এরপর সে জয় ঘোষ লেন ধরে এগিয়ে পড়ল প্রফুল্ল মল্লিক স্ট্রিটে। রাস্তাটা গিয়ে পড়েছে বিধান সরণিতে। এখানে থাকত বা এখনও থাকে নীলেশ, নীলেশ অধিকারী, নীলু। স্কুলের কাছেই বাড়ি, টিফিনের সময় সে বাড়ি গিয়ে ভাত খেত। স্কুল থেকে বেরোতে হলে গেট পাশ লাগত, সেটা দেখতে ট্রেনের মান্থলি টিকিটের মতো, প্রতি মাসে একটাকা দিয়ে রিনিউ করাতে হত। নীলুকে শুধু এইজন্যই সে হিংসে করত, দুপুরে বাড়ি গিয়ে ও পেট ভরে ভাত খেয়ে আসে। স্কুলে আসার জন্য সকাল সাড়ে ন-টায় ভাত খেলে দুপুরে খিদে পাবেই। নীলুর পরিতৃপ্ত মুখটা দেখলে চুঁইচুঁই করা পেট মুচড়ে উঠত।
একদিন নীলু বলল, তুই বেশ আছিস, সকালে ভাত-টাত খেয়ে স্কুলে আসিস, আমাদের উনুনই ধরে সকাল দশটায়। বাবা সক্কালবেলা বেরিয়ে যায় দোকান খুলতে। বাজারেই মাখন পাঁউরুটি খেয়ে নেয়। বাসি রুটি-তরকারি খেয়ে স্কুলে আসি, খেতে ইচ্ছে করে না, বাবা গরম ভাত খেতে ভালোবাসে তাই দুপুরে ভাতের হাঁড়ি চড়ে, দোকান থেকে এসে বাবা খেয়ে আর একটু ঘুমিয়ে নিয়ে আবার দোকানে যায়।’ হাতিবাগান বাজারে নীলুদের মুদির দোকান।
নীলুর বাবার গরম ভাত খাওয়ার সাধ মেটানোর আর বাসি রুটি খেয়ে স্কুলে আসার কথা শুনে তার পেটের জ্বালা একটু কমে ছিল। নীলু পরে ভালো ওয়াটার পোলো প্লেয়ার হয়। ব্রতীনকে সে হেদোয় সেন্ট্রাল ক্লাবে ভরতি করিয়ে দেয়। এক মাসেই সে নভিস থেকে সুইমার হয়েছিল পরীক্ষা দিয়ে। পরীক্ষা নিয়েছিল নীলুর বড়োমামা সুধীরদা। ‘প্লাটফর্ম থেকে ডাইভ দাও….দু-হাত তোলো।’ ডুবজলে সে দু-হাত তোলে। ‘চিত সাঁতার কাটো’, সে তিরিশ মিটার সাঁতরে আসে। ‘একশো মিটার ফ্রিস্টাইল’, সে পঞ্চাশ মিটার এপার-ওপার করে। ওই একটা বছরই সে হেদোর জলে নেমেছিল। আর সাঁতার কাটেনি।
নীলেশের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখল ধুতি আর গেঞ্জি পরা পাকা চুলের এক শীর্ণকায় লোক বাড়িটায় ঢুকছে হাতে লাঠি আর পলিব্যাগ।
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘নীলু কি এই বাড়িতেই থাকে?’
কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘থাকে। আপনি কে?’
‘আমি ওর স্কুলের বন্ধু, একই ক্লাসে পড়েছি। আপনি কি ওর বাবা?’
‘হ্যাঁ। নীলু তো এখন দোকানে।’
তার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা হল, এখনও কি গরম ভাত না খেলে আপনার খাওয়া হয় না? তার বদলে জিজ্ঞাসা করল, ‘কখন ওকে বাড়িতে পাব?’
‘দুপুরে ভাত খেতে আসবে তারপর একটু ঘুমোবে তখন দেখা করতে এসো।’
ব্রতীনের হাসি পেল। সেই ট্রাডিশন সমানে চলিতেছে।
‘ওকে বলবেন বতু এসেছিল, ব্রতীন।’
কয়েক পা এগোতেই উপর থেকে পানের পিক পড়ল তার তিনহাত সামনে। থমকে সে উপরে তাকাতেই ঘোমটা দেওয়া একটা মুখ জানলা থেকে চট করে সরে গেল। সামনে যে লোকটি আসছিল মন্তব্য করল, ‘কবে যে এদের সিভিক সেন্স হবে।’ তারপরই বলল, ‘আপনার নাম ব্রতীন না?’
‘হ্যাঁ, আপনাকে তো চিনলাম না।’
‘আমি আপনার এক ক্লাস নীচে পড়তুম। আপনাকে চিনি, স্কুলে ভালো ছাত্র ছিলেন, স্যাররা বলতেন ব্রিলিয়ান্ট। অনেক বছর পর দেখলুম।’
‘আমি তাহলে খুব বেশি বদলাইনি। তুমি এখন কী করছ?’ ব্রতীন নামটা আর জিজ্ঞাসা করল না। ওটা নিরর্থক। সে নিশ্চিত এর সঙ্গে জীবনে আর দেখা হবে না।
‘পি অ্যান্ড টিতে চাকরি করছি। বেলেঘাটা পোস্ট অফিসে আছি।’
‘অফিস যাওনি এখনও?’ ব্রতীন ঘড়ি দেখল, দশটা-কুড়ি।
‘এই যাব, আপনি এদিকে কোথায় চললেন?’
‘স্কুলে। সেন্টিনারি সভা হচ্ছে। তুমি যাবে না?’
‘অফিস রয়েছে। উইক ডেজে না করে ছুটির দিনে তো করতে পারত।’
ব্রতীন কথা না বাড়িয়ে এগোল। ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে ডানদিকে একশো মিটার গেলে স্কুল। সে ট্রাম রাস্তা পার হল। পরপর পুরোনো বইয়ের দোকান, ঘড়ির দোকান, চশমার দোকান, কবিরাজখানা, রেস্তোরাঁ, ছবি বাঁধাইয়ের দোকান। সব একইরকম রয়েছে শুধু ভিতরের মানুষগুলো বদলেছে।
পুরোনো বইয়ের দোকানিটি এক যুবক। তখন বসত কালো, রোগা, জিরজিরে বুক, ফতুয়া পরা, পাতা কাটা কাঁচাপাকা চুল এক আধবুড়ো। স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন সে পেতে রাখা মলাট ওলটানো বইগুলোর নামের উপর চোখ বোলাত। একদিন ‘বাগদি ডাকাত’ নামটা দেখে সে থেমে যায়, বইটা তুলে পাতা ওলাটাতে থাকে। মিনিট তিনেক পর লোকটা বলে, ‘সঙ্গে পয়সা আছে? ভালো বই। পয়সা না থাকে তো রেখে দাও।’
পকেটে ছিল একটা আধুলি। সে কিন্তু কিন্তু করে বলেছিল, ‘আট আনা আছে।’ তারপর বইটার দাম দেখে, আড়াই টাকা। একটা লাইব্রেরির স্ট্যাম্প মারা, ‘পূর্বাচল ১৯৪৮।’ শুধু বাগদি ডাকাত নয় তার সঙ্গে রয়েছে ‘বিশেডাকাত’।
চকচক করে উঠেছিল তার চোখ। ভিক্ষে চাওয়ার মতো গলায় বলেছিল, ‘দেবেন?’
লোকটা চোখ বড়ো করে বলে, ‘আট আনায়, পাগল! বইয়ের কন্ডিশান দেখেছ? একেবারে নতুন। একটাকার কমে হবে না। লিখেছে কে দেখেছ, খগেন মিত্তির, ভীষণ নামকরা লেখক।’
সে মিনতি করে বলেছিল, ‘কাল টাকা নিয়ে আসব, বইটা রেখে দেবেন?’
লোকটা বলে, ‘বিক্রি না হয়ে গেলে থাকবে।’
বাড়ি যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে, লোকটা ডাকল, ‘শোনো খোকা, ভগবতী ইস্কুলে পড়ো?’ সে ‘হ্যাঁ’ বলতেই জিজ্ঞাসা করে, ‘কোন কেলাসে?’
সে বলে, ‘ক্লাস নাইন।’
‘বিষ্টুহরিবাবুকে চেনো?’
