‘দু-খানাও দিতে রাজি। সেলাম নেবেন না।’
বিমলের উপরের ঠোঁট বেঁকে উঠল তাচ্ছিল্যে।
শ্রীমন্ত প্রমাদ গুনল। লোকটা বোধ হয় আরও বড়ো কিছু দাঁও মারার কথা ভাবছে।
মাথা নাড়তে নাড়তে বিমল বলল, ‘চেয়ারম্যান হওয়ার লোভ ওর বড্ড বেশি। ওই চেয়ারে চেষ্টা করলে আমিও বসতে পারি। কিন্তু রাজনীতি আমি এবার ছাড়ব।’ দরজায় ঝোলা পর্দার দিকে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল বিমল।
‘আপনি একেবারে ছেড়ে দেবেন!’ শ্রীমন্ত নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ‘আপনি এখনও তো যথেষ্ট অ্যাক্টিভ, পপুলার, ডায়নামিক!’
‘পপুলার ঠিকই, বাকি দুটো নয়। জীবনের সেরা সময়টা পার্টিকে দিয়েছি।’
বিমল হাসল, গাছ থেকে ঝরে পড়া মরা পাতার মতো হাসিটা অনেকক্ষণ ধরে ঘরের শূন্যতায় ভেসে বেড়াল। অস্ফুটে বলল, ‘সাংসারিক দায়িত্ব পালন করার কথা ভাবতে হচ্ছে…ছ-টা মেয়ে। একখানা, দু-খানা ঘর থেকে কী আর পাব! বড়দরিয়া থেকে কাটাখালি তিন মাইল রাস্তা বেরোবে, তাতে মাটি ফেলার কন্ট্র্যাক্ট আমি পেতে পারি। কিন্তু কাউকে সামনে রেখে তার নামেই কাজটা করতে হবে আর সেজন্যই সুবিনয়কে ডেকে এনেছিলাম। কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলে একদমই ভরসা পেলাম না। শুধুই কথার ফুলঝুরি, পরিশ্রমও করতে পারবে না।’
বিমল চোখ বন্ধ করে কী যেন ভেবে নিয়ে চোখ খুলেই বলল, ‘তোমার মতো ছেলে পেলে কাজটা নিতাম!’
‘বেশ তো, নিন না।’ শ্রীমন্তর কণ্ঠস্বর পুরোপুরি লঘু হল না। মনের গভীরে ক্ষীণ একটা আশা মাথা তুলে ফেলেছে। বিমল চক্রবর্তী তাকে নির্বাচিত করলেও করতে পারে।
‘শ্রীমন্ত, আমি ঠেকে শিখেছি। নিকট কোনো আত্মীয়তার বন্ধন কী টান না থাকলে বাইরের কাউকে দিয়ে এই ধরনের কাজ করাতে গিয়ে ফাঁকিতে পড়ার সম্ভাবনাটাই বেশি। সুবিনয়কে ভেবেছিলাম এইজন্যই যে সে আত্মীয়, ঠকালেও বেশি ঠকাবে না। কিন্তু তুমি যে একেবারেই অনাত্মীয়।…সব দিয়েথুয়েও নেট চার লাখ টাকা আসবে।’
বিমল অদ্ভুত প্রত্যাশাভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে। শ্রীমন্তও অস্বস্তি বোধ করল। মামার কবল থেকে বেরিয়ে আসার একটা সুযোগ এল আর আধ মিনিটের মধ্যে চলে গেল। পৃথিবীতে হাজার হাজার লোক দু-নম্বরী কারবার করছে, সবাই কী তাদের আত্মীয়দের দিয়েই করাচ্ছে?
‘শ্রীমন্ত, তুমি তোমার মামার কাছ থেকে মাইনে পাও, যতদূর জানি দেড় হাজার টাকার মতো। সুবিনয়ের কাছে তোমার বাড়ির অবস্থাও শুনলাম। তুমি স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন, বুদ্ধিমান…তুমি উপরে উঠতে চাও না?’
ধক করে উঠল শ্রীমন্তর বুকের মধ্যে। কে বলল সে চায় না? অবশ্যই চায়। ‘কেন চাইব না। সুযোগ পাচ্ছি আর কই?’
‘আমার আত্মীয় হবে?’
‘মানে?’
‘জামাই হবে?’
ঠিক তখুনি ঘরে ঢুকলেন বিমলের স্ত্রী। হাতের প্লেটে ধবধবে ফুলকো লুচির স্তূপ আর ফুলকপির ডালনা। খাটের তলা থেকে নীচু টুলটা টেনে বের করে তার উপর প্লেটটা রেখে বললেন, ‘হাত ধোবে? বাইরে বালতিতে জল আছে।’
শ্রীমন্ত ফ্যালফ্যাল করে শুধু দু-জনের মুখ পর্যায়ক্রমে দেখে যাচ্ছে। বলে কী বিমল চক্রবর্তী? লোকটার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল! নাকি, তারই শুনতে ভুল হল?
‘কী বললেন?’
‘মিলুকে তুমি তো দেখেছ।’ খাটে বসলেন বিমলের স্ত্রী। বিমল আবার দেহ এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। যা কিছু বলা-কওয়ার ভার যেন স্ত্রীর হাতেই ছেড়ে দিয়ে অবসর নিল।
বিয়ে? মিলুকে! শ্রীমন্তর কাছে সারা ঘর একটা অবাস্তব খাঁচার মতো লাগছে। চিন্তাভাবনার কোনো খেই সে পাচ্ছে না। খাঁচার দরজায় এরা দু-জন দাঁড়িয়ে, কী অদ্ভুত প্রস্তাব! তাকে ধরার জন্য এরা প্ল্যানটা করল কখন? নিশ্চয় আজই দুপুরে তাকে দেখে বিমলের স্ত্রীর মাথায় বুদ্ধিটা খেলেছে। দুটো দোকান ঘরের থেকে একটা জামাই অনেক দামি জিনিস।…ছ-টা মেয়ের বাবা-মার ভাবনা সে বুঝতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু জীবনটার কথা তো তাকেই ভাবতে হবে।
মামার কাজ উদ্ধার করে দিতে সে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে রাজি কেননা সেজন্য মামার কাছ থেকে সে টাকা পায়, সেই টাকায় দর্জিপাড়ার…কিন্তু তাই বলে মিলুকে বিয়ে করে কাজে সফল হতে হবে? জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়ে?…তা ছাড়া আর কী?
শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল। ‘হাত ধোব।’
‘হ্যাঁ, বাইরে বালতিতে-‘ বিমলের স্ত্রী ওঠার আগেই শ্রীমন্ত দরজার পর্দা সরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। একটা প্লাস্টিকের বালতিতে জল আর মগ। এটা সে আসার সময় দ্যাখেনি। বালতির পাশে মিলু দাঁড়িয়ে, হাতে তোয়ালে। তার মুখের দিকে না তাকিয়ে শ্রীমন্ত দালান ধরে প্রায় ছুটেই বাইরে যাবার দরজার দিকে এগোল। এই সময় ক্ষীণ একটা সেন্টের গন্ধ সে পেয়েছিল।
এই নিয়ে আজ দ্বিতীয়বার সে পালাল।
একতলায় সে মামাকে খুঁজে পেল না। অকাদাদুর ঘরের দরজায় পর্দা টানা। পর্দা সরিয়ে দেখল দাদু শুয়ে, নার্স চেয়ারে বসে টিভি দেখছে। পর্দা ফেলে দিল।
দোতলা থেকেও টিভি চলার শব্দ আসছে। শ্রীমন্ত লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠল। দোতলার বসার ঘরের সোফায় পরিবারের সবাই। সে সোজা তাকাল ব্রজরাখালের দিকে। ‘মামা, খুব দরকারি একটা কথা আছে।’
ভ্রূ কুঁচকে বিরক্ত মুখে ব্রজরাখাল বললেন, ‘একটু পরে। তুই নীচে যা, আমি আসছি।’
‘এখুনি শুনতে হবে, টিভি দেখার থেকেও এটা জরুরি।’…শ্রীমন্তর তীক্ষ্ন উত্তেজিত, চড়িয়ে বলা স্বরে ঘরের সকলে তার দিকে তাকাল। …বিমল চক্রবর্তীর কাছ থেকে আসছি।’
