মাঝারি আকারের ঘর, সাত-আটটা টেবল, বাইরের দিকের দেয়ালে এয়ারকুলার বসানো। পুত্রকন্যা নিয়ে এক বাঙালি দম্পতি, ঝুলছে কাগজের চিনা লন্ঠন, দেয়ালে ছাপাই নিসর্গচিত্র আঁটা। কয়েকজন মহিলা সহ সাত-আটজন লোক আহারে ব্যস্ত তিনটি টেবিলে।
গুণেন্দ্র বলল, ‘এটা ফ্যামিলি এরিয়া, আমাকে চেনে তাই ভিড় না হলে বসতে দেয়। আগে দুটো বিয়ার আনাই, খাস তো?’
‘মাঝেমধ্যে।’
বাঁধানো আট পাতার খাদ্য তালিকা হাতে টেবলে হাজির হল একটি লোক। সেটি অগ্রাহ্য করে বিয়ার ও ভাজা চিংড়ি মাছের বরাদ্দ দিয়ে গুণেন্দ্র বলল, ‘তপেনের মুখটা দেখছিলি যখন বললুম বাড়িতে ডাকাতি করতে যাব, কীরকম বোকা বোকা হয়ে গেল।’
‘তুই ওকে আমার সামনে যেভাবে বললি তাতে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল।’ ব্রতীন অভিযোগের সুরে বলল। ‘কত বছর পর দেখা হল, আমি তো ওর কাছে এখন বাইরের লোকের মতো। তুই এখনও সেই ঠোঁটকাটাই রয়ে গেলি। তোর কথা শুনে মনে হচ্ছিল কীসের যেন একটা ঝাল মেটাচ্ছিস।’
‘আমার এক বন্ধুর বোনের সঙ্গে ওর বিয়ের সম্বন্ধ করি। অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে বাংলা অনার্সে বি-এ। যদি আমার বিয়ে না হয়ে যেত তাহলে আমিই বিয়ে করে নিতুম। তপাকে নিয়ে গিয়ে মেয়ে দেখালুম, ওর খুব পছন্দ হল, বলল বিয়ে করবে। কথাবার্তা অনেক দূর এগোল, তখন ও কলেজে পড়াচ্ছে আর বাড়িতেও শুরু করেছে কোচিং। এর পর হঠাৎ বলল বিয়ে করা সম্ভব নয়, কুষ্ঠিতে মিলছে না। আমি যে কী অপ্রস্তুতে পড়লুম কী বলব। তবে ভালোই হয়েছে মেয়েটির বিয়ে হয়েছে সল্টলেকে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের এক সায়েন্টিস্টের সঙ্গে।’ গুণেন্দ্র থামল বিয়ার এসে যাওয়ায়। বোতল থেকে গ্লাসে ঢেলে দিল বেয়ারা। গুণেন্দ্র একচুমুকে গ্লাস শেষ করে নিজেই বোতল থেকে আবার গ্লাসে ঢালল। ব্রতীন নিজের গ্লাস তুলে ছোট্ট করে চুমুক দিল।
‘ওকী রে! বিয়ার খাচ্ছিস না চা খাচ্ছিস, চোঁ চোঁ করে মেরে দে আমার মতন।’
‘অভ্যেস নেই।’ ব্রতীন একটা বড়ো ঢোঁকে অনেকটা গিলে নিয়ে চোখ বন্ধ করল।
‘যা বলেছিলুম, একদিন শুনলুম তপা বিয়ে করেছে। মেয়েটি বি এসসি, স্কুলে সায়ান্স আর বাড়িতে তিনটে মেয়েকে পড়ায়। তপা বলে প্রেম করে বিয়ে করেছে, বিশ্বাস হয় না। ব্যাটা কোচিংয়ের দোকান খুলবে বলে হিসেব কষে দেখেছে সায়ান্স আর অঙ্ক টিচারের চাহিদা খুব। বাংলা অনার্স দিয়ে মাল বেচা যাবে না।’ গুণেন্দ্র গ্লাস শেষ করে ব্রতীনের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি কর আর দুটো আনাই।’
‘না না দুটো খেতে পারব না।’ ব্রতীন আঁতকে ওর ভাব দেখাল।
‘না পারিস আমি তো আছি ফেলা যাবে না, যতটা পারিস খা। এত বছর পর দেখা। অন্তত আমার জন্য আজ একটু নিয়মভঙ্গ কর। বতু তুই খুব হেলথ কনশাস, না? তোর ভুঁড়ি নেই সেজন্যই। তবে সেক্স লাইফ না থাকলে কিন্তু শরীর থাকবে না।’
গুণেন্দ্র বেয়ারাকে ডেকে দুটো বিয়ার ও এক প্লেট ভাজা চিংড়ি আনতে বলে ব্রতীনকে বলল, ‘যা খাবি এখনই বলে দে। চিনে রেস্টুরেন্টে অর্ডার দিলে কুড়ি মিনিট পর খাবার আসে। বল কী খাবি, সুপ বলি, কাঁকড়ার সুপ, ফ্রায়েড রাইস, নাকি চৌমিন?’
ব্রতীনের ইচ্ছে নেই সুপ খাওয়ার কিন্তু গুণেন্দ্রর মুখের আন্তরিকতাটা তার ভালো লাগল। এত বছর পর স্কুলের বন্ধুকে পেয়ে গুণো যেন কৈশোরে ফিরে যাবার জন্য তাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ব্রতীনের মনে হল সেও তো তাই চেয়েছে নয়তো মুম্বই থেকে সে আসতে যাবে কেন!
‘সুপ আর ফ্রায়েড রাইস বল, দুপুরে নুডলস খেতে ভালো লাগে না।’
শুনেই গুণেন্দ্র টেবলে চাপড় মেরে বলল, ‘আমারও ভালো লাগে না। বাঙালির ছেলে দুপুরে ভাত না পেলে মনে হয় খাওয়াটা ঠিকমতো হল না।’ এরপর দাঁড়িয়ে থাকা বেয়ারাটিকে বলল, ‘শুনলে তো কী কী আনতে হবে, কর্ন ক্র্যাব সুপ, মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর ওর সঙ্গে দু প্লেট চিলি চিকেন। বিয়ারটা তাড়াতাড়ি দাও।’ গ্লাসে সামান্যই বিয়ার পড়ে, সে ব্রতীনের বোতলের বাকিটুকু নিজের গ্লাসে ঢেলে নিল। দেখে মনে মনে ব্রতীন হাঁফ ছাড়ল।
‘বুঝলি বতু, আলি সাহেব যা বলে গেছে খাঁটি সত্যি কথা, সৈয়দ মুজতবা আলি, পড়েছিস?’ উত্তরের জন্য গুণেন্দ্র তাকিয়ে আছে দেখে ব্রতীন বলল, ‘পড়েছি। কী বলে গেছেন?’
‘পৃথিবীতে সেরা খাদ্য চারটে। চিনে, ফরাসি, মোগলাই আর বাকিটা কী বল তো?’
‘বাঙালি হিন্দু বিধবার নিরিমিষ রান্না।’
‘সাবাস। তোর দেখছি মনে আছে।’ গুণেন্দ্র খুশিতে চনমন করে উঠল।
বাঙালি পরিবারটি খাওয়া শেষ করে বিল চুকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। গুণেন্দ্র মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখল। ওরা বেরিয়ে যাবার পর চাপা গলায় বলল, ‘পাছাটা দেখলি, আমার বউয়ের মতো।’
‘গুণো মনে হচ্ছে, তুই বদলাসনি।’
‘কোন শালা বদলাতে চায়, তুই চাস? ষোলো-সতেরো বছর বয়সে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?’
গুণেন্দ্র পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করে কয়েকটা নম্বর টিপে কানে চেপে ধরল। বেয়ারা দুটো বোতল আর ভাজা চিংড়ির প্লেট রেখে বোতলের ছিপি খুলে দিয়ে চলে গেল।
‘হ্যাঁ, কে উমেদ? আমি গুণোবাবু বলছি, ছোটকু আছে? দাও তো ওকে।’ গুণেন্দ্র অপেক্ষা করার ফাঁকে চোখ টিপল ব্রতীনকে। ‘হ্যালো ছোটকু, গুণোদা, কেউ আছে?…হ্যাঁ হ্যাঁ চিনেছি একবার তো এসেছিল। …ঘণ্টাখানেক পরে পাঠিয়ে দে, ট্যাংরায় খাচ্ছি, সঙ্গে বন্ধু, ছোটোবেলার বন্ধু, এখন তো দুটো, তিনটের সময় আসুক, ও তো ফ্ল্যাট চেনে…আচ্ছা আচ্ছা।’ গুণেন্দ্র ফোন বন্ধ করে পকেটে রাখল, মুখে রহস্য মাখানো হাসি। একটা বোতল তুলে ব্রতীনের খালি গ্লাসে ঢালতে লাগল। ফেনা উপচে টেবল ক্লথ ভিজিয়ে দিল। ব্রতীনের মনে হল গুণো যেন হুঁশের বাইরে চলে যাচ্ছে।
