হালকা তাচ্ছিল্যের রেশ রেবার ঘরে। শ্রীমন্তর ঘুম ভাঙা শান্ত আলস্যটা নাড়া খেয়ে গেল। সে বলল, ‘না, লোকের অভাব তোমার নেই। যাক, কেউ লিখে দিলেই হল।’
মুছতে মুছতে রেবা খাটের কাছে সরে এসেছে। শ্রীমন্তর কথা শুনে মুখ তুলে তাকাল। চোখে এক ধরনের তীব্রতা, যেটা ক্ষোভ, অনুযোগ আঘাতের মিশ্রণে তৈরি।
‘আপনি জানলেন কী করে যে আমার লোকের অভাব নেই। অভাব না থাকলে কী আপনার কাছে প্রথমে আসি?’
দেড় হাত দূরে রেবার মুখটা। শ্রীমন্ত এই প্রথম ভালো করে দেখার সুযোগ পেয়েছে। সে উত্তর না দিয়ে দেখতে লাগল। তার চোখে এমন কিছু একটা ফুটে উঠেছিল যেটা দেখতে পেয়ে রেবা ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে নিল। শ্রীমন্ত তখন একটা কাণ্ড করল। হাত বাড়িয়ে ওর থুতনি ধরে মুখটা তুলে রইল। রেবা আপত্তি জানাবার কোনো চেষ্টা দেখাল না বরং তার চোখেও এমন কিছু একটা ফুটে উঠেছিল যেটা শ্রীমন্তকে দেড় হাত দূরত্বটা ঝুঁকে অতিক্রম করিয়ে রেবার ঠোঁটে দ্রুত হালকা চুমু দেওয়াল।
চোখ বুজে নিথর হয়ে রেবা বসে। শ্রীমন্তর মাথার মধ্যে ঝাঁ ঝাঁ করছে। হুট করে এটা কী করে ফেলল? সারা রাত মিলুকে বিয়ে করার বিরুদ্ধে সে কোনো বাস্তব যুক্তি সংগ্রহ করতে পারেনি শুধু একটিমাত্র ছাড়া-মিলুর কোনো দৈহিক আবেদন নেই। এটা শুধু তারই আপত্তি। কিন্তু এই আপত্তিটা আঁকড়ে থাকলে সে অনেকের কাছে ভিলেন হয়ে যাবে। যতই সে ভেবেছে ততই তার মাথা গরম হয়ে উঠেছে। তাকে ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিসর্জন দিয়ে ভালো ছেলে হতেই হবে, এর কোনো মানে আছে?
এর যেকোনো মানে নেই, এটা জাহির করতেই সে রেবাকে চুমু খেল কী? শ্রীমন্ত ওর গাল থুতনি ঠোঁটের উপর হালকাভাবে একটা আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, ‘আমি খুব গরিব…আড়াইশো টাকা দেবার ক্ষমতা আমার নেই।’
রেবা চোখ খুলে গভীরভাবে কিছুক্ষণ শ্রীমন্তর মুখের দিকে তাকিয়ে, ঘর মুছতে শুরু করল। চিৎ হয়ে শ্রীমন্ত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দুটো হাত কপালের উপর আড়াআড়ি রাখল। ঘর মোছার বালতি টানার শব্দ ছাড়া আর কিছু তার কানে আসছে না। এক সময় শব্দটা থেমে গেল।
‘পৃথিবীতে টাকাটাই কী সব?’
রেবার অস্ফুটে বলা কথাটা শ্রীমন্তর কানে খুব জোরেই লাগল।
‘কেন নয়? টাকার জন্যই মানুষ কাজ করে, খাওয়াপরা, বাঁচার ব্যবস্থা করে। এই টাকার জন্যই হয়তো আমাকে শেষ পর্যন্ত বিয়েও করতে হবে।’
‘বিয়ে!…কাকে?’
‘একটা মেয়েকে, আবার কাকে?…ওহহ।’ কাতরে উঠে শ্রীমন্ত পাশ ফিরে দেওয়ালের দিকে মুখ ঘোরাল।
‘টাকা পাবেন যদি তা হলে বিয়ে করে ফেলুন।’
শ্রীমন্ত বুঝতে পারল না, অভিমানে না সিরিয়াস হয়েই রেবা কথাটা বলল। সে আবার পাশ ফিরে রেবার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘বিয়ে করতে বলছ?’
‘যদি খাওয়াপরা বাঁচার জন্য করতে হয়…কী দেবে?’
‘নিজের পায়ে দাঁড়াবার জমি।’
‘ওটা তো আগে দরকার। আমার জমি নেই বলেই তো আমাকে এভাবে চলতে হয়…’ রেবার গলা ধরে এল। চোখ ছলছলে। ‘নইলে আমারও তো সাধ হয় নিজের মনের ইচ্ছেমতন কাজ করতে…নিজের মনের সুখের জন্য-‘
‘আমি যদি বিয়ে করি, তোমার কী দুঃখ হবে?’
‘না…কেন হবে?’ মুখে হাসি ফুটে উঠল রেবার, ‘আপনি তো জমির জন্য বিয়ে করবেন।’
শ্রীমন্ত হাসবার চেষ্টা করেও পারল না। একসঙ্গে ভিড় করে এল অনেক স্মৃতি, বাল্যকাল থেকে আজ পর্যন্ত। অনেক মানুষ, অনেক ঘটনা, অনেক কথা, অনেক কাজকর্ম। সবই শুধুই খাওয়াপরা বাঁচার জন্য।
এই একটা ব্যাপার যেটা মানুষকে জন্ম থেকেই তাড়া করে। এর হাত থেকে বাঁচতে হলে দাঁড়াতে হবে এমন একটা জমিতে যাকে ঘিরে টানা থাকবে নিরাপত্তার একটা গণ্ডি। এই গণ্ডিটা কীভাবে তৈরি হল, এর দাগে কতটা কালি লেগে সেসব দেখলে তাড়া খাওয়া আর জীবনে বন্ধ হবে না।
রেবা বালতিটা হাতে তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপেক্ষা করছে কখন শ্রীমন্ত অন্যমনস্কতা ভেঙে তার দিকে তাকাবে। একসময় তার চটকা ভাঙল। সে তাকাল রেবার দিকে। ঝি, অশিক্ষিত, সুন্দর দেহ, তাকে পছন্দ করে, রোমান্টিক মন আছে, কিন্তু বাস্তববাদী। রেবার সঙ্গে অসীমা পালের বিরাট পার্থক্য। সে একটা হাত বাড়িয়ে রেবাকে কাছে আসার ইঙ্গিত জানাল।
‘না।’ রেবা ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েও পিছিয়ে এল। দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘আগে বিয়ে করুন…আমি তো আছিই।’
এই হল বাস্তববাদী। শ্রীমন্ত ফাঁকা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত বোধ করতে লাগল। সংগ্রামের বিপ্লবের কথা কী বাজে, কী ছেঁদো যে মনে হচ্ছে এখন। জমিটা কোথায় যেখানে দাঁড়িয়ে ‘আমারও তো সাধ হয়’টা মেটাব?
ঘণ্টাখানেক পর, খবরের কাগজ পড়া শেষ করে শ্রীমন্ত বাড়ি থেকে বেরোবে ভেবে আলনা থেকে টি-শার্ট নামিয়ে দেখল যথেষ্ট ময়লা। আর একটা আছে আলমারিতে। সেটা খুলতেই চোখে পড়ল পলিথিনের ঝোলাটা। ওর মধ্যে রয়েছে শেষ প্যান্ট-পিসটা। কী করবে সে এটা নিয়ে?
অসীমার কাছে যাবার এটাই তার হাতে শেষ ছুতো। কথাটা ভেবেই সে চটপট শার্ট-প্যান্ট পরে, পলিথিনে মোড়া প্যান্টের কাপড়টা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরোল। অকাদাদুর ঘর থেকে তখন বেরিয়ে এলেন নার্স। শ্রীমন্ত জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছেন?’
‘একই রকম, পায়খানা হচ্ছে না, ঘুমোননি সারারাত।’
‘ডাক্তারকে জানানো হয়েছে?’
