‘দাঁড়া গাড়িটা রেখে আসছি, স্কুলে যাবি তো?’ উত্তরের অপেক্ষা না করে গুণেন্দ্রমোহন গাড়ি রাস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে একটা চওড়া জায়গা পেয়ে দাঁড় করাল। গাড়ির চাবির রিং আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে গুণেন্দ্র ফিরে এল।
‘কদ্দিন পরে দেখা হল বল তো।’
ব্রতীন বলল, ‘সিক্সটি সেভেনের পর, তিরিশ বছর হল। গাড়িটা তোর?’
‘তবে নাতো কার!’ গুণেন্দ্র বিস্মিত আহত চোখে তাকাল। ‘স্কুলে যাবি তো চল, বক্তৃতা তো শেষ হয়ে গেল বলে।’
ব্রতীন যে গুণোকে শেষবার দেখেছে সে ছিপছিপে, গাল চোপসানো, সরু সরু হাত। খয়েরি ইস্ত্রিবিহীন ট্রাউজার্স, ময়লা হলে বোঝা যেত দু-মাস পর, হাফহাতা ছাপছোপ মারা হাওয়াই শার্ট। গুণোর ওই চেহারাটাই তার চোখে রয়ে গেছে। কিন্তু এখানকার গুণো একদমই অন্যরকম। ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেসব জিনিস রয়েছে, সানগ্লাস, শার্ট, ট্রাউজার্স, ঘড়ি, জুতো, হালকা যে সৌগন্ধ জামা থেকে বেরোচ্ছে এ সবের মোট দাম অন্তত আট-ন হাজার টাকা তো হবেই।
‘বতু, তুই তো পুণে না বোম্বাই কোথায় যেন থাকিস, আজ যে এখানে হঠাৎ?’ গুণেন্দ্র ব্রতীনের কনুই ধরে এগোল স্কুলের গেটের দিকে। গেটের দু-ধারে দুটি ছেলের হাতে ট্রে তাতে গোলাপের কুঁড়ি। যে ঢুকছে তার হাতে একটা কুঁড়ি ধরিয়ে দিচ্ছে। ওরা দুজনও দুটি পেল। দু-ধারে চেয়ার পাতা মাঝে দু-মিটার চওড়া পথ সোজা গেছে মঞ্চ পর্যন্ত। মঞ্চের কাছাকাছি চেয়ারগুলো ভরতি, পিছন দিকের গুটিতিরিশ খালি।
‘কোথা থেকে ঠিকানা পেল জানি না, মুম্বইয়ে, নামটা এখন বোম্বাই নয় মনে রাখিস, অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছে একটা চিঠি, পেয়ে খুব ভালো লাগল, এতবছর পরও মনে করে রেখে দিয়েছে। তুই আজ এলি কেন?’
‘আমার ছেলে তো এখানেই পড়ে, সামনের বছর উচ্চচমাধ্যমিক দেবে। ওর হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিল। কত বছর দেখি না স্কুলের বন্ধুদের, ভাবলুম যাই যদি কারোর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় চুটিয়ে আড্ডা দোব। গুরুর কি কৃপা দেখ প্রথমেই তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। হাতে সময় আছে তোর?’
‘এখনও ছ-দিন সময় আছে। সাত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি।’
ব্রতীন নিজেকে ফুরফুরে বোধ করল গুণোর সঙ্গে দেখা হয়ে। ওকে সে খুব পচ্ছন্দ করত খোলামেলা ব্যবহারের জন্য আর কথাবার্তায় কোনো রাখঢাক ছিল না বলে। মাঝে মাঝে বেপরোয়া কাণ্ড বাধিয়ে নিজেকে জাহির করার একটা উৎকট চেষ্টা ওর মধ্যে দেখা দিত।
ব্রতীন পরে বুঝেছিল কেন ওকে তার ভালো লাগে। যে কাজ করতে বা যে কথা বলতে তার নিজের শিক্ষায় রুচিতে বাধে বা সাহসে কুলোয় না সেটা ঘনিষ্ঠ কেউ অবলীলায় করে দিলে মনে হয় নিজেই করলুম। সে লক্ষ করেছে শচীন টেন্ডুলকর যখন ব্যাট করে তার সঙ্গে সে নিজেও ব্যাট করে, শচীন যখন সেঞ্চুরিতে পৌঁছয় তখন সেও সেঞ্চুরির অংশীদার হয়ে টগবগ করে ওঠে। গুণোর বহু অসংযত অশ্লীল কাজে সে আপত্তি জানিয়েও বাধা দেয়নি বরং উপভোগ করেছে।
‘বতু দেখ তো ওই সেকেন্ড রো লেফট কর্নারে গেরুয়া পাঞ্জাবি পরাটাকে। চেনা চেনা ঠেকছে যেন।’ গুণেন্দ্রর দৃষ্টি অনুসরণ করে ব্রতীন চোখ সরু করে তাকাল।
‘আরে ও তো বলদেব, বলা। ওকে ভোলা যায়! পরীক্ষায় টুকলিতে মাস্টার ছিল।’ ব্রতীন উৎসাহিত গলায় বলে উঠল। ‘যাক আর একটাকে পেলুম। খুঁজে দেখ তো আর কাকে পাওয়া যায়।’
গুণেন্দ্র চোখ বোলাতে লাগল মাথাগুলোয়। ব্রতীন কয়েকপা এগিয়ে গেল। তখনই সেলুলার ফোন বেজে ওঠার শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখল গুণেন্দ্র পকেট থেকে ফোন বার করে কানে ধরেছে।
‘হ্যাঁ বল।’ কিছুক্ষণ অপর দিকের কথা শুনে গুণেন্দ্রর মুখ বিরক্তি আর চিন্তায় কুঁচকে উঠল। ‘তোরা কী নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলি হতভাগা? সারাতে কতক্ষণ লাগবে বলেছে?’ উত্তেজনায় গলা চড়ে গেছে বুঝতে পেরে গুণেন্দ্র স্বর সংবরণ করে বলল, ‘ঠিক আছে তুই এক্ষুনি চেতনের সঙ্গে কথা বল, ওর তো দুটো বাস, একটা হয়তো পাওয়া যেতে পারে। পেলে এক্ষুনি নিয়ে নে, যত টাকা চায় রাজি হয়ে যাবি। ট্যুরিস্টরা হোটেলে ওয়েট করছে মনে থাকে যেন। গুণেন ব্যানার্জির কথার খেলাপ আজ পর্যন্ত হয়নি, শিগ্গির যা চেতনের কাছে। কোনো কথা শুনতে চাই না।’ ফোন বন্ধ করে সে পকেটে রেখে বিড়বিড় করল, ‘দু-হাজার মাইনে নিচ্ছে আর বুদ্ধি করে একটা ব্যবস্থা করে নিতে পারে না।’
‘কী ব্যাপার রে গুণো অত চটে গেলি কেন?’ ব্রতীন এগিয়ে এল।
‘চটব না? ফরেন ট্যুরিস্ট, যাবে বহরমপুর, আমার ওপর দায়িত্ব ঘুরিয়ে আনার, আমার বাসটা গ্যারেজে দিয়েছিলুম দু-দিন আগে, পেছনের বাঁদিকের সাসপেনসারটা একদম বসে গেছে, যাবে নাই বা কেন, আমাদের যা রাস্তা। দুটো ঝাঁকুনি খেলেই বাবারে মারে করে ফরেনাররা। গ্যারেজ বলছে একটার আগে দিতে পারবে না। এখন অন্য ট্রান্সপোর্টারের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে মুখরক্ষা করতে হবে।’
ব্রতীন বুঝে গেল গুণ্যের কাজটা কী। ট্যুরিস্টদের ঘোরার জন্য গাড়ি দেওয়া। কলকাতায় এখন প্রচুর বিদেশি বেড়াতে আসছে। ব্যবসাটা ভালো করে চালাতে পারলে মাসে দেড়-দু লাখ টাকা আয় হয়। মুম্বইয়ে তার অফিসের প্রোডাকশন বিভাগের সুপারভাইজার চিটনিসের শালা ট্যুর অপারেশনের ব্যবসা করে। তার কাছেই সে শুনেছে শ্যালকটি দিনরাত পরিশ্রম করে চার বছরেই এক লাখ টাকার ব্যবসাটা নিয়ে গেছে বছরে পঁচিশ লাখ টাকায়। চিটনিস বলেছিল, ‘চৌধুরীবাবু এত লেখাপড়া শিখে বছরে আড়াই লাখ টাকার চাকরি করে কী লাভ, তার থেকে এইরকম ব্যবসায় নেমে পড়ুন। আমার শালা অর্ডিনারি গ্র্যাজুয়েট দেখুন আপনার দশগুণ আয় করছে। দুনিয়ায় সবকিছুর শেষ কথা তো টাকা। টাকা থাকলে মানমর্যাদা সুখশান্তি সব পাবেন।’
