ব্রতীন বিব্রত বোধ করল। তার মনে হল বলদেবের এভাবে রেগে ওঠার মতো কথা গুণেন্দ্র বলেনি বরং রসিকতার চেষ্টাই করেছে তবু যখন রেগে উঠল বুঝতে হবে কোথাও কিছু একটা গোলমাল দুজনের মধ্যে ঘটে আছে এবং সেটা স্কুলে পড়ার সময় ঘটেনি, তাহলে ব্রতীন জানতে পারত। ওরা দুজন পাশাপাশি পাড়ায় থাকত আজও বোধহয় আছে।
‘বলা, তুই এখনও সেই বাড়িতেই আছিস?’ ব্রতীন জিজ্ঞাসা করল।
‘আছি। ওটা আমাদের পৈতৃক বাড়ি, একতলাটা আমি পেয়েছি। আয় না একদিন সকালের দিকে।’ বলদেব মানিব্যাগ থেকে একটা কার্ড বার করে ব্রতীনকে দিল। ‘ফোন নম্বর লেখা আছে। আসার আগে যদি একটা ফোন করিস তাহলে ভালো হয়।’
বলদেব স্কুলগেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে নিয়ে ব্রতীন বলল, ‘হঠাৎ কীরকম চটে উঠল তোর ওপর।’
গুণেন্দ্র শুকনো স্বরে বলল, ‘কারণ, একটা কী দুটো নিশ্চয় আছে।’
ব্রতীন কারণ জানার জন্য আগ্রহ দেখাল না। সেই সময় মাইকে ঘোষণা হল : ‘এবার দু-চার কথা বলবেন অরবিন্দ দত্ত। বিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র আজও আমাদের মধ্যে আছেন ইনি তাঁদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ। অরবিন্দবাবুর বয়স এখন নব্বুই।’
অরবিন্দ দত্ত চেয়ারে বসে রইলেন। মাইকটা তাঁর সামনে আনা হল। তিনি কোনো ভণিতা না করে সোজা শুরু করলেন ঘর্ঘরে শ্লেষ্মা জড়ানো স্বরে, ‘আজকালকার ছেলেপুলেরা শিক্ষক গুরুজনদের একদমই মান্য করে না, শ্রদ্ধা করে না। ইংরিজিতে একটা দরখাস্তও লিখতে পারে না। কালীকিঙ্করবাবু আমাদের পেটারসন সাহেবের গ্রামার পুরো মুখস্থ করিয়েছিলেন। সে গ্রামার বই এখন আর পড়ানো হয় না। পড়াবে কে? মাস্টাররা নিজেরাই তো গ্রামার জানে না।’
অরবিন্দ দত্ত দম নেবার জন্য থামলেন। শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। গুঞ্জন অনুমোদনসূচক বলেই ব্রতীনের মনে হল। অরবিন্দ দত্ত পঁচাত্তর বছর আগে স্কুলে পড়েছেন হয়তো তখন পেটারসন নামের কোনো সাহেবের বই পড়ানো হত। ব্রতীন নামটা এই প্রথম শুনল তবে বাড়িতে সে নেসফিল্ড সাহেবের লেখা পেনসিলের দাগমারা মলাট ছেঁড়া একটা গ্রামার বই দেখেছে। বইটা তার বাবার।
‘আমাদের সময়ে স্কুলে বেত মারা হত একটু বেচাল দেখলেই। অমৃত পণ্ডিতমশায়ের ছিল মস্ত টিকি, সেটা আবার পাকিয়ে গিঁট দেওয়া। তখন আমি সেকেন্ড ক্লাসে পড়ি। প্রভাসরঞ্জন নামে একটি ছেলে হঠাৎ ক্লাসে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা পণ্ডিতমশাই, আকাশের বিদ্যুৎ নাকি টিকি টেনে নেয় আর সেজন্যই টিকিওলাদের ব্রেন খুব টনকো হয়, সত্যি? ওর কথা শুনে ক্লাসের ছেলেরা হেসে ওঠে। পণ্ডিতমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, কার কাছ থেকে তুই এসব কথা শুনেছিস? প্রভাস তখন নাম করল সরোজের। পণ্ডিতমশাই সরোজকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছে। তিনি শুনলেন সরোজের বক্তব্য। সে বলল বাড়িতে বড়দার কাছে শুনেছে, তখন তিনি তাকে সাজানো তিনটে বেতের থেকে মোটা বেতটা নামিয়ে সরোজের দু-হাতের চেটোয় বারো ঘা মেরে বললেন, দাদাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি। দাদা অবশ্য আসেনি, বেত খাওয়ার ভয়ে, সরোজ সাতদিন আঙুল দিয়ে পেনসিল ধরতে পারেনি। এই ছিল আমাদের সময়ের শাসন, এইরকম ছিল তখনকার হেডমাস্টার। আর এখন?’ অরবিন্দ দত্ত নাটকীয় চমক দিতে দশ সেকেন্ড নীরব রইলেন।
ব্রতীনের মনে হল, বুড়োর ব্রেন এখনও তো বেশ টনকোই রয়েছে। বাইরে থেকে জবুথবু মনে হয় বটে কিন্তু এতক্ষণ যেসব বক্তৃতা হল তাতে শুধুই স্তুতি আর বন্দনা, শুনতে শুনতে শ্রোতারা ফিসফাস কথা বলা শুরু করেছিল, বুড়ো বিদ্যুতের শক দিয়ে ঝাঁকিয়ে দিল একঘেয়েমিটাকে।
‘এখন তো শুনি ফিফথ ক্লাসের ছেলেরাও মাস্টারদের সঙ্গে মুখে মুখে তক্কো করে, রাস্তায় মাস্টারদের ধরে পেটায়ও। এসব যদি বন্ধ করতে চান তাহলে এই ভগবতী স্কুলের আমার সময়ের হেডমাস্টারের মতো তিরিশ টাকা মাইনের হেডমাস্টার চাই, আর চাই বেত। নমস্কার।’
দুম করে অরবিন্দ দত্ত বক্তৃতা শেষ করে মুখ ফিরিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ শিক্ষককে যা বললেন মাইকবাহিত হয়ে শ্রোতারা তা শুনতে পেলেন, ‘গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেবে বলেছ, ঠিক দেবে তো বাবা?’
ব্রতীন লক্ষ করল মঞ্চে বসা লোকগুলির মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল যখন হাততালি একটু বেশিক্ষণ ধরে চলল। গুণেন্দ্র উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘হ্যান্ড্রেড পারসেন্ট কারেক্ট বলেছে, চাবকানো স্রেফ চাবকানো দরকার।’
ব্রতীন বলল, ‘চাবুক নয় রে বেতের কথা বললেন। দুটোর মধ্যে প্রচুর তফাত, বেতটা অল্পবয়সিদের জন্য চাবুকটা গুরুজনদের জন্য। তিরিশ টাকা মাইনের হেডমাস্টারের সময় টাকায় ক-মণ চাল পাওয়া যেত বল তো?’
‘কী জানি। বাবার কাছে শুনেছি যুদ্ধের শুরুর সময় খাদি প্রতিষ্ঠান থেকে চাল কিনেছে আড়াই টাকা মণ এখন সেই চাল এগারো টাকা কেজি। ষাট বছরে কী পরিবর্তন হয়ে গেছে বল? পঁচাত্তর বছর আগের মতো মাস্টার আর ছাত্তর এখন আশা করা যায় কী? ভাইকে কুশিক্ষা দিচ্ছে তাই সরোজের দাদাকে আসতে বলেছিল বেতাবে বলে, ভাবতে পারিস!’ গুণেন্দ্র মাথা নাড়ল আক্ষেপে অথবা আগের হেডমাস্টারদের বিলুপ্তি ঘটার জন্য কিনা ব্রতীন বুঝতে পারল না। গুণেন্দ্র আবার বলল, ‘পরিবর্তন যে কতটা ঘটেছে তার খানিকটা তো আমি বুঝতে পারি নিজেকে দিয়ে।’
