‘দাও।’
ব্রজরাখাল ফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। টেবলে দামি সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। ফোন ডায়াল করতে করতে আড়চোখে তিনি দেখলেন প্যাকেট থেকে শ্রীমন্ত একটা সিগারেট বার করে ঠোঁটে চেপে ধরল। চোখের দৃষ্টি সে ঘুরিয়ে নিল। ওধার থেকে সাড়া দেবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সে লাইটার জ্বালার খস-খস শব্দ পেল।
‘হ্যালো, হ্যাঁ আমি ব্রজ মুখুজ্জে। আমি তো বলেই ছিলাম রাজি হবে। আপনার মেয়েকে ভাগ্নেবউ করার সৌভাগ্য…আরে না না, আমার বাবা বিপ্লবী ছিলেন তাতেই এই পরিবারের মর্যাদা, সম্মান, আমি আর কতটুকু কী করেছি…’ ব্রজরাখাল আড়চোখে দেখলেন শ্রীমন্ত চেয়ার থেকে উঠে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ঘরের বাইরে এসে শ্রীমন্ত উঠোনের ওধারে অকাদাদুর ঘরের পর্দার নীচে আলো দেখতে পেল। সিগারেটটা ফেলে পায়ে মাড়িয়ে সে দাদুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।
পর্দা সরিয়ে সে সোজা দাদুর খাটের ধারে এসে দাঁড়াল। নার্স একটা বই পড়ছিল, চমকে উঠে দাঁড়াল। চোখ বন্ধ ছিল, শ্রীমন্তর হাত কপালে পড়তেই খুললেন। ঝুঁকে এল শ্রীমন্তর মুখ।
‘তোমাকে যখন পিস্তল দিয়ে বিশ্বাসঘাতকটাকে মারতে বলা হয়েছিল, তুমি মারনি…কেন?’
অক্ষয়ধন মিত্রের চোখ ধীরে ধীরে স্ফীত হয়ে উঠল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারছেন না। আর সেই না পারার যন্ত্রণাটা তাঁর দুটো হাতের আঙুলগুলোকে বেঁকিয়ে দিল।
‘দাদু তুমি ক্ষতি করেছ।…দাদু আমি তোমায় শ্রদ্ধা করি।’
শ্রীমন্ত আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, চিরদিনের জন্য।
গোলাপবাগান
ভগবতীচরণ আর্য বিদ্যালয়ের একশো বছর আজ পূর্ণ হচ্ছে সকাল দশটায়। স্কুলের উঠোনের একদিকে শামিয়ানার নীচে মঞ্চ বাঁধা। জাতীয় পতাকার তিন রঙা কাপড়ে মঞ্চটি ঘেরা। তার উপরে সাদা কাপড়ে ঢাকা জোড়া দেওয়া তিনটি টেবল। টেবলের উপর দুটি ফুলদানিতে লাল গোলাপ গুচ্ছ। টেবলের পিছনে পাঁচটি চেয়ারে এখন বসে আছেন চারজন, পঞ্চমটি খালি রয়েছে। চারজনের একজন হলেন আজকের সভাপতি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী, অপর তিনজন-স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ভগবতীচরণের নাতি, যিনি পরিচালন সমিতির প্রেসিডেন্ট; বর্তমান হেডমাস্টার এবং সবথেকে পুরোনো জীবিত ছাত্র যাঁর বয়স এখন নব্বুই। ইনি স্বাধীনতা সংগ্রামী। সরকারের দেওয়া তাম্রফলক পেয়েছেন; পঞ্চম চেয়ারে বসার কথা সবথেকে পুরোনো জীবিত শিক্ষকের, যিনি চল্লিশ বছর শিক্ষকতা করে কুড়ি বছর আগে অবসর নিয়েছেন।
মঞ্চের ডানদিকে সাদা চাদরে ঢাকা চেয়ারে হেলান দিয়ে রাখা তেলরঙে আঁকা শীর্ণ মুখ মাথায় শামলা মোটাগোঁফ আয়ত চোখ কৃষ্ণকায় ভগবতীচরণের প্রতিকৃতি। চেয়ারটির পাদদেশে জ্বলছে একগোছা ধূপ, প্রতিকৃতির দু-পাশে দাঁড় করানো রজনীগন্ধার ছড়। মঞ্চের বাঁদিকে একটি টেবলের উপর হারমোনিয়াম ও ডুগিতবলা। চারটি ছাত্র এইমাত্র ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ’ গানটি গেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে গেল।
কাশীনাথ প্রতিদিন দশটায় স্কুল শুরুর ঘড়ি গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নির্দিষ্ট একটা তালে যেভাবে বাজিয়ে আসছে আজও সেইভাবে বাজাল। মঞ্চে মাইক্রোফোনে এসে দাঁড়ালেন সহ-প্রধান শিক্ষক, হাতে অনুষ্ঠানসূচি লেখা কাগজ।
প্রাক্তন ছাত্র ব্রতীন রায়চৌধুরি স্কুলের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে হাজির হতে, ত্রিশবছর আগে যেসব পথ দিয়ে নিত্য স্কুলে যেত সেই পথগুলি দিয়ে এখন হাঁটছে। বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় এক মাইল। আটটি লেন ও স্ট্রিট ধরে হেঁটে এবং একটি রাজপথ, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনু পার হয়ে সে সাত বছর স্কুলে যাতায়াত করেছে, মাধ্যমিক পাশ করে বিজ্ঞানে, অঙ্কে ও ভূগোলে লেটার নিয়ে। মেধা তালিকায় তার স্থান হয়েছিল বারোজনের পরে। অতঃপর কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়নে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ওই বিষয়েই পিএইচ ডি অর্জন করার পর পুণেয় এক ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে চার বছর থেকে গত চোদ্দো বছর মুম্বইয়ে রয়েছে এক জার্মান প্রতিষ্ঠানে চিফ অ্যানালিস্টের পদে।
বাড়ি থেকে এতদূরে স্কুলে পড়ার কারণ, এই ভগবতীচরণ স্কুল থেকেই তার পরলোকগত বাবা বগলাপ্রসাদ এবং কাকা ক্ষীরোদপ্রসাদ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেছিলেন। ব্রতীনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় মা অনসূয়ার কোলে এবং পাড়ার পাঠশালায়। অনসূয়া যখন বিধবা হন ব্রতীন তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সেই বছরই তার জন্য প্রথম গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন তার কাকা।
পাড়ায় নবাগত ভাড়াটিয়া উমাপদ পালকে শিক্ষকরূপে সুপারিশ করেন ব্রতীনদের প্রতিবেশী ও উমাপদর বাড়িওলা সতীকান্ত মল্লিক। উমাপদ সতীকান্তর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া মেয়ে বাসন্তীকে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান পাওয়াতে যে সাহায্য করেন সতীকান্ত সবিস্তারে তা ক্ষীরোদকে গল্প করেন। পরের দিনই ক্ষীরোদ হাজির হন অবিবাহিত উমাপদর ঘরে।
উমাপদ প্রথমে রাজি হননি ব্রতীনের শিক্ষক হতে যেহেতু তিনি জীবনবিমা অফিসে চাকরি করেন এবং অফিস থেকে ফিরে একটি মেয়েকে পড়াবার পর বিশ্রাম নিতে ও কিছু পড়াশুনা করতে চান। ক্ষিরোদ কথা বলে বুঝতে পারেন বেশি মাইনের টোপ ফেলে উমাপদকে গাঁথতে পারবেন না। প্রস্তাব দেন বাসন্তী ও ব্রতীনকে একসঙ্গে পড়াবার, যদিও একজন সপ্তম ও অন্যজন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এর সঙ্গে একটি মোক্ষম টোপ দেন, উমাপদ দু-বেলা তার গৃহে আহার করবেন।
