‘মুম্বইয়ে এয়ার পলুশন আছে কিন্তু এতটা শব্দ নেই। কলকাতায় দুটোই মারাত্মক। ইউরোপ আমেরিকায় হাজার হাজার মোটর রাস্তা দিয়ে যায়, একটু শব্দ শুনতে পাবি না। হর্ন বাজালে লোকে তাকিয়ে দেখবে হনুমান দেখার মতো চোখ করে।’
‘তোদের এই এক বদ অভ্যেস, বড়োলোক দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা করা।’ গুণেন্দ্রর গলায় ক্ষোভ। ‘দামি দামি গাড়ি, রেগুলার ওরা মেইন্টেনও করে, একটু পুরনো হলে বিক্রি করে নতুন গাড়ি কেনে। পয়সা থাকলে শিক্ষা থাকলে সভ্য হওয়া যায়। এটা গরিব দেশ ভুলে যাস কেন। ওই যে বাসটা সামনে কেমন ধোঁয়া ছাড়ল দেখলি তো। বাসের মালিক এটা জানে, এঞ্জিনটা ঠিক করে নেবে তো, তা করবে না। করতে গেলেই পয়সা খরচ হবে। দু-চার টাকা লাভ কমলে বাসটার যে আয়ু বাড়বে সেই সঙ্গে আয়ও, সেটা আর মাথায় আসে না।’ গুণেন্দ্র কাঁকুড়গাছির মোড়ে ট্রাফিকে আটকে গিয়ে এতগুলো কথা ব্রতীনকে শুনিয়ে দিল।
ব্রতীন দু-ধারে তাকিয়ে রাস্তা বাড়ি দোকান দেখতে দেখতে বিস্মিত চোখে বলল, ‘গুণো জায়গাটা যে আর চেনা যাচ্ছে না রে। চার বছর আগে এখান দিয়ে এয়ারপোর্ট গেছি তখন তো এত ভিড় আর দোকান দেখিনি। কত ব্যাঙ্ক রে! বললি গরিব দেশ কই গরিবিয়ানার চিহ্ন তো চোখে পড়ছে না। গাড়িগুলোও তো নতুন মডেলের।’
হুঁশিয়ার হয়ে মোড়টা পার হতে হতে গুণেন্দ্র বলল, ‘শুধু একটা জায়গা দেখেই দেশের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করে ফেললি? এই ভিড়ের মধ্যে কত বেকার রয়েছে তা তো আর জানিস না।’
‘ইন্ডাস্ট্রি বাড়লেই বেকারের সংখ্যা কমবে আর পলুশন বাড়লেই নানান রোগ বাড়বে। আমাদের ওষুধ তৈরির ইন্ডাস্ট্রিরও রমরম করে ব্যবসা বাড়বে। এখনই এদেশে এগারো হাজার কোটি টাকা ওষুধের ব্যবসায় খাটছে, এটা আরও বাড়বে। অনেক বেকার তখন চাকরি পাবে অতএব পলুশনের জয় হোক।’ ব্রতীন দু-হাত তুলল জয়ধ্বনি দেওয়ার ভঙ্গিতে।
ইস্টার্ন বাইপাসে পৌঁছে ডানদিকে গাড়ি ঘোরাল গুণেন্দ্র।
‘বতু, এই পলুশন নিয়ে কিন্তু বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে কই সেগুলো নিয়ে তো হইচই হয় না, কাগজে পড়লুম পৃথিবীতে বছরে দুশো কোটি মানুষ যক্ষ্মায় মারা যায়-এইডস রোগের ওপর গবেষণার জন্য টাকার অভাব হয় না অথচ পৃথিবীর সবথেকে বড়ো খুনি যক্ষ্মার গবেষণায় নাকি টাকা পাওয়া যায় না। ভাবলে অবাক লাগে রোগটার আবিষ্কার হয়েছে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, এখনও একে নির্মূল করা গেল না। তোদের মেডিক্যাল সায়ান্স কোনদিকে যে চলেছে বুঝি না, ব্রেনে নিউরো চিপস বসাবার কথা বলা হচ্ছে অথচ সাধারণ সর্দি সারাবার একটা ওষুধ বার করতে পারলি না এখনও। ম্যালেরিয়ায় মানুষ মারা যায় কেন বলতে পারিস? ওষুধ নেই বলে। মশার কাজ মশা করে, কামড়ায়; সায়ান্টিস্টের কাজ মানুষের প্রাণ বাঁচানো, সেটা কি তারা করছে?’
ব্রতীন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল গুণেন্দ্রর মুখের দিকে। এই কী সেই গুণো যাকে তারা ছ্যাবলা ছিটেল চ্যাংড়া বলত তিরিশ বছর আগে! লেখাপড়ায় ছিল অতি সাধারণ, কোনোক্রমে পরীক্ষায় পাস করত। অথচ কী গম্ভীরভাবে এখন বুঝিয়ে দিল জীবন আর জগৎ সম্পর্কে সে ভাবনাচিন্তা করে, খোঁজখবর রাখে। নিউরো চিপস শব্দদুটো কী স্বচ্ছন্দে মুখ থেকে বার করল। সবথেকে বড়ো কথা গুণো ভাবে, কিন্তু ভাবনাটা সেকেলে নয়, ব্যবসা করে কিন্তু খুবই আধুনিক ব্যবসা, লক্ষ লক্ষ টাকা বছরে আয়, বিদেশিদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে-ওর চিন্তাধারা বাস্তবমুখী তো হবেই।
ব্রতীনের কৌতূহল হল গুণেন্দ্রর ব্যক্তিগত জীবন জানতে, তবে এখন কোনো প্রশ্ন নয়, পরে সুযোগ বুঝে করবে।
‘গুণো তখন তুই দাঁত কিড়মিড় করে ‘শুয়োরের বাচ্চচা’ বললি, কেন বললি?’ গুণেন্দ্র চুপ করে রইল দেখে ব্রতীন বলল, ‘পিছনে হর্নের আওয়াজে উত্ত্যক্ত হয়ে উঠে বলেছিলি। এটাই হল হাইপারটেনশন, যা রক্তের শিরাগুলোকে চেপে ধরে হার্টের উপর আরও চাপ তৈরি করে, এর মানে হাই ব্লাডপ্রেশার, কার্ডিয়াক প্রবলেম। ভারতে সবথেকে বেশি পেসমেকার বিক্রি হয় কলকাতায়। এইরকম শব্দ শুনতে শুনতে মানুষ একসময় কালা হয়ে যায়, অনিদ্রা রোগ তৈরি হয় আর সেক্সুয়াল কাজকর্মেও দুর্বলতা দেখা দেয়। পলুশন নিয়ে মোটেই বাড়াবাড়ি হচ্ছে না।’
ভ্রূ কুঁচকে গুণেন্দ্র মুখ পাশে ফিরিয়ে বলল, ‘কী বললি! কী দুর্বল করে দেয়?’
‘সেক্সুয়াল পারফরম্যান্স।’
‘তুই ঠিক জানিস?’
‘আমি জেনেছি একটা রিসার্চ রিপোর্টে, সায়ান্টিস্টদের কথা, তা না হলে সেক্সের ব্যাপারে আমার জানার কথা নয়।’
‘তোর কোনো অভিজ্ঞতাই নেই?’ গুণেন্দ্রকে বিচলিত দেখাল।
‘না।’
‘তোর কখনো দরকার মনেও হয়নি?’
গুণেন্দ্র মুখ টিপে হাসল ব্রতীনকে ইতস্তত করতে দেখে। সে উত্তর পাওয়ার জন্য আবার প্রশ্নটা করল না। ব্রতীন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘এই হচ্ছে ধাপা। এখানকার ফুলকপির স্বাদের তুলনা হয় না।’
ব্রতীন যখন মুগ্ধ চোখে সবুজ ফসল দেখছে গুণেন্দ্র গাড়িটা তখন ডানদিকে একটা রাস্তায় ঢোকাল। সার দিয়ে গোলাপি রঙের উঁচু পাঁচিলের ছিরিছাঁদহীন চিনেদের বাড়ি, লোহার ফটকগুলো লাল রং করা লোহার চাদরে ঢাকা, ভিতরে দেখা যায় না। দেখে মনে হয় কোনো রহস্য যেন গোপন করার চেষ্টা চলছে। রাস্তা ভাঙাচোরা। গুণেন্দ্রর গাড়ি চালানো থেকে ব্রতীনের মনে হল পথটা ওর খুব পরিচিত। কয়েকটা বাঁক নেওয়ার পর চোখে পড়তে লাগল রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ড। গুণেন্দ্র রাস্তা থেকে একটা সরু গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে ‘কাফুলোক’ লেখা রেস্টুরেন্টের সামনে অপেক্ষমাণ দুটো মোটর ও একটা মোটরবাইকের পিছনে গাড়ি রাখল। রেস্টুরেন্টের গায়েই খোলা নর্দমা।
