন্ট নিশ্চিত হলুম আরে ওই তো বলার বউ! নামটা ঠিক মনে ছিল না নইলে পিছন থেকে নাম ধরে ডেকে দেখতুম তাকায় কি না। পক্ষাঘাতে ডান দিকটা পড়ে গেলে ফিজিওথেরাপি করে সারিয়ে তোলার জন্য হাঁটানো হয়, বুড়িটার হাঁটা দেখে মনে হল তাই করানো হচ্ছে।’ গুণেন্দ্রকে থামতে হল, খাবার এসে গেছে। কথা বলতে বলতে সে একটা বোতল শেষ করে দিয়েছে। অন্য বোতলটা থেকে ব্রতীনের গ্লাসে ঢেলে বাকিটা নিজের গ্লাসে ঢালল।
‘না বলবি না, আজ আমি তোর হোস্ট। এক চুমুকে খেয়ে নে।’ গুণেন্দ্র এক চুমুকে নিজে খেতে গিয়ে পারল না, ঢেঁকুর তুলে গ্লাস রেখে দিল। ব্রতীন লক্ষ করল বেয়ারা দুটো গ্লাসে বিয়ার ঢালল। ছেলেটি গ্লাস তুলে কী যেন বলল। লাজুক মুখে দু-পাশে তাকিয়ে মেয়েটি গ্লাস তুলে ইতস্তত করে চুমুক দিয়েই মুখ বিকৃত করে শিউরে উঠল, ব্রতীন হাসল।
‘হাসলি যে!’ গুণেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে ব্রতীনের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকাল। ‘তোর চেনা?’
‘না।’
‘বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এরকম অনেক আসে, গেরস্ত ঘরের মেয়ে, এটাই এদের অ্যাডভেঞ্চার। আগে খেয়ে নে পরে বাকিটুকু বলব।’ গুণেন্দ্র উঠে দাঁড়াল। ‘টয়লেট থেকে ঘুরে আসি, বিয়ার খেলে এই এক ফ্যাকড়া বাধে।’
আধঘণ্টায় খাওয়া শেষ করে ওরা কাফুলোক থেকে বেরোল। মিনিট দশেকে পৌঁছল পার্কসার্কাস হয়ে বেগবাগান। একটা কম চওড়া রাস্তায় গাড়ি ঢুকল।
ব্রতীন বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি?’
‘আমার একটা আস্তানা আছে এখানে। বন্ধুর ফ্ল্যাট। ইনকাম ট্যাক্সে আছে বদলি হয়ে গেছে কানপুরে, আমার জিম্মায় রেখে গেছে ফ্ল্যাটটা। মাঝেমধ্যে আসি জিরোতে।’ গুণেন্দ্র অনুত্তেজিত স্বরে কথাগুলো বলল একটু জড়ানো গলায়।
একটা আটতলা বাক্সর মতো চৌকো খাড়াই বাড়ির গেট দিয়ে গুণেন্দ্র মোটর ঢোকাল। একতলাটা উঠোন, দু-তিনটি মোটর রয়েছে। সে ফাঁকা একটা জায়গা দেখে মোটর রাখল। ‘কাচ তুলে লক করে দে।’
ব্রতীন তাই করল। গুণেন্দ্র এগোল লিফটের দিকে। ব্রতীন কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাল। গেটে তিনটি লোক বসে গল্প করছে, বোধহয় দরোয়ান। সারি দিয়ে লেটারবক্স আর ইলেকট্রিক মিটার। একটা ছোটো ঘর, সম্ভবত জলের পাম্পসেট ওখানেই রয়েছে। কাগজের টুকরো, পলিথিন ব্যাগ, পানপরাগ আর সিগারেটের খালি প্যাকেট উঠোনে ছড়িয়ে। ব্রতীনের মনে হল এখানকার বাসিন্দারা আত্মকেন্দ্রিক, বসবাসের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার কথা ভাবে না। বাড়িতে ঢুকেই লিফটের দিকে এগিয়ে যায় দু-পাশে তাকায়ও না। মুখ তুলে বারো-চোদ্দোটা এয়ারকুলার তার চোখে পড়ল। নিশ্চয় আরও সব দামি দামি আরামের যন্ত্র ফ্ল্যাটগুলোয় আছে। নিশ্চয় এরা কেউ কারোর সঙ্গে আড্ডা দেয় না, ফ্ল্যাটে বসে শুধু টিভি দেখে।
