সবাইকে চকিত করে মাইকে শোনা গেল, ‘একটি জরুরি ঘোষণা, এইমাত্র আমাদের কাছে খবর এল মনমোহন ভট্টাচার্য, যাঁকে আজ মঞ্চে আপনাদের সামনে উপস্থিত করাব বলে আমরা ভেবেছিলাম তিনি আজ সকালে আর জি কর হাসপাতালে মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল পঁচাশি। আমরা এবার তাঁর পরলোকগত আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করব। ধন্যবাদ।’
ব্রতীন আর গুণেন্দ্র দাঁড়িয়েই ছিল, মাথাটা শুধু নীচু করল। একটু আগের শব্দমুখর জায়গাটা নিস্তব্ধ। ব্রতীনের চোখ কবজির ঘড়িতে সেকেন্ডের কাঁটায়। টিক টিক করে সরে যাচ্ছে এক একটা বছর। মনমোহন, ওকে দেখেছি কি? কুড়ি বছর আগে রিটায়ার করেছেন, নিশ্চয় দেখেছি। কিন্তু চেহারাটা মনে পড়ছে, ধুতি, খদ্দরের সাদা পাঞ্জাবি গলা পর্যন্ত বোতাম আঁটা। ছিপছিপে কাঁচাপাকা চুল, বুকপকেটে কলম। ব্রতীন নিজের স্মৃতি ক্ষমতাটিকে অটুট অবস্থায় উদ্ধারে ক্ষীণভাবে আত্মপ্রসাদ বোধ করল।
একমিনিট শেষ হতেই গুণেন্দ্র বলল, ‘কর্তব্য পালিত হল, মনমোহন ভটচায মুছে গেল স্কুলের স্মৃতি থেকে। এবার কী করবি?’
‘বাড়ি চলে যাব, খাব-দাব বই নিয়ে শোব।’
অবাক গুণেন্দ্র বলল, ‘বই নিয়ে! কেন বউ নেই?’
‘বিয়ে করিনি।’
গুণেন্দ্রকে এখন বজ্রাহত বলা যায়। বিয়ে ব্যাপারটাকে সে অতি তুচ্ছ এবং বহুবিধ ঝামেলা এড়াবার জন্য পালনীয় কাজ হিসাবে মনে করে। বতু তো ভালোই মাইনে পায় তাহলে একটা বিয়ে করে রাখলে ক্ষতি কী হত? খাওয়া-দাওয়ার মতো দুটো বড়ো সমস্যা যখন ওর নেই তাহলে-‘বতু খুব বেঁচে গেছিস। বিয়ে একবার করে ফেললে মেয়েমানুষ করতে ঝামেলা অনেক বেড়ে যায়। আইবুড়ো থাকলে গায়ে ফুঁ দিয়ে চলা যায়।’
‘তাহলে আইবুড়ো থাকিসনি কেন?’
গুণেন্দ্র উত্তর দিতে গিয়ে ব্রতীনের কানের পাশ দিয়ে দেখল তপেন দত্ত আসছে। ‘আরে এই যে তপা, আয় আয়, অনেক দিন পর, খবর কী তোর? এই দেখ বতুকে পেয়ে গেলুম আর তোকেও।’
তপেনেরও ধুতি পাঞ্জাবি, কাঁধে কাপড়ের একটা ঝোলা। ব্রতীনের থেকেও মাথার সামনের চুল বেশি ওঠা। রং ফরসা, মুখশ্রী ভালো, শরীর দোহারা। তপেন জড়িয়ে ধরল ব্রতীনের হাত।
‘সত্যি অনেকদিন পর। আমি জানতুম এখানে এলে কারোর না কারোর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবেই। গুণোর সঙ্গে তো মাঝেমধ্যে দেখা হয়ই, ওর ছেলে আমার কোচিংয়ে পড়ে।’
‘তোর কোচিং আছে!’ ব্রতীনের কথার সুরে ‘আর একটা বিয়ে করেছিস?’ বা ‘আর একটা ফ্ল্যাট কিনেছিস!’ ধরনের বিস্ময়। তপেন একগাল হাসল জবাব না দিয়ে।
‘কোচিং আছে মানে?’ গুণেন্দ্র বলল চোখ দুটো বড়ো করার জন্য ভ্রূ টেনে তুলে। ‘দু দুটো। একটা ওর আর একটা ওর বউয়ের। আর একটা খুলবে বছর সাতেক পরে মেয়ে বি এ পাস করলেই।’
ব্রতীন বুঝে গেল তপেন গাধা পিটিয়ে টাকা রোজগারের কাজে নেমে গেছে। এম এসসি পড়ার সময় সে একটি ছেলেকে হায়ার সেকেন্ডারির বিজ্ঞানে নম্বর তোলাবার দায়িত্ব নিয়েছিল। ছেলেটির বাবা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মা সমাজসেবা করেন, গ্রামের গরিব মহিলাদের দিয়ে লঙ্কা জিরে হলুদ ইত্যাদি গুঁড়ো করে প্যাকেটে ভরে নানান দোকানে বিক্রির ব্যবস্থা করা এক সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে। দুজনেই ভীষণ ব্যস্ত তাই ছেলেকে চারজন প্রাইভেট টিউটারের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। ব্রতীন সপ্তাহে দু-দিন পড়িয়ে মাসে চারশো টাকা পেত, চব্বিশ বছর আগে। ছেলেটি খাটিয়ে ছিল, উচ্চচমাধ্যমিকে চতুর্থ হয়। কী এক ফাউন্ডেশনের বৃত্তি পেয়ে ছেলেটি আমেরিকার কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে গেছে, ব্রতীন ওইটুকু খবর জানত, ছেলেটির নাম এখনও মনে আছে, অমলেন্দু লাহা।
‘বতু, তোর তো এখন হাতে কাজকম্মো নেই, আয় কাল ডাকাতি করি তপার বাড়িতে। দুপুরবেলা, কলিং বেল বাজাব, যে দরজা খুলবে ঠেলে ঢুকে যাব। তোকে একটা টয় পিস্তল দোব তুই সেটা ধরে গলায় কী পেটে ঠেকাবি। আমি সোজা শোবার ঘরে গিয়ে তোশকটা ওলটাব, তারপর কী দেখব জানিস?’ গুণেন্দ্র থেমে তপেনের মুখের দিকে তাকাল।
তপেন হেসে বলল, ‘কাগজের প্যাকেটে মোড়া থরে থরে হাজার টাকার নোট।’
গুণেন্দ্র সামান্য মিইয়ে গেল, ভেবেছিল কথাগুলো সে-ই বলবে তার আগেই তপেন বলে দিল।
ব্রতীন মজাটা উপভোগ করে বলল, ‘তুই এখন করছিস কী? দেখে তো মাস্টার মাস্টার লাগছে।’
তপেন বলল, ‘মাস্টার তবে কলেজের। হাওয়ায় মাধবতলা বলে একটা জায়গা আছে, বোধহয় নামটা এই প্রথম শুনলি সেখানে পল সায়ান্স পড়াই।’
গুণেন্দ্র বলল, ‘হ্যাঁরে তপা কলেজে পড়াতে যাস-টাস? এই কবে যেন কাগজে পড়লুম কলেজের মাস্টাররা হপ্তায় তিন-চারদিন তিন-চার ঘণ্টার জন্য কলেজে আসে, বছরে মোট চার-পাঁচ মাস পড়ায়, সত্যি, বুঝলি বতু এই এক সুখের চাকরি বছরে ষাট-সত্তর হাজার টাকা মাইনে আর বাড়িতে শিক্ষার দানছত্তর খুলে বিদ্যে বিলিয়ে রোজগার।’
কথাবার্তা বাঁকা পথে চলে যাচ্ছে দেখে ব্রতীন বলল, ‘তপা তোর ছেলেপুলে ক-টি? বউয়ের সঙ্গে আলাপ করব, কবে তোর বাড়ি যাব বল, ছ-দিন কলকাতায় আছি।’
‘আমার একটিই মেয়ে। রবিবার আয়, দুপুরে খাবি।’
‘আমাকে খেতে বললি না তো?’ গুণেন্দ্র কিছুটা আবদার কিছুটা অভিমান মিশিয়ে অভিযোগের সুরে বলল।
