বিমূঢ়ের মতো সে অসীমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অসম্পূর্ণ বাক্যটি অসীমাই শেষ করে দেবে যেন সেই অপেক্ষায় রয়েছে সে।
ভাইপো ওর কানে কানে কী বলছে, অসীমা মাথা নাড়ছে।
‘এখন খেলে বিকেলে কিন্তু পাবে না।’
‘না চাইব না।’
দু-জনে উঠে ঘরে গিয়ে ঢুকল।
শ্রীমন্তর মনে হচ্ছে, ঘনকুয়াশা তার মাথার মধ্যে থমকে গেছে। সে পরিষ্কারভাবে যুক্তি দেখতে পাচ্ছে না।
একদিকে বোনকে স্বীকার করে নেওয়ার, তার কাজকে অনুমোদন করার একটা মানবিক দায়; বন্ধ ডোবার মতো তাদের বাড়িটায় নতুন একটা স্রোত আসার চেষ্টা হিসাবেই সে প্যান্ট পিসটা শ্যামলকে দিতে চায়।
আর একদিকে শুধুই অসীমাকে খুশি করা। কীজন্য? ওর মন জয়ের জন্য? এক যুবক নিজের জন্য তো এটা চাইতেই পারে, এতে অন্যায়টাই বা কী? কিন্তু সে তো সংসারী ছেলে, গত দশবছর ধরে বাড়ির সবাই তো এই বলেই তাকে প্রশংসা করে যাচ্ছে। তার নিজের জন্য কোনো মন নেই। থাকলে কী সে মামার কাজ করত।
ভাইপোর সঙ্গে ঘর থেকে কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে অসীমা অবাক হয়ে এধার- ওধার তাকিয়ে বলল, ‘ওমা, উনি চলে গেলেন!’
সামান্য হলেও প্যান্ট পিসটা শ্রীমন্তকে উদব্যস্ত করে দিল। সে কোন দিকে যাবে, সবার দিকে না নিজের দিকে? অসীমাদের বাড়ি থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসাটা, এই দোটানারই ফল। যদি অসীমা বলে, হ্যাঁ পিসটা নেব! তাহলে সে কী করত? সহজ সমাধান একটা তো আছেই, শ্যামলের জন্য আর একটা কিনে ফেলা।
কিন্তু তার তখন ওই ভয়টাই মনে কাজ করছিল-যদি অসীমা বলে, হ্যাঁ নেব! ওকে দেখে সে কেমন জানি, নিজের উপর সহজ একটা আস্থা বোধ করতে শুরু করছিল। কারোর উপর ভরসা না করে, নিজের জোরে যতটুকুই, যত সামান্যভাবেই হোক বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টার একটা ছবি সে দেখতে পাচ্ছিল। ছবিটায় কালি লাগুক এটা সে চায়নি।
অবশ্য অসীমা যে উপহারটা নেব বলতই, এমন কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ‘তাহলে তো উপহার নিতেই হয়, উফফ’, কথাটা তো নেহাতই ঠাট্টার ছলে বলা। কিন্তু জন্ম থেকেই সে এমনভাবে বড়ো হয়ে উঠেছে যে সব ব্যাপারের কালো দিকগুলোই তার চিন্তায় প্রথমে ভেসে ওঠে, সে শুরুতেই দমে যায়। ধরে নেয়, পারবে না।
নিজের এই মনোভাবটাই বদলাতে হবে। শ্রীমন্ত হাঁটতে হাঁটতে নিজের ত্রুটির কথা স্বীকার করে, শোধরাবার জন্য প্রথমেই বেছে নিল বিমল চক্রবর্তীকে। এই লোকটা একটা চ্যালেঞ্জ। একে তার স্বার্থ, তার মানে মামার স্বার্থরক্ষার জন্য কাজে রাজি করাতে হবে। লোকটা একসময় সৎ আদর্শবাদী ছিল। খেটেছে, কষ্ট স্বীকার করেছে পার্টির জন্য। পরিচ্ছন্ন চরিত্রের জন্য বিমল চক্রবর্তীকে সবাই শ্রদ্ধেয় নেতা বলে স্বীকার করেছে। কিন্তু জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে এসে উনি, অকাদাদুর কথায়, ‘বড়ো পুঁজি রাজনীতিকে এখন পকেটে পুরেছে…রাজনীতিকরা এখন দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে’-দেখে দেখে, অবশেষে স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতরাবার ইচ্ছাটা হারিয়ে ফেলেছেন।
এখন বিমল চক্রবর্তী ক্লান্ত। এখন তলিয়ে যাবার জন্য সে তৈরি। মামার কাছে সুপার-মার্কেটে বিনা সেলামিতে ঘর চেয়েছিল গোপনে। ওর তাঁবের ছেলেরা মামার বিরুদ্ধে গতবার কাজ করেনি। সেজন্য কত টাকা ওকে দিতে হয়েছিল মামা সেটা অবশ্য ভাঙেনি। এই লোকটি ধানাই পানাই পছন্দ করে না, স্ট্রেটকাট কথা বলে।
সঙবাজার অঞ্চলটা খুদিনগর সুপারমার্কেট থেকে আধমাইল দূরে, বারো নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে, পুরসভা এলাকার শেষপ্রান্তে। বিমল চক্রবর্তীর একতলা বাড়িটা চারবছর আগে তিনখানি শোবার ঘর নিয়ে উঠেছিল। এখন দোতলায় একটি ঘর তৈরির কাজ চলছে। দু-পাল্লার ছোটো লোহার ফটক, তারপর দু-ধাপ সিঁড়ি, একটা ছোটো চৌকো বারান্দা বা দালান। তার দেওয়াল ঘেঁষে বেঞ্চ এবং কাঠের চেয়ার। বিমল এখানেই লোকজনের সঙ্গে দেখা করে। সবসময়ই এই জায়গায় নানান ধরনের মানুষ বসে থাকে।
এখন বারান্দাটা জনশূন্য। শ্রীমন্ত ফটকের বাইরে থেকেই বুঝে গেল বিমল চক্রবর্তী তাহলে বাড়ি নেই। সম্ভবত অফিস গেছে। ফিরে যাবে কি না ভাবছে, তখন ভিতর থেকে ‘আরে শ্রীমন্ত না!’ বলে কে চেঁচিয়ে উঠল।
যে লোকটি বেরিয়ে এল তাকে চিনতে শ্রীমন্তর তিন সেকেন্ডও সময় লাগল না। চার বছর স্কুলে তারা একসঙ্গে পড়েছে, উচ্চচমাধ্যমিক পাশ করেছে। তবে ঘনিষ্ঠতা ছিল না।
‘সুবিনয়! তুই এখানে?’
‘এটা তো আমার পিসির বাড়ি।’
শ্রীমন্ত ভিতরে ঢুকল। ফ্রক আর শালোয়ার-কামিজ পরা দশ থেকে পনেরো বছর বয়সি তিনটি মেয়ে বারান্দায় এসে উঁকি দিয়ে চলে গেল। বিমল চক্রবর্তীর ছয় মেয়ে, এরা বোধ হয় তারই অর্ধেক।
‘এখানে তুই, ব্যাপার কী?’ সুবিনয় জানতে চাইল। ‘বোস, বোস।’
শ্রীমন্ত চেয়ারে বসল ঘরের খোলা জানালার দিকে মুখ করে। বিমল চক্রবর্তীর আর্থিক সংগতির কিছুটা আঁচ ঘরের অবস্থা দেখে তো পাওয়া যাবে। লোডশেডিং চলছে, হাওয়ার জন্য জানলার পর্দা সরানো। রবীন্দ্রনাথের বহু প্রচলিত মুখের ছবি বাঁধিয়ে দেওয়ালে। দেওয়াল আলমারিতে একই রকমের মলাটের সাত-আটটি বই, বোধ হয় রবীন্দ্র রচনাবলী, নীচের তাকেও বই। টেবলের একটা কোণ দেখা যাচ্ছে তাতে কিছু খাতা, টেবল ল্যাম্প। দেওয়ালে আর ঝুলছে মাদুরের উপর আঁকা বাঁশঝাড়ের মাথায় চাঁদ।
