ওরা কিছু বলার আগেই ভিতর থেকে বিমলের এক মেয়ে বেরিয়ে এল।
‘সুবিনয়দার জ্বর হয়েছে, শুয়ে আছে। আপনাকে ভেতরে যেতে বললেন।’ দ্রুত স্বরে মেয়েটি বলল, চোখ নামিয়ে রেখে।
‘হ্যাঁরে বিলু, বিমলদা কলকাতায় মিটিংয়ে গেছে, ঠিক জানিস?’ অপেক্ষমাণদের একজন জিজ্ঞাসা করল।
‘তাই তো বলে গেছে।’
‘আর দশ মিনিট দেখি।’
মেয়েটির সঙ্গে শ্রীমন্ত বাড়ির ভিতরে এল।
সুবিনয়ের কথাটা হঠাৎই মনে পড়ে গেল, কিন্তু ও যে এখনও পিসিমার বাড়িতে রয়েছে এটাই তার কাছে অবাক লাগছে। বাঁ দিকে দুটি ঘরের দরজায় পর্দা, ভিতরে আলো জ্বলছে এবং মেয়েদের গলার স্বর সে শুনতে পেল। এরপর ছাদের সিঁড়ি তার পরের ঘরটার পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটি বলল, ‘বাবা ভেতরে আছে।’
বিস্ময়ের ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার সময় তার কানে এল পাশের ঘর থেকে বিমলের স্ত্রীর গলা, ‘বিলু চলে এসো।’
পর্দা সরিয়ে শ্রীমন্ত বলল, ‘বিমলদা, আমি শ্রীমন্ত।’
ইজিচেয়ারে দেহ এলিয়ে বাঁ হাত মাথার উপর রেখে বিমল চক্রবর্তী জেরক্স করা কয়েক পাতার একটা ইংরেজি লেখা পড়ছিল। পরনে পাজামা ও খদ্দরের পাঞ্জাবি। টেবলল্যাম্পটা মুখের ডানদিকে দেওয়াল-তাকে তার পাশে জলপাই রঙের টেলিফোন আর ডিরেক্টরি। চশমাটি খুলে বলল, ‘এসো।’
চটি বাইরে খুলে রেখে শ্রীমন্ত ঘরে ঢুকল।
‘বোস।’ বিমল বাঁ দিকে শোয়ার খাটটা আঙুল দিয়ে দেখাল। খাটে বসে সামনে তাকিয়েই সে চোখ পিটপিট করল। বিমল সেটা লক্ষ করে বলল, ‘ল্যাম্পটার মুখ নীচের দিকে করে দাও, অসুবিধে হবে না।’
শ্রীমন্ত তাই করে দিয়ে এসে আবার বসল। ঘরটার বেশিরভাগই আবছা হয়ে শুধু বিমলের পায়ের কাছে আলো ছড়িয়ে রইল।
‘মামা পাঠিয়েছে?’
‘হ্যাঁ’, শ্রীমন্ত কেশে গলা সাফ করে কথা শুরু করার আগেই বিমল বলল, ‘অক্ষয়ধনদার অবস্থাটা বিশেষ তা হলে ভালো নয়।’
শ্রীমন্তর কাছে এই ঘরে এই প্রসঙ্গটা অপ্রত্যাশিত। অক্ষয়ধনদাই বা কেন? অকাদাদুর সঙ্গে এঁর কী পরিচয় আছে?
‘তোমার দাদামশাই রামরাখাল মুখুজ্জে মারা যাবার পর অক্ষয়ধনবাবু এখানে এসে ভাগনের বাড়িতে বাস করছেন। উনি অমন নামি একজন বিপ্লবী আর আমি তখন রাজনীতিতে নতুন, পোস্টার লিখি, মিছিলে স্লোগান দি। নিজেই গিয়ে আলাপ করেছিলাম।’
‘কী মনে হয়েছিল আপনার?’ শ্রীমন্ত নিজেকে উত্তেজনার মধ্যে ঠেলে দিয়ে উত্তরের আশায় রইল।
‘তখন বছর ত্রিশ আগে যা মনে হয়েছিল এখন সেই ধারণাটা অবশ্য নেই।’ বিমল দেহ এলিয়ে দিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল সিলিংয়ে। বহুরকম স্মৃতির মধ্য থেকে বাছাবাছি করে অবশেষে বলল, ‘উনি একবার আমায় বলেছিলেন-মানুষের অভাবের সুযোগ নিয়ে আমরা তাদের আত্মমর্যাদা বোধটাকেই চুরি করেছি, মানুষকে কাঙাল বানাচ্ছি। শুধুই হাত পেতে দাও দাও করতে শেখাচ্ছি। আর একবার বলেছিলেন অধিকার অর্জন করতে হয়। নিজের কাজকর্ম চিন্তার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজেকে তৈরি করে আর সেই পথেই আসে আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম, মনুষ্যত্ব বোধ। কিন্তু তোমরা দেশ আর মানুষ গড়ার দায়-দায়িত্বের বাইরে থেকে গিয়ে ইয়ে আজাদি ‘ঝুঠা’ হ্যায় বলে দেশাত্ম বোধটাকে অসাড় করে, অবিরাম শুধু নেতি নেতি, ধ্বংস ধ্বংস শেখাচ্ছ। ট্রামবাস পুড়িয়ে আর ধর্মঘট ডেকে, লাঠি আর গুলির সামনে অবোধদের ঠেলে দিয়ে বিপ্লব…এই সবই আর কী। তখন মনে হয়েছিল লোকটা ভীষণ রিয়্যাকশানারি, গরিব দুঃখীর কথা ভাবে না।’
‘আর এখন?’
মাথা হেলিয়ে শ্রীমন্তর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিমলের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে এল। গম্ভীর স্বরে বলল, ‘দরকারের কথাটা বল।’
‘মামা চান না আপনি তাঁর সম্পর্কে রাগ পুষে থাকুন। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন আর সেটা শোধরাতেও চান।’ শ্রীমন্ত কোনোক্রমে কথাগুলো বলে ফেলেই দুরু দুরু ভয় নিয়ে তাকিয়ে রইল। ঠিকভাবে ঠিক কথাগুলো বলা হয়েছে তো? বিমল চক্রবর্তীর বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস আছে, এই তো পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে শোনা কথাগুলো সাজিয়ে কেমন বলে দিল!
বিমলের চোখ থেকে কাঠিন্য মুছে গিয়ে পরিষ্কার এবং ভাবশূন্য হয়ে গেল। ‘চার বছর আগের ভুল, চার বছর আগেই শোধরাতে চাইলে যা বলতাম এখন আর বলা সম্ভব নয়। ইলেকশন এসে গেলে সবারই তখন ভুল শোধরাবার কথা মনে পড়ে। …তোমার মামা সম্পর্কে তোমার নিজের কী ধারণা?’
শ্রীমন্ত ফাঁপরে পড়ে গেল। মামাকে ছোটো করে দেখাতে তার মর্যাদায় বাধছে। অথচ বুদ্ধিমান, চতুর এই লোকটির কাছে বোকা সাজলে তাকে গুরুত্ব দিয়ে আর কথা বলবে না। সুতরাং সত্যি কথা বলাই ভালো।
‘আমাকে আপনি বেশ মুশকিলেই ফেলে দিলেন বিমলদা। মামা একটু জটিল চরিত্রের, মানে-‘
‘কোনো জটিলতা ব্রজ মুখুজ্জের চরিত্রে নেই। প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল একটা নীচ, ইতর, লোভী। আজ বিকেলেই একজনের কাছে শুনলাম, তোমার মামা সগর্বে বলেছে, গত পাঁচদিনে দশ হাজার টাকা খরচ করেছে বিপ্লবী অক্ষয়ধন মিত্রের চিকিৎসায়, ওঁকে বাঁচাতে দশ লাখও যদি ঢালতে হয় তাও নাকি চলবে। উনি মারা গেলে চন্দন কাঠে পোড়াবে…এই সব কথা বলার মানে কী? ইলেকশনে কাজে দেবে? বিপ্লবী-টিপ্লবী এখন আর কোনো ফ্যাক্টর নয় ভোট ধরায়।…গর্দভ। তোমাকে কী বলতে পাঠিয়েছে, সুপারমার্কেটে একখানা ঘর-‘
