মহামায়া পাইস হোটেলের দু-বেলায় খদ্দের উমাপদ এই দ্বিতীয় টোপটি উপেক্ষা করতে না পেরে গিলে ফেলেন। এতদ্দ্বারা প্রভূত উপকৃত হয় ব্রতীন। উমাপদর কঠোর শৃঙ্খলা ও সস্নেহ শাসনের বাতাবরণে তার পড়াশুনো এগিয়ে যায়। প্রায় সমবয়সি একটি ভালো ছাত্রীর সঙ্গে রেষারেষি করে পড়া এবং তার মতন বার্ষিক পরীক্ষার প্রথম স্থান পাওয়ার জন্য উত্তেজিত হয়ে সে বই ও পরিশ্রমে ডুবে যায়। বছরের শেষে দেখা গেল দুজনেই প্রথম স্থান পেয়েছে। ব্রতীন বুঝে গেল কম কথা বলা লাজুক বাসন্তী তার সঙ্গে পাঞ্জা কষার জন্য আড়ালে তৈরি হয়েছিল। স্কুল ফাইনাল পাস করার পরও ব্রতীন বি এসসি-তে ভরতি হওয়ার আগে পর্যন্ত তালিম নিয়েছে উমাপদর কাছে। ওরা দুজন চারবছর প্রতি সন্ধ্যায় উমাপদর দু-পাশে টেবলে দু-ঘণ্টা বসে পড়েছে ও শুনেছে কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা প্রয়োজন ছাড়া একবারও বলেনি। রাস্তায় বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। স্মিত হেসে দুজনে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে।
ব্যাপারটা ব্রতীনকে আজও ধাঁধায় রেখেছে। হতে পারে বাসন্তী মুখচোরা লাজুক তাই বলে চার চারটে বছর, একটাও বাড়তি কথা না বলে থাকতে পারলে কী করে! সে হিসেব করে দেখেছে বছরে মোটামুটি তিনশো দিন, চার বছরে বারোশো দিন, দিনে দু-ঘণ্টা করে হলে হয় চব্বিশশো ঘণ্টা। তার ধারণা ঘণ্টায় দুটো কি তিনটে ‘একস্ট্রা রিফিল আছে?’ বা ‘ইন্সট্রুমেন্ট বক্সটা দাও তো’ জাতীয় বাক্য তারা বিনিময় করেছে। দেওয়াল ঘড়িতে ন-টা বাজলেই উমাপদ বলতেন, ‘এবার বাড়ি যাও।’ বাসন্তী বইখাতা গুছিয়ে কাপড়ের থলিতে ভরে সেটা কাঁধে ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াত। তখন ব্রতীন আড়চোখে তাকাত উমাপদর মাথার উপর দিয়ে। পলকের জন্য চোখাচোখি হবে এবং এক সেকেন্ডও দেরি না করে বাসন্তী ঘর ছেড়ে যাবে।
ব্রতীন দুটো রাস্তা পেরিয়ে এল। এখান থেকে ইংরেজি ‘ওয়াই’-এর মতো দু-দিকে চলে গেছে আশু দেব লেন আর গোলাপবাগান স্ট্রিট। দুটো রাস্তা দিয়েই তার স্কুলে যাওয়া যায়। সে ইচ্ছামতো এক একদিন রাস্তা বেছে নিত। ব্রতীন কী ভেবে আজ আশু দেব লেন বেছে নিল। বেছে নেওয়ার কারণ একটা বারান্দা সে দেখবে বলে।
এই বাঁকটা ঘুরেই বাঁদিকে দোতলার সেই টানা বারান্দাটা। ঢালাই লোহার নকশাদার রেলিং। রোদ বৃষ্টির ছাঁট আটকাবার জন্য বারান্দাটা সিলিং থেকে আধখানা ঢাকা কাঠের খড়খড়ি দিয়ে। লোহার চেইনে ঝোলানো দাঁড়, তাতে বসা একটা চন্দনা। ফ্রকপরা এক কিশোরী, শ্যামবর্ণ, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা ঝাঁকড়া চুল, চোখা নাক, চঞ্চল চোখ, এই সময়ই চন্দনার মুখের কাছে ছোলাভরা হাতটা এগিয়ে ধরে থাকত। চন্দনাটা একটা একটা ছোলা ঠোঁট দিয়ে তুলত।
ব্রতীন তখন ক্লাস টেন-এ পড়ে। লম্বা এবং বলিষ্ঠ, যুবকের মতো দেখতে। কয়েকদিন বারান্দায় চন্দনাটার দিকে সে তাকাল। অবশ্যই মেয়েটিও তার দৃষ্টিপথে এল। এরপর সে শুধু মেয়েটিকে দেখার জন্যই মুখ তুলত এবং লক্ষ করল মেয়েটি মুখ নামিয়ে চোখে হাসি মাখিয়ে তাকে দেখছে। বাড়িটার উলটোদিকে একটা লম্বা রক তাতে প্রায়ই এইসময় দুটি প্রৌঢ় বসে গল্প করে। ব্রতীন বারান্দার দিকে তাকাবার আগে দেখে নিত লোক দুটি তাকে দেখছে কি না। একদিন মাথায় একটা ছোলা পড়ল, ব্রতীন প্রথমেই তাকাল রকের দিকে। লোক দুটো পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, দেখতে পায়নি মেয়েটির ছোলা ছোড়া। সে মাথায় হাত বুলিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। কেন যে সে এই কাজটি করে ফেলল তাই নিয়ে পরে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছে।
পরপর কিছুদিন তার মাথায় কাঁধে কপালে ছোলা পড়ল। সে মাথায় হাত বুলিয়ে যদি দেখত লোক দুটি রকে বসে নেই তাহলে মুখ তুলে তাকিয়ে হাসত বা ভ্রূ কোঁচকাত। ব্যাপারটা একটা খেলার মতো হয়ে দাঁড়ায়। তখন আশু দেব লেনের ওই বাঁকটার কাছাকাছি এলেই উত্তেজনার হলকায় তার মুখ গরম হয়ে উঠত। ওকে দেখতে পাবে এই প্রত্যাশায় ঢিবঢিব করা বুকে বাঁকটা ঘুরেই সে বারান্দার দিকে তাকাত। দেখতে পেয়েই তার বুক হালকা লাগত, মাথার মধ্যে ফুরফুরে হাওয়া বয়ে যেত। তার মনে হয়েছিল তাকে দেখে ওর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠত খুশি। তার চলার সঙ্গে সঙ্গে বারান্দায় এক ধার থেকে অন্য ধারে সরে সরে যেত ও। রেলিংয়ের উপরের কাঠের বাতান ঠিক ওর বুকের নীচে। ব্রতীন আভাস পেত ওর ভেপে ফুলে ওঠা বুকের।
একসময় তার মনে হল ও তাকে কিছু জানাতে চায়। ও যখন বারান্দায় থাকে তখন দ্বিতীয় কোনো লোক থাকে না। বাড়িটায় কি ও একা? সাধারণত শুকোবার জন্য জামাকাপড় বারান্দায় ঝোলে কিন্তু সে একটি কাপড়ও কখনো ঝুলতে দেখেনি। স্কুল থেকে ফেরার সময় সে কোনোদিনই ওকে দেখতে পায়নি। এটা তাকে বিস্মিত ও হতাশ করেছিল।
সে তখন মনে মনে কতকগুলো কারণ খুঁজে বার করার চেষ্টা করে। চন্দনাটা আছে যখন বাড়িতে নিশ্চয় আরও মানুষ আছে তবে সংখ্যায় কম। একতলায় সদর দরজার উপর সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘দি ইউনিভার্সাল প্রিন্টার্স’। নামেই বোঝা যায় একতলায় আছে একটা ছাপাখানা, হয়তো সেটা ওদেরই। ওর বাবা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছাপাখানাতেই কাটায়। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে চেয়ারে বসা দু-তিনটে মাথা দেখতে পায়, তাদেরই একজন হয়তো ওর বাবা। খুব কড়া লোক। মেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াক সেটা একদমই পছন্দ করে না। এইরকম স্বভাবের লোক সে দেখেছে তাদের পাড়াতেই। বাড়ির বউ বা মেয়ে জানালায় কী বারান্দায় দাঁড়ালে রেগে যাচ্ছেতাই নোংরা কথা বলে এমনকী গায়ে হাতও তোলে। বাবা যখন ছাপাখানায় থাকে মেয়ে শুধু তখনই বারান্দায় আসার সুযোগ পায়। বাবা দুপুরে দোতলায় উঠে আসে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত হয়তো থাকে। সেই সময় ও বারান্দায় আসতে পারে না।
