শ্রীমন্ত এরপরই বাড়ির দিকে রওনা হল। একটা ভালো, স্বস্তিকর ধারণাই সে পেয়েছে। লোকটি জঙ্গি, সংগ্রামী বলে যতই খ্যাতিমান হোক, নিজের সংসারে তার ছাপ ফেলতে দেয়নি। কিংবা হয়তো কোনো একসময় বুঝেছে ছয়টি মেয়েকে বড়ো করে তাদের বিয়ে দিতে হলে জঙ্গি ইমেজটা কোনো সাহায্যে আসবে না।
বাড়ির সদর থেকেই তার মনে হল, একতলায় যেন লোকজন বেশি। অকাদাদুর ঘরের থেকে দূরে দালানে মাসি, মামাতো বোন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিজয় আর রাঁধুনি বউটি, আরও দু-জন ঝি ও চাকর তাদের পিছনে জটলা করছে। অকাদাদুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন সুরুচি ও ব্রজমামা। শ্রীমন্ত এগিয়ে গেল।
‘মামাকে নিয়েই এলাম। ওখানে থাকাও যা এখানে থাকাও তাই…অযথা কেবিন চার্জ দেব কেন?’ ব্রজরাখাল তাঁর ভাগনেকে কথাটা বললেও শেষাংশটা মা-র দিকে তাকিয়ে বললেন। সুরুচি মাথা নাড়লেন।
‘ডায়ালিসিস হয়েছে?…এলে কতক্ষণ…কীসে, তোমার গাড়িতে?’
‘আধঘণ্টাটাক। ওদের অ্যাম্বুলেন্স আছে, একা আমার পক্ষে কী আনা সম্ভব? হ্যাঁ আজ সকালেই ডায়ালিসিস করেছে। এবার থেকে প্রতি তিনদিন অন্তর করতে হবে। ওদের অ্যাম্বুলেন্সেই নিয়ে যাবে পৌঁছে দেবে।’
শ্রীমন্ত ঘরের ভিতরে তাকাল। একজন অপরিচিতা মাঝবয়সি মহিলাকে দেখে তার মনে হল বোধ হয় নার্স। যদিও মাথায় শাদা অ্যাপ্রনটা নেই বা পরনের নীলপাড় শাড়িটাও থান নয়।
‘ওখান থেকেই একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম, নয়তো কে আর দেখাশোনা করবে? চার-পাঁচ রকমের ওষুধ খাওয়ানো, দু-বেলা ইঞ্জেকশান, টেম্পারেচার লিখে রাখা, মেপে অল্প করে জল খাওয়ানো, পেচ্ছাপ করিয়ে তার পরিমাণ লিখে রাখা, এত রকমের ব্যাপার! অবশ্য এরা সবই জানে।’ ব্রজরাখাল ঘরের ভিতরে তাকিয়ে একটা জটিল কাজ সুষ্ঠুভাবে করে ফেলার মতো তৃপ্ত আমেজে মুখ ভরিয়ে ফেললেন।
‘ঠাকমা, একবার দেখে আসব?’ ব্রজরাখালের মেয়ে দূর থেকে বলল। সুরুচি মাথা নেড়ে আসতে বললেন। মা আর মেয়ে গুটিগুটি এগিয়ে অকাদাদুর ঘরের সামনে এল। দরজার দিকে মাথা করে খাটে শুয়ে আছেন। হাঁটু থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত শুধু দেখা যাচ্ছে। ধুতিটা লুঙির মতো করে পরানো। অকাদাদু প্রবলভাবে লুঙি-বিরোধী কিন্তু এখন নিরুপায়।
‘ঘরের ভেতরে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। দাদু ভালোই আছেন, তবে খুবই দুর্বল, কথা বললেই হাঁপিয়ে পড়ছেন। একদম তাই ওঁর সঙ্গে কথা বলা বারণ।’ সুরুচি তাকালেন শ্রীমন্তর দিকে। নির্দেশটা যে তাকেই সেটা বুঝতে শ্রীমন্তর বুদ্ধি খরচ করতে হল না।
‘দেখা হয়েছে তো, এবার যাও।’ সুরুচির হুকুম মেনে পুত্রবধূ ও নাতনি সেখান থেকে সরে গেলেও শ্রীমন্ত নড়ল না।
‘ব্রজ, রাতে উনি কোথায় শোবেন? মেঝেয় তো শুতে বলা উচিত নয়, একটা খাটের ব্যবস্থা কর।’ বলতে বলতে সুরুচি দালান ধরে এগোলেন সিঁড়ির দিকে, সঙ্গে ব্রজরাখাল।
শ্রীমন্ত ঘরে ঢুকল। অকাদাদু চোখ বন্ধ করে চিৎ হয়ে, হাত বিছানায় ছড়ানো। শ্বাস স্বাভাবিক। কিন্তু মুখে কষ্টের ছাপ। যা আগে কখনো সে দেখেনি, আলতো করে দাদুর কপালে সে তালু রাখল। চোখ খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উনি কী যেন বললেন, এত ক্ষীণ, দুর্বল স্বর শ্রীমন্তর কানে পৌঁছল না। সে ঝুঁকে পড়ল।
‘এবার পলায়ন…ইহলোক থেকে…সময় হয়ে গেছে।’
অকাদাদুর ধূসর চোখ দুটো কৌতুকে জ্বলজ্বল করে উঠল। আর ফ্যাকাশে হয়ে গেল শ্রীমন্তর মুখ। পলায়ন শব্দটা দাদুকে আঘাত দিয়েছে, এখনও ভোলেননি।
‘আমি আপনার কাছা ধরে থাকব। যেখানে যাবেন আমিও সেখানে যাব।’ শ্রীমন্ত রসিকতার পথ ধরল।
‘আমার তো কাছাটাছা আর নেই…কাপড়টা কীভাবে পরিয়েছে দ্যাখ।’
শ্রীমন্তর মনে হল, কথা বলতে ওঁর কষ্ট হচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক নয়। দরজার কাছে বিজয় এসে ডাকল, ‘দিদিমণি শুনুন।’
খাটের ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন নার্স মহিলা। বিজয়ের ডাকে ঘরের বাইরে গেলেন।
শ্রীমন্ত তার মুখটা দাদুর বুকে ঠেকিয়ে বলল, ‘আমিও কোণঠাসা দাদু, সংসার আমাকে খোবলাচ্ছে। ভাঁড়ামো করে টিকে আছি শুধু।…কিচ্ছু বদলায়নি।’
‘আপনি ওঁর সঙ্গে আর কথা বলবেন না।’ নার্স ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘পেশেন্টের কথা বলা বারণ। এখন উনি রেস্টে থাকবেন।’
অর্থাৎ ঘর থেকে বিদায় হও। বিজয়কে দিয়ে বোধ হয় দিদিমাই নির্দেশটা বলে পাঠালেন। শ্রীমন্তর কান দুটো কয়েক সেকেন্ড গরম হয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। ঘর থেকে বেরিয়েই তার মনে হল, কতদিন এরা এত টাকা খরচ করে চিকিৎসা চালাবে? অকাদাদু মারা যাক, এটাই এখন মনে মনে এরা চাইছে। তবে লোক দেখিয়ে চিকিৎসার ঘটা হবে। হোক, তাতেও তো কিছুদিন বাঁচবেন।
শ্রীমন্ত রাত ন-টায় বিমল চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে পৌঁছল। বাইরের বারান্দায় আলো জ্বলছে। দুটি লোক বসে। চেনা মুখ তাই ইতস্তত করল। ব্রজ মুখুজ্জের ভাগনে এই বাড়িতে কথা বলতে এসেছিল, এটা খুদিনগরে রটে যাক তা সে চায় না, শ্রীমন্ত বাড়ি ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এল।
‘সুবিনয় আছিস…সুবিনয়?’
‘কে?…সুবিনয় কে?’ দুটি লোকের একজন চেঁচিয়ে জানতে চাইল। ফটক খুলে শ্রীমন্ত বারান্দায় উঠে এল। ওরা তাকে চিনতে পেরে কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
‘আমার বন্ধু সুবিনয় এখানে এসেছে। সে আছে কী?’
