‘আমি তো ওনাকে সকালে জানিয়েছি।’ বলেই নার্স দোতলার দিকে তাকালেন। শ্রীমন্তর চোখও দোতলার বারান্দায় উঠে গেল। সুরুচি দাঁড়িয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে। শ্রীমন্ত সদরের দিকে হাঁটা শুরু করল।
লিচুতলার মোড় থেকে মিনিট দুই হাঁটার পরই শ্রীমন্ত দেখল অসীমার দাদা সাইকেলে আসছে, বোধ হয় বাড়ি থেকেই। মুদির দোকান আছে, সেখানেই হয়তো যাচ্ছে। তাকে দেখে সাইকেল থামিয়ে নামল।
‘খুকু তো এই কিছুক্ষণ আগে বেরোল। কলকাতায় গেছে।’
‘দেখুন তো, পৌনে এগারোটাতে এসেও ওঁকে পেলাম না। সেই কবে থেকে এই জিনিসটা ওঁকে দেবার জন্য-‘ শ্রীমন্ত পলিথিন ব্যাগটা দেখাল। ‘অবশ্য আসলে এটা ওঁর কোনো কাজে লাগবে না, লাগবে আপনার।’ শ্রীমন্ত জানে কাপড়ের দোকানের নাম ছাপা ব্যাগটা অসীমার দাদা প্রথম দিন দেখেছে।
‘আমার!’
‘এটা একটা প্যান্টের কাপড়! অসীমা নিয়ে কী করবেন?’
কৌতূহলী হয়েছে লক্ষ করে শ্রীমন্ত আবার বলল, ‘বার বার হাতে করে আনা আর ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, তার থেকে আপনিই রাখুন, ওকে দিয়ে দেবেন।’ শ্রীমন্ত ওর ইতস্তত ভাব দেখে হাতেই গুঁজে দিল। ‘চলুন একটু চা খাই কোথাও।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আসুন, এই তো সামনেই দোকান।’
রাস্তার ধারেই দোকান। দুটো বেঞ্চ বাইরে পাতা। ভিতরেও বেঞ্চ এবং লম্বা টেবল। আলুর দম-পাউরুটি এবং পান আর সিগারেটও বিক্রি হচ্ছে। অসীমার দাদাই চেঁচিয়ে চায়ের বরাদ্দ জানিয়ে বাইরের বেঞ্চে বসল। শ্রীমন্তকে দেখে চা-ওয়ালা বলল, ‘গেলাসে না কাপে?’
‘গেলাসেই।’ শ্রীমন্ত জানিয়ে দেবার পর অসীমার দাদাকে বলল, ‘আপনার নাম এখনও জানলাম না।’
‘রমেন পাল।’
‘মুদির দোকান দিয়েছেন? চলে কেমন?’
‘খুব খারাপ নয়, আবার খুব ভালোও নয়। আমাদের এই জায়গাটায় বড়ো বড়ো কয়েকটা দোকান আছে তো, আমার ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় করা দোকানে কত আর মাল থাকবে? ওদের ঘরে লাখ টাকার মাল!…দুটো কিডনি তো আর বেচা যায় না!’ রমেন শুকনো হাসল।
শ্রীমন্ত রীতিমতো অবাক! দুটো কিডনি বেচা যায় না মানে? কী ব্যাপার!
‘দুটো কিডনি…বুঝলাম না।’
‘দুটো কিডনি না থাকলে তো মানুষ মরেই যাবে। একটা থাকলে কাজ চলে যায়, এই তো আমি চলছি।’
‘আপনার একটা কিডনি! আর একটা নষ্ট হয়ে গেছে?’
‘বেচে দিয়েছি। সেই টাকাতেই তো দোকান?’ রমেনের হাসিতে এবার চাপা গর্ব। শ্রীমন্ত জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল কেন বেচলেন, কিন্তু তার আগেই রমেন বলল, ‘খুকু আপনাকে বলেনি?’
‘আপনার বাবা কাজ করতেন যে কাগজের মিলে সেটা বন্ধ হয়ে যাবার পর আপনাদের খুব দুর্দশায় পড়তে হয়েছিল, সেটা বলেছেন।’
‘তখনই তো আমি রক্ত বেচতে শুরু করি। একটা প্রাইভেট ব্লাড ব্যাঙ্কে। হপ্তায় তিনবার করে দিতুম। বেআইনি এটা, কেননা তিনমাসে একবার রক্ত দেওয়াই আইন। কিন্তু কে মানে আইন! খেতে পরতে হবে না? ত্রিশ টাকা করে বোতল, হপ্তায় নব্বুই টাকা, তাই দিয়ে তখন সংসারটা বেঁচে ছিল। এরপর খুকুও রক্ত বেচতে শুরু করল আমার সঙ্গে।’
শ্রীমন্তর বুকটা অসাড় হয়ে আসছে। অসীমাও রক্ত বেচেছে। ‘আপনার বাবা-মা অ্যালাও করলেন?’
‘জানতে পারলে তো! আমরা ভাইবোন একদমই টের পেতে দিইনি বাবা-মাকে। জানতে পারলে আত্মহত্যা করতেন। আজও ওঁরা কিছু জানেন না। আমার বউ এক বাড়িতে রান্নার কাজ নিয়েছিল। এটা অবশ্য ওঁরা জানতেন। খেটে পয়সা রোজগারে লজ্জার কী আছে? তাই না?’
শ্রীমন্ত শুধু মাথা নাড়ল। তার কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে আসছে, বেঁচে থাকার জন্য কোনো কাজই বোধ হয় অন্যায় নয়। চা এসে গেছে। চুমুক দিয়ে সে বলল, কতদিন এভাবে চালালেন?’
‘বছর দেড়। শেষে দেখলাম এভাবে সামান্য সামান্য টাকা পেয়ে কোনো লাভ নেই। একসঙ্গে বেশ কিছু পেলে বরং সেটা দিয়ে ব্যাবসা করা যায়। এক দালাল ছিল, নিলুদা বলতাম, সানফ্লাওয়ার বলে একটা নার্সিং হোমের সঙ্গে ওর কনট্র্যাক্ট ছিল। নিলুদা কিডনি কেনাবেচার দালাল। তাকে বললাম আমার একটা কিডনি বিক্রি করে দিন। বরাত এমনই ওই সময়ই এক বিরাট বড়োলোকের বউয়ের কিডনি বদলাবার দরকার হল। আমার ব্লাড গ্রুপ নিলুদা জানত, সেই বউটার ব্লাড গ্রুপও আমার সঙ্গে মিলে গেল। এইচএলএ টেস্টও ম্যাচ করে গেল, ব্যস।’ রমেন সাফল্যের আনন্দে উদ্ভাসিত চোখে তাকাল।
‘কত পেলেন?’
‘চল্লিশ হাজার। নিলুদা নিশ্চয় পঞ্চাশ-ষাট ঝেড়েছে।’
‘এটা কে কে বাড়িতে জানেন?’
‘খুকু আর বউ। বাবা-মাকে বলা হয়েছে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করাতে ভরতি হচ্ছি। ওদের একদিনও নার্সিং হোমে যেতে দেওয়া হয়নি।’
‘আচ্ছা রমেনবাবু, এই রক্ত বেচা, কিডনি বেচা, যাতে আপনি মারা যেতে পারতেন-‘
‘পারতাম কী, এখনও পারি!’ রমেন ব্যস্ত হয়ে ভুল শুধরে দিল।
‘এ কাজ করলেন কেন?’
‘মানে?’ বিভ্রান্ত হয়ে রমেন তাকিয়ে রইল।
‘কার জন্য এসব করলেন?’
প্রশ্নটার গূঢ় অর্থ যেন ধরতে পেরেছে এমন একটা ভাব ফুটে উঠল রমেনের মুখে। সরল হাসিতে তার মুখ ভরে গেল।
‘কেন, সবার জন্য।’
শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল।
ব্রজরাখাল মুখুজ্জে চেয়ারে গা এলিয়ে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে। তাঁর চোখ থেকে দ্বিধা সন্দেহটা এখনও সরে যায়নি। আবার সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই মন থেকে বলছিস তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা হলে বিমল চক্রবর্তীকে জানিয়ে দি?’
