‘আমাদের নতুন সায়ান্স টিচার।’
সদ্য এম এসসি পাশ করা যুবক বিষ্ণুহরি কাঞ্জিলাল চারমাস আগে তখন পড়াতে এসেছেন। মালকোঁচা দিয়ে ধুতি আর পাঞ্জাবি পরা কাঞ্জিস্যার ক্লাসে মুগ্ধ করে রাখতেন ছেলেদের তাঁর পড়ানোর গুণে। কঠিন বিষয়কে সরল করে বুঝিয়ে দেওয়ায় তাঁর মতো কাউকে ব্রতীন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পায়নি।
‘উনি আমার কাছ থেকে বই নেন। বাকি আট আনা কাল দিয়ে যেয়ো। না দিলে কিন্তু বিষ্টুহরিবাবুকে বলে দেব। নাম কী তোমার?’
ব্রতীন বইটা নিয়ে বাড়ি ফেরে। মাকে দেখাতেই হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মা বলেন, ‘আগে আমি পড়ব, সেই কবে পড়েছিলুম।’ মা ছিল বইয়ের পোকা, এখনও তাই। পর দিন স্কুল যাবার সময় বইওলাকে সে আট আনা শোধ করে দেয়।
এই বইওলাকে দেখে তার মনে হল বোধহয় বত্রিশ বছর আগের লোকটির ছেলে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কতদিন দোকানে বসছেন?’
যুবক অবাক হয়ে গেল হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন শুনে।
‘কেন বলুন তো?’
‘কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করছি। ত্রিশ বছর আগে দেখেছি বসতেন অন্য একজন।’
‘আমার মামা, মারা গেছেন।’
‘ওঁর ছেলেমেয়ে ছিল না?’
‘বিয়েই করেননি।’
ব্রতীনের মুখে ভাবান্তর ঘটল না। সে নিজেও তো বিয়ে করেনি। আগের মতোই মলাট খোলা বইগুলো চিত করে সাজানো। নতুন যা চোখে পড়ল কয়েকটা ইংরেজি ম্যাগাজিন, মলাটে প্রায় উলঙ্গ মেমসাহেবরা উত্তেজক ভঙ্গিতে। যুবকটি লক্ষ করছিল তার মুখভাব। প্রায় কৈফিয়ত দেবার মতো গলায় বলল, ”ওই ম্যাগাজিনগুলোই ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে নয়তো দোকান লাটে উঠে যেত।’
আর কথা বলার কিছু নেই। ব্রতীন সরে গেল। পরপর দোকান। ছবি বাঁধানোর দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াল। একচিলতে হাসিতে ঠোঁট বেঁকে গেল। মিলিটারি পোশাকে নেতাজি কোমরে তরোয়াল। ছবিটা তিরিশ বছর আগে সে দেখেছে, তবে এটা নিশ্চয় সেই ছবিটা নয়। তিরিশ বছরের মধ্যে কম করে শ-দুয়েক নেতাজি বিক্রি তো হয়েছেই। সেই মহাদেব, মাথার জটা থেকে গঙ্গা নামছে, সেই রামকৃষ্ণ-সারদা বসে আছেন মধ্যিখানে মা কালী, রাম-সীতা সিংহাসনে হনুমান বুক চিরে দেখাচ্ছে তার ভক্তি। এরই মাঝে অপ্রত্যাশিত একটা ছবি দেখে তার মজা লাগল:-ব্যাট হাতে সৌরভ গাঙ্গুলি! নিশ্চয় কেনার লোক আছে। ছেলের উৎসাহ বাড়াতে অনেক বাবা অথবা মা ক্রিকেটারকে দেয়ালে ঝোলাবে যদি ছেলে কোনোক্রমে সৌরভ হয়ে যেতে পারে!
পাশেই কবিরাজের দোকান, তারা বলত কোবরেজখানা। শতরঞ্জি ঢাকা তক্তাপোশে বিশালবপু কবিরাজ সত্যপ্রসন্ন গুপ্ত তাকিয়ায় হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে থাকতেন। পাশের কাচের আলমারিতে নানান শিশি, চিনেমাটির বোয়েম। একটা ছোটো টেবলে বসে থাকত কম্পাউন্ডার। ব্রতীন মাঝে মাঝে দেখেছে তক্তাপোশে বসে একটি বা দুটি লোক, বোধহয় রোগী। কম্পাউন্ডারের গলায় কণ্ঠি, সাদা হাফশার্ট পরা, খুব যত্ন করে ওষুধের মোড়ক বানিয়ে খামে ভরছে।
আজ সে দেখল কোবরেজখানার সেই চেহারাটা আর নেই। মাথার সাইনবোর্ডে লেখা-‘সত্যপ্রসন্ন হোমিও হল।’ তক্তাপোশটা নেই। একটা টেবলে তরুণবয়সি ডাক্তারবাবু বসে, রোগী নিয়ে খুবই ব্যস্ত। দুটো বেঞ্চে বসে জনাপাঁচেক পুরুষ ও বাচ্চচা-কোলে গৃহিণী। চেয়ারে একজন রোগী, যার নাড়ি ডাক্তারবাবু এখন দেখছেন হাতঘড়ির দিকে চোখ রেখে। ব্রতীনের মনে হল ডাক্তারের পসার জমে উঠেছে, রোগীরা টেনেটুনে সংসার চালায়, চেহারায় ও কাপড়চোপড়ে সেটাই প্রকট। কাঠের নতুন কাউন্টার, পিছনে সেই পুরোনো আলমারিটা তার মধ্যে ছোটো ছোটো শিশি সাজানো। কম্পাউন্ডারটি অল্পবয়সি, ওষুধের মোড়ক বানিয়ে খামে ভরতে ভরতে এক মহিলাকে বুঝিয়ে কিছু বলছে।
ব্রতীন প্রায় আধমিনিট দাঁড়িয়ে দেখল। বাইরের কাঠের ফলকটায় নতুন পালিশ আরশুলা রঙের । তাতে লেখা: ডাঃ অনুপম গুপ্ত। তারপর কতকগুলো ইংরিজি অক্ষর এবং প্রথম ব্র্যাকেটে ক্যাল। আবার তিনটে অক্ষর এবং ব্র্যাকেটে ইউ এস। বাইরে একটি লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুপম গুপ্ত একবার তাকাল। ব্রতীন ধরে নিল ডাক্তার কোবরেজ মশাইয়েরই ছেলে অথবা ভাইপো।
সে চেঁচিয়ে বলল, ‘কোবরেজমশাই বেঁচে আছেন?’
ডাক্তার চোখ মুদে মাথা কাত করল।
‘বয়স কত হল?’
ডাক্তার রোগীকে জিভ বার করতে বলল, জিভ বেরিয়ে এল। দেখতে দেখতে চেঁচিয়ে, ‘নব্বুই।’
এবার একটা রাস্তা, গুরুদাস স্ট্রিট, তারপরই স্কুলের পাঁচিল। মাইক্রোফোনে বক্তৃতা করছে কেউ: ‘এই ভগবতীচরণ বিদ্যালয় শুধু এই পল্লির নয়, শুধু এই কলকাতার নয়, শুধু এই পশ্চিমবঙ্গের নয়, সারা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক বিদ্যাশিক্ষা ভবন।’ ব্রতীন রাস্তা পার হবার জন্য পা বাড়াল, আর তখনই গাড়িটা ট্রাম রাস্তা থেকে বেশ জোরেই বাঁক নিয়ে ঢুকে ব্রতীনের একফুট দূরে ব্রেক কষে থামল।
চমকে উঠে সে একপা পিছিয়ে গাড়ির চালকের দিকে তাকাল। দেখল চালক কালোকাচের চশমা পরা, ঠোঁট ছড়িয়ে হাসছে। নিশ্চয় চেনা কেউ নয়তো এমন রসিকতা করতে পারত না। ভালো চালায়, গাড়ির ব্রেকটাও ভালো। চোখদুটো দেখা গেলে নিশ্চয় চিনতে পারত।
চালক চশমা খুলে নীচু হয়ে ঝুঁকে জানলার দিকে মুখ এগিয়ে এনে বলল, ‘কীরে শালা, চোখ বুজে হাঁটার ওভ্যেসটা এখনও গেল না।’
‘গুণো! তাই বল। নইলে এমন বদ রসিকতা আর কে করবে!’
