‘ব্যাপার হল, বিমলদার কাছে একটা কাজে এসেছি। উনি বোধ হয় এখন নেই।’ শ্রীমন্ত স্থির করেছে ‘বিমলদা’ বলবে। এতে নৈকট্য আসে।
এই সময় ঢুকলেন বিমল চক্রবর্তীর স্ত্রী। শীর্ণকায়া, ছোটোখাটো আকৃতি। বয়সের তুলনায় বুড়িয়ে গেছেন। চোখ দুটি জ্বলজ্বলে। পনেরো বছর আগেও পার্টির কাজ করতেন।
‘পিসিমা আমার ছোটোবেলার বন্ধু শ্রীমন্ত, পিসেমশাইকে ওর দরকার।’
‘উনি তো অফিসে গেছেন।’ ভারি কিন্তু মিষ্টি স্বর।
‘তাই ভেবেছিলাম। তবু যদি পেয়ে যাই এই ভেবেই এলাম। আমার নাম শ্রীমন্ত, ব্রজ মুখুজ্জের ভাগনে বললেই বিমলদা চিনবেন।’
শোনামাত্র ভ্রূ নড়ে উঠল, চোখ সরু হল মুহূর্তের জন্য। বিমলের স্ত্রীর ধাঁধায় পড়ারই কথা। ব্রজ মুখুজ্জের ভাগনে কী মনে করে, এমন একটা ভাব তাঁর চোখে ফুটে উঠল। শ্রীমন্ত সেটা লক্ষ করল।
‘খুব একটা দরকারেই আসা। আচ্ছা কখন এলে ওঁকে একটু আলাদাভাবে পাওয়া যাবে?’
তেমনভাবে নির্দিষ্ট কোনো সময় তো বলা শক্ত, বাড়ি থাকলেই লোক আসে। তবে ওরই মধ্যে আলাদা করে কথা বলে নেওয়া…চা খাবে বাবা?’
‘এখন, এই বারোটার সময়! না বউদি থাক। আমি রাত্তিরে আসব।’ শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল। ‘বাবা’ সম্বোধন তার ভালো লেগেছে।
‘অরেঞ্জ স্কোয়াশ আছে তো, তাই দাও না…মিলু, মিলু।’ সুবিনয় ব্যস্ত হয়ে বাড়ির ভিতর দিকে মুখ করে চিৎকার করল।
‘একটু কিছু মুখে দাও, এই প্রথম এলে।’ বিমলের স্ত্রী অনুরোধ ফেলতে শ্রীমন্ত ভরসা পেল না। তার সম্পর্কে কোনো মন্দ ধারণা যেন ওঁর স্বামীর কাছে না পৌঁছয়।
‘শোন।’ সুবিনয় যাকে উদ্দেশ করে বলল শ্রীমন্ত তাকে মিনিবাসে পিছন থেকে দেখেছে। পুরু চশমার লেন্সের জন্য চোখের তারা দুটি ছোটো দেখাচ্ছে। মায়ের মতোই শীর্ণা, সরু কাঁধ দুটি অল্প ঝোঁকানো। উঁচু চওড়া কপাল, নাক ও থুতনি চাপা। ‘চটপট দু গ্লাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ করে দিবি?’
ঘাড় নেড়ে মিলু চলে গেল। সুবিনয় এরপর খোঁজখবর শুরু করল শ্রীমন্তর। অল্প কথায় জবাব দিয়ে সে কৌতূহলের পাশ কাটাতে কাটাতে লক্ষ করল বিমলের স্ত্রী তাকে সাগ্রহে দেখছেন।
‘মামার পি এ হয়ে থেকেই কী আর সারাজীবন কাটাব, কিছু একটা ধরব ভাবছি।’
‘ভেবেছিস কিছু?… ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে আয়, পয়সা আছে। গভর্নমেন্টের বহুরকমের প্রোজেক্ট হচ্ছে, টেন্ডার দে, ভেতরে ধর, ব্যাঙ্ক লোন নে, বিল পাশ করা আর চেক পকেটে ভর।’ সুবিনয় চেয়ারে হেলান দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। শ্রীমন্তর মনে হল চেক যেন ওর পকেটে এসে গেছে! সে জানে এই লোকগুলোই অপদার্থ, স্রেফ মুখে মুখে ব্যাবসা করে যারা লাভের কড়ি গুনতে বসে।
ওদের কথার মাঝে বিমলের স্ত্রী বললেন, ‘তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?’
‘বাবা নেই, মা আর তিন ভাই। একটিই বোন, বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘নিজেদের বাড়ি?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমিই কি বড়ো?’
‘হ্যাঁ।’ শ্রীমন্ত এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন আশা করেনি। বিমল চক্রবর্তীকে সে কাঠখোট্টা প্রকৃতিরই জানে। তার স্ত্রীর আন্তরিকতায় সে যেন আশ্বাস পেল সফল হবার। নিজের একটা ভালো ধারণা বোধ হয় সে এখানে রাখতে পেরেছে। কে জানে, তার প্রস্তাব বিবেচনা করার আগে বিমল চক্রবর্তী বউয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নেবে কিনা!
দুটো গ্লাস দু-হাতে নিয়ে মিলু এল। গ্লাসটা নেবার সময় শ্রীমন্ত সৌজন্য জানাতেই তার সেরা হাসিটা বার করে এনে বলল, ‘আপনাকে সেদিন মিনিবাসে বিমলদার সঙ্গে দেখলাম। শ্যামবাজারে আপনারা নেমে গেলেন।’
‘দাঁত তোলাতে ডেন্টিস্টের কাছে যাচ্ছিলাম।’ মিলু লাজুক হাসল। গালে টোল পড়ল। শ্রীমন্ত দুই চুমুকে গ্লাস খালি করল।
‘মিলু গত বছর এম এ পাশ করেছে, বাংলায়। হাই সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে।’ অযাচিতভাবেই মিলুর মা খবরটা দিলেন। শ্রীমন্ত বিস্ময় ও শ্রদ্ধা মুখে ফুটিয়ে তুলল।
‘খুদিনগর গার্লস স্কুলে এখন তো পড়াচ্ছে। ওর খুব ইচ্ছে রিসার্চ করার।’
শ্রীমন্ত বাঁ হাত তুলে নাক চুলকোবার ছলে ঘড়ি দেখে নিল। পৌনে একটা।
‘তুমি খুদিনগর ক্লাবে ব্যায়াম করতে, না?’
শ্রীমন্তর মতোই সুবিনয় অবাক হয়ে বলল, ‘পিসিমা তুমি এই খবরটাও জান?’
পিসিমা মুচকি হাসলেন। শ্রীমন্ত বলল, ‘ওখানেই বিমলদার সঙ্গে আলাপ, তাই হয়তো জেনেছেন।’
‘মিলুও যেত যোগব্যায়াম করতে। এখনও আসন করে বাড়িতে। ওকে দেখলে বুঝতে পারবে না কী পরিশ্রমী!’
‘তোমার মতো পার্টির কাজটাজ করে?’ সুবিনয় জানতে চাইল। বিমলের স্ত্রী ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘ওর বাবা মেয়েদের একদম ওদিকে যেতে দেননি। বলেন পড়াশুনো করুক, বিয়ে-থা করে ঘর সংসার করুক, রাজনীতি করে আর কাজ নেই। তুমি কী বল বাবা?’
শ্রীমন্ত হুঁশিয়ার হয়ে গেল। রাজনীতি সম্পর্কে বিমল চক্রবর্তীর বিতৃষ্ণার কথা সে এই প্রথম শুনল। শুনে ভরসা পাচ্ছে। নেতাদের ছেলেমেয়েরা রাজনীতিকেই ব্রত করেছে এমন ব্যাপার এদেশে প্রায় ঘটেই না। তবে এখন এটা তো ব্যাবসা, যদি ছেলে থাকত তাহলে বিমল চক্রবর্তী তাকে হাতে ধরে রাজনীতিতে আনত না কি?
‘মেয়েদের রাজনীতিতে না আসাই ভালো।’ শ্রীমন্ত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল বাঁ হাত তুলে।
‘আমারও তাই মত।…তুমি কি রাত্রে আসবে, তাহলে ওকে বাড়িতে থাকতে বলব।’
‘হ্যাঁ, বিমলদাকে একটু থাকতে বলবেন। কিছু দরকারি কথা ওঁকে বলতে মামা আমাকে পাঠিয়েছেন।’
