শুনে হেসে ফেলে সে বলেছিল, ‘তা বটে। তবে সবাই যদি ট্যুর অপারেটরের কাজে নেমে পড়ে তাহলে ওষুধ তৈরির কাজটা করবে কে?’
সেলুলার ফোন পকেটে রেখে গুণেন্দ্র বক্তৃতা মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁরে বতু কার্ডে গোটা পাঁচেক নাম দেখেছিলুম। ডায়াসে তো চারটে লোক একটা চেয়ার খালি পড়ে রয়েছে, ওটা কার জন্য? দাঁড়া ওই ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করি।’
গুণেন্দ্র কথা বলার জন্য একটি ছেলের দিকে এগিয়ে গেল। ব্রতীন দেখল বলদেব উঠল। সেই একইরকম বেঁটেই রয়ে গেছে। চেয়ারের দুটো সারির মধ্যে দিয়ে হাঁটুতে ধাক্কা দিতে দিতে বেরোচ্ছে। একবার থেমে সামনের চেয়ারে বসা একজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে কী বলল। লোকটি মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বলদেবকে জবাব দিল। ব্রতীনের মনে হল ওই লোকটা তপেন দত্ত। এই তো আরেকজনকে পাওয়া গেল। বলদেব বাৎসরিক স্টাফ ভার্সাস স্টুডেন্ট ক্রিকেট ম্যাচে স্কোরার হয়ে হেডমাস্টার মশায়ের তেরোটা রান বাড়িয়ে দিয়েছিল। আসলে উনি করেছিলেন দু রান। হেডমাস্টারমশাই এটা ধরে ফেলেন, পরে বলদেবকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘একাজ তুমি করতে গেলে কেন?’ সপ্রতিভভাবে সে উত্তর দিয়েছিল, ‘রানটা ডাবল ফিগারের না হলে হেডমাস্টারের সম্মান থাকে না।’ তিনি হাসবেন না ধমকাবেন ঠিক করতে না পেরে বলেছিলেন, ‘আর কোনোদিন স্কোর লিখবে না।’ বলদেবকে আর স্কোর লিখতে হয়নি। পরের বছরই সে কলেজে ভরতি হয়।
গুণেন্দ্র ফিরে এসে বলল, ‘যে লোকটা ভ্যাজ ভ্যাজ করছে ও হল স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট, ওর ডানপাশে এখনকার হেডমাস্টার, বাঁপাশে আমাদের এমপি, তার পাশে কাঁধে চাদর স্কুলের ওল্ডেস্ট জীবিত ছাত্র অরবিন্দ দত্ত, বয়স নব্বুই, স্বদেশি করে মোট এগারো বছর জেল খেটেছে। তার পাশে খালি চেয়ারটা ওল্ডেস্ট জীবিত টিচার মনমোহন ভটচাযের জন্য, কাল ওকে আর জি কর হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে, বয়স পঁচাশি। বতু তুই তো ওই চেয়ারটায় বসতে পারিস।’ গুণেন্দ্রর চোখেমুখে মোটেই হালকামি নেই, গলার স্বরও যথেষ্ট গাঢ়।
ব্রতীন অবাক হয়ে গেল গুণেন্দ্রর এই আচমকা প্রস্তাবে। বলল, ‘আমি! আমি কেন?’
‘একশো বছরের বেস্ট স্টুডেন্ট বলে। তুই তো মাধ্যমিকে থার্টিন্থ হয়েছিলি, দেখ এখনও কেমন মনে করে রেখেছি। এই স্কুল থেকে এখনও কেউ কুড়ি-পঁচিশেও আসেনি। তোর তো হক আছে ওই চেয়ারটায় বসার।’
ব্রতীন হাত থেকে ধুলো ঝাড়ার মতো ভঙ্গিতে বলল, ‘তুই সেই আগেকার মতোই ছিটেল আছিস। মনে করে কার্ড পাঠিয়েছিল সেটাই যথেষ্ট, চেয়ার-ফেয়ার মাথায় থাক। ওই দেখ বলা আসছে। তপেনকে দেখলুম বলার সঙ্গে কথা বলল।’
লম্বায় পাঁচ ফুটের এক ইঞ্চি কম, ঘাড়ে গর্দানে হৃষ্টপুষ্ট, বলদেব ব্যস্তভাবে দ্রুতপায়ে গেটের দিকে যাচ্ছে। গুণেন্দ্র হাঁক দিল, ‘এই বলা।’
বলদেব থমকে দাঁড়াল।
গুণেন্দ্রকে দেখতে না পাওয়ার ভান করে ব্রতীনের দিকে তাকিয়ে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে বলল, ‘বতু না? এখানে দাঁড়িয়ে কেন? সামনে গিয়ে বোস।’
‘বসছি, তুই হনহনিয়ে চললি কোথায়?’ ব্রতীন হাত রাখল বলদেবের কাঁধে, ‘কত বছর পর দেখা। তোদের দেখতে পাব এই আশা নিয়েই তো আজ এখানে এলুম।’
বলদেবের চোখ নরম হয়ে গেল স্মৃতিভারে। বলল, ‘একবার কী দু-বার দেখেছি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিস, তখন তুই কলেজে পড়িস। তারপর আর দেখা হয়নি। চেহারাটা তো দেখছি একই রকম রেখেছিস। আমিও আজ এসেছি কারুর না কারুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভেবে। একঘণ্টা বসে থেকে থেকে এই উঠলুম অফিস যেতে হবে। দুটো থেকে ডিউটি।’
‘দুটো থেকে ডিউটি? কারখানা নাকি!’ ব্রতীন ঠাট্টার সুরে বলল। ‘কারখানাই বটে, খবরের কারখানা, রোজ হাজার কয়েক শব্দ উৎপাদন করতে হয়। আমি চিফ সাব-এডিটর। বতু তোর দেখছি ভুঁড়ি হয়নি।’
ব্রতীনের বেশ আশ্চর্য লাগে কথাটা শুনে। কাকার মেয়ে দেবী গতকাল বলল, ‘বড়দা তোমার তো ভুঁড়ি হওয়ার কথা, হয়নি কেন বলো তো?’ ‘হয়নি কেন মানে?’ সে প্রশ্ন করেছিল কৌতূহলী হয়ে।
দেবী খুবই পরিশ্রমী ন্যাকামিবর্জিত স্বচ্ছ দৃষ্টির মেয়ে। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। যথেষ্ট রকমের ভালো দেহগড়ন ও মুখশ্রী। চার বছর আগে ডিভোর্স করেছে আমেরিকাবাসী স্বামীকে, রায়চৌধুরি বংশে এমন কাজ প্রথম। দেবী হঠাৎ তার ভুঁড়ি না থাকার কারণ জানতে চাইবে এটা তার কাছে অদ্ভুত লেগেছিল।
‘আমাদের বংশের তো সবার, জ্যাঠামশাইয়ের ছিল বাবার তো আছেই, ছোড়দার নেয়াপাতি ধরনের গজিয়েছে, শিগ্গিরিই কুমড়োর শ্যেপ নেবে। এক তুমিই ট্র্যাডিশনের বাইরে রয়ে গেলে।’
‘ট্র্যাডিশনের বাইরে কী শুধু একা আমিই?’ ব্রতীন চোখ পিটপিট করে খুড়তুতো বোনের দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। দেবী হেসে চোখ সরিয়ে নেয়।
মুখ নিরীহ, স্বর নরম করে গুণেন্দ্র বলল, ‘আচ্ছা বলা, দেখে আনন্দ পাবার মতো জিনিস পৃথিবীতে তো প্রচুর আছে, এই যেমন রবিঠাকুরের দাড়ি আছে, আশু মুখুজ্জের গোঁফ আছে, বিবেকানন্দের পাগড়ি আছে, এগুলো দেখ না। বতুর ভুঁড়ি দেখার জন্য তুই ব্যস্ত হচ্ছিস কেন?’
‘মোটেই ব্যস্ত হইনি বরং খুশিই হয়েছি। বন্ধুদের একজন এখনও ইয়াং রয়ে গেছে সেটা বললেই কী দোষের হয়ে যায়? গুণো, কাঠি দেওয়ার অভ্যেসটা তোর আজও গেল না।’ বলদেব উত্তেজিত হয়ে কড়া চোখে গুণেন্দ্রর দিকে তাকাল।
