‘অহহ।’ ব্রজরাখাল ব্যস্ত হয়ে উঠে এলেন।
শ্রীমন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে বড়ো দালানে এসে বলল, ‘বিমল চক্রবর্তী শয়তানি চাল চেলেছে। ভয়ানক ধড়িবাজ আর লোভী…ওর সঙ্গে কোনো সমঝোতা আর সম্ভব নয়।’
‘কী বলল কী? তুই ওকে কী বললি?’
‘একটা নয়, দুটো ঘর দেব বললাম। কিন্তু ও আর ওর বউ অন্য জিনিস চায়।’
‘অন্য আবার কী জিনিস, টাকা?’
‘না।…আমাকে।’
‘তোকে! তার মানে? সেটা কী ব্যাপার?’
‘ওর বড়োমেয়েকে বিয়ে করতে হবে।’
‘বিয়ে! তোকে করতে হবে!…ব্যাপারটা খুলে বল, আয়।’ ব্রজরাখাল শ্রীমন্তকে বাহু ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বারান্দার রেলিংয়ের ধারে। সেখান থেকে অকাদাদুর দরজার পর্দা শ্রীমন্ত দেখতে পাচ্ছে।
‘খুলে আর বলব কী, বিমল চক্রবর্তী রাজনীতি ছেড়ে ব্যাবসায় নামবে ঠিক করেছে।’
‘ভালো কথা। কী ব্যাবসা?’
‘ঠিকেদারি।’
‘নামুক, কবে থেকে? ইলেকশনের আগে না পরে?’
‘তা কিছু বলেনি। তবে ব্যাবসা চালাবার জন্য একটা আপনজন চাই। আমি যদি জামাই হই-‘
‘হয়ে যা।’ ব্রজরাখাল ব্যগ্র এবং উত্তেজিত স্বরে বললেন। ‘আমার কাজ করে দেবে তো?’
শ্রীমন্ত অবাক চোখে মামার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ব্রজরাখালের গৌরবর্ণ মুখের চামড়া লাল হয়ে উঠেছে।
‘তুই কী বলে এলি? রাজি?’
‘তুমি মেয়েটাকে দেখেছ?’
‘দেখাদেখির কী আছে! বিয়ে তো একদিন করবিই, তা হলে এখনই করে ফেল। তোর কাছে এটা তো একটা বিরাট চান্স নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াবার। ঠিকেদারিতে পয়সা কত জানিস? তুই কী বলেছিস?’
‘কিছু বলিনি।’
‘আচ্ছা আমি তা হলে ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলছি। ওর নম্বরটা…অফিসঘরে আয়।’ কথা বলতে বলতে ব্রজরাখাল যুবকের মতো দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন, পিছনে শ্রীমন্ত জরাগ্রস্তের মতো।
অফিসঘরের দরজার বাইরে সে ইতস্তত করল। মামার কথা শোনা যাচ্ছে।
‘…ও কী করে তক্ষুনি তক্ষুনি কথা দেবে আমাকে না জিজ্ঞাসা করে, আরে না না…এটা শুনে ভালো লাগছে যে আপনাদের ওকে খুব পছন্দ হয়েছে, অ্যাঁ মিসেস চক্রবর্তীর? আপনার হয়নি?…তাই বলুন। এটা আপনি জেনে রাখবেন আমার ভাগনে অশিষ্ট নয়, মানীকে মান দিতে জানে। ওভাবে চলে এসেছে লজ্জা পেয়ে। আমাকে সেকথাই বলল।…হ্যাঁ, হ্যাঁ, হুম…সেই ভালো, আমিও তাই চাই। সরাসরি মুখোমুখিই কথা বলে নেওয়া…আপনার অফিসে? কাল একটায়? বেশ যাব।…তা হলে ওই কথাই রইল। শ্রীমন্ত সম্পর্কে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। এমন একজন শ্বশুর পাওয়া…আমি আর মেয়ে দেখব কী। আমার বোন যদি মানে শ্রীমন্তর মা যদি দ্যাখে তো দেখবে। তা হলে কাল একটায়…আরে না না, এসব আমায় বলতে হবে না, কাকপক্ষী টের পাবে না…হ্যাঁ নমস্কার।’
‘আমি কিন্তু বিয়ে করছি না।’ টেবলের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীমন্ত ঠান্ডা, কঠিন স্বরে বলল। ব্রজরাখাল স্থির চোখে তার মুখ লক্ষ করতে লাগলেন।
‘কাল আমি বিমল চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে আসি। আগে দেখি, লোকটা কতটা আমাকে সাহায্য করবে। মুখে করব বললেই কী বিয়ে হয়ে যাবে নাকি? কাজ উদ্ধার করে যদি আমাকে বুড়ো আঙুল দেখায়?’
‘কিন্তু আমি বিয়ে করছি না।’
‘জমিটার কথা কাল আমি পাড়ব।…আট বিঘে, তার মানে একশো ষাট কাঠা, পার কাঠা এখন কুড়ি হাজার চলছে। টোটাল কত টাকা হয় বল তো? জমি থেকে ক্লাবটাকে তুলে দেবার কথা না দিলে এ বিয়ে হবে না। তুই কী বলিস?’
‘আমার বক্তব্য তো জানিয়েই দিয়েছি।…সম্ভব নয় আমার পক্ষে।’
ব্রজরাখাল কয়েক সেকেন্ড বিরক্ত চোখে তাকিয়ে নরম মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘অসম্ভবই বা কেন? একটাই তখন সমস্যা হবে, বাড়িতে আর এখনকার মতো টাকা দিতে পারবি না। কিন্তু এটা কোনো প্রবলেমই নয়। তোর তিনটে তো ভাই রয়েছে, তার একজনকে কী দু-জনকে আমি কাজ দিয়ে দোব। ঘরভাড়া নিয়ে তোরা এখানেই থাকবি, ভাড়ার টাকাটা আমিই দেব। মাইনেটাও বাড়াব,…ভেবে দ্যাখ শ্রীমন্ত, এতগুলো সুবিধে তুই পাবি। হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলিসনি।’
এইবার শ্রীমন্তও মনে মনে বিচলিত হল। তার চিন্তার গভীরে যে সাংসারিক মানুষটি গত দশ বছর ধরে বসবাস করে চলেছে সে এবার কথা বলে উঠল: শ্রীমন্ত এখুনি তুমি না বলো না। আগে বাড়ির সবার কথা ভাব, নিজের কথা ভাব। স্বনির্ভর সচ্ছল জীবনই কী তুমি এতদিন চাওনি?…তা হলে এত পছন্দ-অপছন্দ কেন? মিলু অশিক্ষিত বা বিকলাঙ্গ নয়। তার প্রতি এত বিতৃষ্ণা কীসের জন্য?…অসীমা পালই কী-!
‘আজ রাতটা তুই ভেবে দ্যাখ। আমার কাছে তুই, তোরা সবাই অনেকভাবে ঋণী…এবার শোধ কর।’
শ্রীমন্ত সারারাতই আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে ভোরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল মেঝেয় ভারী কিছু ঘষার শব্দে। চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলল। ঘর মুছছে রেবা। উবু হয়ে একটু ঝুঁকে অর্ধচক্রাকারে হাতটা ঘোরাচ্ছে আর সেই সঙ্গে তার দেহের নিম্নদেশও দুলছে। চোখ খুলল শ্রীমন্ত। সে দেখবে। তার ইচ্ছা করছে। এই ইচ্ছাটা পূরণ করাই তার বিদ্রোহ-নিজের বিরুদ্ধে।
বালতিটা ঠেলে দিয়ে রেবা ঘুরে বসেই শ্রীমন্তকে দেখল, একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। সে কাঁধ থেকে কাপড় টেনে বুকের উপর নামাল।
‘তোমার ফরমটা নিয়ে এসো, আজ লিখে দেব। এত ব্যস্ত ছিলাম যে-‘
‘লেখা হয়ে গেছে।’ রেবা ঘুরে মুছে যেতে লাগল।
‘ভালো। কে লিখে দিল?’
‘কেন, লেখার লোকের অভাব আছে নাকি?’
