তপেন তাড়াতাড়ি বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ তুইও আয়।’
ব্রতীন হাত তুলে বলল, ‘দাঁড়া সল্টলেকে আমার খুড়তুতো ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা আছে, অন্য আর একদিন ব্যবস্থা কর।’
তপেন চিন্তিত মুখে বলল, ‘মুশকিলে ফেললি। আমার কলেজ, ইলার স্কুল, ওকে বরং একদিন কামাই করতে পারবে কি না জিজ্ঞেস করে নিয়ে তোকে জানাব। দুজনে চাকরি করলে এই হয় মুশকিল, ছুটির দিন ছাড়া কাউকে নেমন্তন্ন করা যায় না, কোথাও যাওয়াও যায় না।’
‘তপা তুই এখন যাবি কোথায়?’ ব্রতীন জানতে চাইল।
‘হাওড়া স্টেশনে। ওখান থেকে মাধবতলার বাস ধরব। তোরা এখন কী করবি?’
ব্রতীন কিছু বলার আগেই গুণেন্দ্র বলল, ‘আমরা এখন খেতে যাব চিনেপাড়ায়। বতুকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবার আর চান্স পাব কি না জানি না, হাতে যখন সময় আছে তখন ওকে আজ আর ছাড়ছি না, বাইরেই খাওয়াব।’
তপেন বলল, ‘গুণোর এই একটা সুবিধে, কখনো অন্যের চাকরি করেনি তাই দায়দায়িত্ব পালন কী জিনিস সেটা আর জানল না।’ হাত তুলে ঘড়ি দেখে সে ‘উহহহ দেরি হয়ে গেল’ বলেই বাসস্টপের দিকে ছুট দিল। শতবর্ষপূর্তি সভা শেষ হয়েছে। লোকেরা বেরিয়ে যাচ্ছে। গুণেন্দ্র বলল, ‘মাস্টারমশাইদের সঙ্গে দেখা করে যাবি?’
ব্রতীন বিব্রত মুখে বলল, ‘কাউকেই তো চিনি না। কাঞ্জি স্যারকে দেখতে পেলে দেখা করতাম।’
‘উনি তো এখানে দু-বছর পড়িয়েই আই এ এস হয়ে চলে গেছেন, তুই জানিস না?’
ব্রতীন অবাক হয়ে বলল, ‘সে কী, টিচিং লাইনটা ছেড়ে দিলেন! অত ভালো টিচার তো দেখাই যায় না। জানি না কত ভালো অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হয়েছেন তবে নিঃসন্দেহে ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাজগতের। এইসব ব্রিলিয়ান্ট লোকেদেরই তো টিচার হওয়া দরকার।’
গেট থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে গুণেন্দ্র বলল, ‘এখন তো ভদ্রগোছের মাইনে পাচ্ছে। তখন সামান্য মাইনে, সমাজেও সম্মান নেই, কেন মাস্টারি করবে ভালো ছেলেরা? তপাকে তো দেখলি নিজের মাইনে আর বউয়ের মাইনে মিলিয়ে এখন মাসে হাজার দশেক আয় হয় তার সঙ্গে যোগ কর সকাল সন্ধে কোচিং চালিয়ে দুজনে আরও কুড়ি হাজার। আমার ছেলে হপ্তায় তিনদিন পড়ে চারশো টাকা নেয়। এরকম গোটা কুড়ি ছেলে শুধু সকালের শিফটেই পড়ে, সন্ধেয় আছে আর দুটো শিফট।’
গুণেন্দ্র চাবি দিয়ে সামনের দরজা খুলে গাড়িতে উঠল, ভিতর থেকে লক করা অন্য দরজাটা খুলে দিয়ে ব্রতীনকে ডাকল, ‘আয়’। ব্রতীন উঠে তার পাশে বসল।
‘বতু তোকে সঙ্গে নিয়ে খেতে যাব এ চিন্তা কিন্তু আমার মাথায় ছিল না। তপা যখন বলল বউ ছুটি নিতে পারবে কি না জেনে তোকে খেতে বলবে তখনই মাথায় স্ট্রাইক করল, আজ দুজনে একসঙ্গে খাব।’ গুণেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে পিছনের কাচ দিয়ে রাস্তা দেখতে দেখতে গাড়ি পিছনে হটিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কথাগুলো বলল থেমে থেমে। ট্রামরাস্তায় গাড়ি বার করে এনে দক্ষিণমুখো চালাল।
‘কোথায় যাব বল। ট্যাংরা না পার্ক স্ট্রিট?’
ব্রতীনের কাছে দুটোই সমান। খাবার তো একই, পরিবেশটা শুধু আলাদা।
‘খাঁটি চিনে খাবার কোথায় পাওয়া যাবে বল তো?’ ব্রতীন জানতে চাইল।
‘কোথাও পাবি না। সর্বত্র ইন্ডিয়ান জিভের ভালো লাগার মতো করে চিনে খাবার তৈরি হয়, খাঁটি চিনে স্বাদ মুখে দিতে পারবি না। অনেকে নিজেদের ভোজনরসিক প্রমাণ করতে দারুণ বলে বটে, মনে হয় না তারা কোনোদিন ভালো রান্না মুখে দিয়েছে। শুনেছি পার্ক স্ট্রিটের পিপিং একসময় খুব নামকরা রেস্টুরেন্ট ছিল। বতু ট্যাংরাতেই চল। ইস্টার্ন বাইপাস দিয়ে গেছিস কখনো?’
‘বছর চারেক আগে নেমন্তন্ন খেয়ে বাইপাস দিয়ে রাত্তিরে ফিরেছিলুম বালিগঞ্জ থেকে, ওই একবারই।’
‘তাহলে চল বাইপাস দিয়ে ট্যাংরায় যাই।’ গুণেন্দ্র বাঁদিকে গাড়ি ঘোরাল বিবেকানন্দ রোড ধরে মানিকতলার দিকে। এরপর দশ মিনিট গুণেন্দ্র কথা বলার অবকাশ খুব কমই পেল, ক্লাচ-ব্রেক- গিয়ার-মোটরচালনার এই ত্রিবিধ পদ্ধতির প্রয়োগ দ্বারা দুর্ঘটনা এড়াবার কাজে ব্যস্ত থাকায়। মানিকতলার মোড় থেকে পূর্বদিকে সোজা কাঁকুরগাছি যাওয়ার পথে মাঝে একটা খাল।
সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি যাওয়ার সময় ব্রতীন বলল, ‘গুণো এখনও তোরা যে বেঁচে আছিস এটাই পৃথিবীর নবম বিস্ময়। খালের অবস্থা দেখেছিস, দু-ধার থেকে ঝুপড়ি নেমে এসে খালটা বুজিয়ে দিয়েছে, এটা তো মশাদের স্বর্গ। পুত্রকন্যা উৎপাদনের জন্য এমন সুন্দর ব্যবস্থা মশারা আর কোথায় পাবে। হ্যাঁরে গুণো, শুনেছি সল্ট লেকে নাকি উচ্চচশিক্ষিত লোকেরা থাকে!’
‘বতু, মাঝে মাঝে দিল্লি, বোম্বে থেকে এসে লেকচার ঝেড়ে ব্যঙ্গ করে যায় অনেকেই, তারা কিন্তু কলকাতায় থাকে না, কলকাতা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাও নেই।’
ব্রতীন আড়চোখে গুণেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কথাগুলো কী আমাকে উদ্দেশ করে?’
জবাব না দিয়ে গুণেন্দ্র গাড়ি থামাল একটা প্রাইভেট বাসের পিছনে। বাসটা রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। পিছনে শুরু হয়ে গেল অধৈর্য হর্নের শব্দ। শুনতে শুনতে গুণেন্দ্র মুখ বিকৃত করে বলল, ‘শুয়োরের বাচ্চচা।’
‘কাকে বললি?’ ব্রতীন সামনে তাকিয়ে বলল। গুণেন্দ্র জবাব দিল না।
লোক তোলা শেষ করে বাসটা ছাড়ল একরাশ কালো ধোঁয়া বমি করে। ব্রতীন জানলার কাচ তুলে দিল।
