মনগড়া এই কারণটাকে একসময় তার যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হয় না। যদি সত্যিসত্যিই তাকে ভালো লেগে থাকে তাহলে বাবা যত ভয়ংকরই হোক বিকেলেও বারান্দায় দাঁড়াতই, তাকে একবার চোখের দেখা দেখতে। এক ধরনের অধিকারবোধের থেকে জন্মানো দাবি তাকে তখন আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, ভালো লাগা কথাটাকে সে ততদিনে ভালোবাসায় বদলে ফেলেছে। তখন সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত ভালোবাসলে পৃথিবীতে এমন কোনো বাধা নেই যা অগ্রাহ্য করা যায় না। তখন তার মনের আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শরীরের কিছু নতুন ব্যাপার ফলে মেয়েদের সম্পর্কে সে অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেছে। এই ভাবনায় প্রথম যাকে জড়ালো সে বাসন্তী। কিন্তু সংকোচে, লজ্জায় বা ভয়ে সে কোনোদিনই নিজেকে উদঘাটন করতে সাহস পায়নি পাশের গলির, রোগা, কম কথা বলা পরিষ্কার মাথার মেয়েটির কাছে।
আশু দেব লেনের বাঁক ঘুরেই ব্রতীনের চোখ উঠে গেল বারান্দায়। শাড়ি, শায়া, শার্ট ও মোজা রেলিংয়ে শুকোচ্ছে। চন্দনা পাখিটা নেই। তার চোখ ঘুরে গেল সামনের সেই রকটায় যেখানে দুই প্রৌঢ় বসে গল্প করত। রকটায় এক ইস্ত্রিওলা লম্বা একটা কাঠের টেবলে কাপড় ইস্ত্রি করছে, পাশে একটা কয়লার উনুন। ইউনিভার্সাল প্রিন্টার্স সাইনবোর্ডটা নেই।
সে দাঁড়িয়ে এধার ওধার তাকাল যদি পুরনো কোনো মুখ চোখে পড়ে। রাস্তায় লোক বেড়ে গেছে। অনেকগুলো মুখ সে তিরিশ বছর কমিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করল তার চেনা লাগে কি না। ইস্ত্রিওলার কাছে কাচা কাপড় বুকের কাছে জড়ো করে ধরে লুঙ্গিপরা মাঝবয়সি একটি লোক দাঁড়িয়ে। নিশ্চয় এই পাড়ারই লোক এবং পুরনো বাসিন্দা বলেই তার মনে হল।
‘আচ্ছা দাদা এই বাড়িতে একটা প্রেস ছিল না?’ ব্রতীন জিজ্ঞাসা করল নম্র স্বরে।
লোকটি অবাক হল, কপাল কুঁচকে বলল, ‘হ্যাঁ ছিল, সে তো বহুকাল আগের কথা।’
‘প্রেসটা কোথাও উঠে গেছে কিনা জানেন?’
‘না জানি না। তবে শুনেছি ভালো চলছিল না, প্রচুর দেনা হয়ে যায় তাই বাড়িসমেত প্রেসটা বিক্রি করে দিয়ে অনাদি সুর বেহালা না গড়িয়ায় চলে গেছে, তা আজ থেকে বছর পঁচিশ আগে হবে। আপনি এতদিন পর ওর খবর নিচ্ছেন!’ লোকটি নিশ্চয়ই অবাক হতে পারে এবং হলও।
লোকটি প্রশ্ন করেনি কৌতূহল প্রকাশ করেছে। ব্রতীন সামলাবার জন্য এবং নিজের কৌতূহল মেটাবার জন্য বলল, ‘ওর একটি মেয়ে ছিল, তার সঙ্গে আমার এক আত্মীয়ের বিয়ের সম্বন্ধ হয় কিন্তু মেয়েটি বিয়ে করবে না বলে বেঁকে বসে। বলতে পারেন মেয়েটির বিয়ে হয়েছে কিনা?’
‘বুড়ি! ওর ভালো নাম জানি না। সে তো এই পাশের গোলাপবাগান বস্তিরই একটা ছেলেকে বিয়ে করে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। ছেলেটা ইলেকট্রিক মিস্তিরি। আপনার আত্মীয় খুব বাঁচান বেঁচে গেছে ওই মেয়েকে বিয়ে না করে।’
ব্রতীন বিষণ্ণ বোধ করল। যৌবনের মাধুর্য মাদকতা উত্তেজনার দরজা প্রথম খুলে দিয়েছিল এই বুড়িই। মাথায় ছোলা ফেলতে ফেলতে একদিন ফেলল দলাপাকানো একটা কাগজ, চিঠি! সে ঝুঁকে কুড়িয়ে নিতে গিয়ে দেখে রকে বসা দুজনের একজন তার দিকে তাকিয়েই বারান্দার দিকে তাকাল, সে কাগজটা কুড়িয়ে নিতে গিয়েও নিল না লজ্জায় আর ভয়ে। এই রাস্তা দিয়ে দু-বেলা সে যাতায়াত করে, ওরা তাকে দেখে। এবার থেকে ওরা তার সম্পর্কে কী ধারণা করবে? ব্রতীন সোজা তাকিয়ে হেঁটে যায়, কাগজটা পড়ে থাকে রাস্তায়। সেই দিনের পর কখনো আর এই রাস্তা দিয়ে সে হাঁটেনি।
রাস্তার যে জায়গাটায় কাগজটা এসে পড়ে সেখানে সে তাকাল। শেষ পর্যন্ত কি ওখানেই পড়ে থেকে ছিল নাকি ওই দুটি লোকের একজন রক থেকে উঠে এসে কুড়িয়ে নেয়! ওটায় কী লেখা ছিল? তিরিশ বছর পর ব্রতীন হঠাৎই বুকের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে পেল।
সে আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। মেয়েদের কর্পোরেশন স্কুলের পাশের বাড়ির একতলার জানলার নীচের দেয়ালে রং দিয়ে আঁকা কালীর ছবি তার পাশে বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ। এমন জায়গায় শিল্পচর্চার কারণ জানতে সে ক্ষণেকের জন্য দাঁড়াল। জানলা দিয়ে এক বুড়ি বলল, ‘পেচ্ছাপ করলেই দেবতার মুখে, করবে?’
এবার একটা শীতলা মন্দির। সামনে দিয়ে যাবার সময় চোখ বুজত। মন্দিরটা একইরকম রয়েছে। আজ সে চোখ বুজল না। পাশে ছিল একটা তেলেভাজার দোকান, এখন সেটা হয়েছে ইলেকট্রিক সরঞ্জামের দোকান। দোকানে বসা বুড়ো লোকটিকে দেখে মনে হল একেই যেন আলুর চপ ভাজতে দেখেছে।
একতলা বাড়িটা একতলাই রয়ে গেছে, এই বাড়ির একটা ছেলে একবছর তাদের সঙ্গে পড়ে ফেল করে ক্লাস এইটেই রয়ে যায়। শিবু, ভালো নাম ছিল শিবেন্দ্র। তার সঙ্গে খুবই ভাব হয়ে যায়। শিবুর কণ্ঠস্বর ছিল উদাত্ত সুরেলা, চমৎকার আবৃত্তি করত। নির্মলেন্দু লাহিড়িকে হুবহু নকল করে সে ‘দেবতার গ্রাস’ আবৃত্তি করেছিল টিচার্স রুমে কনকবাবুর বিদায় সংবর্ধনা সভায়। কনকবাবুই ওকে বাংলায় একশোয় সতেরো নম্বর দিয়েছিলেন অ্যানুয়াল পরীক্ষায়। শিবু একদিন তাকে আচমকা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘হ্যাঁরে বতু আমাকে দেখে তুই আড়ষ্ট হয়ে যাস দেখি। কেন, ফেল করেছি বলে? আড়ষ্ট তো আমার হওয়ার কথা, লজ্জা তো আমিই পাব।’
সে থতমত হয়ে গেছল শিবুর এমন এক স্বীকারোক্তিতে। ওর ব্যর্থতা আর সারল্য, তাকে এক ধরনের লজ্জায় ফেলে দেয়। পড়াশুনোয় শিবু ভালো ছিল না। বলত, ‘আমার মাথায় ঢোকে না কিন্তু তোর মাথায় তো দিব্যি ঢোকে। দেখতে হবে কী আছে তোর মাথার মধ্যে।’ দেখা আর হয়নি, শিবু আবার ফেল করে। পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে স্কুল থেকে সে কোথায় চলে গেল কেউ জানে না। ওর বাড়ির লোক যথাসাধ্য খোঁজাখুজি করেছিল। ওর মা তার কাছে এসেছিল শিবু যদি কিছু বলে গিয়ে থাকে। শিবু তাকে কিছু বলে যায়নি। ব্রতীনের ইচ্ছে করল শিবুর মা-র সঙ্গে দেখা করে যায়। তারপরই মনে হল এখনও কি উনি বেঁচে আছেন? ত্রিশ-বত্রিশ বছর তো কেটে গেছে।
