তা হলে অকাদাদুর উপরই কী ভার পড়েছিল…?
‘থামলেন কেন, বলুন।’ শ্রীমন্ত নিজেকে শান্ত রেখে, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার চেষ্টা করল।
‘আর উনি বলতে পারেননি। উঠে পড়লেন, বাথরুমের দিকে এগোলেন আর টলে পড়ে গেলেন।’
‘উনি কোনো নাম বলেননি?’ শ্রীমন্ত নিরীহ কৌতূহল দেখাল। অসীমা মাথা খাটায়। কে জানে ওর মাথাতেও খটকাটা লেগেছে কি না!
‘না। একটা নামও নয়।’
বাচ্চচা ছেলেটা বাইরে কোথাও ছিল, এখন সে অসীমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘ভাইপো। দাদা একটা মুদির দোকান করেছে, বউদিও দোকানে বসে। ভালোই চলে।’
‘আপনার বাবাকে দেখছি না?’
‘বাবার কথা আর বলবেন না। কোথা থেকে শুনেছেন মিলের গোডাউনে যে কোটি টাকার তৈরি কাগজ পড়ে আছে তা নাকি বিক্রি করে কিছু মাইনে দেওয়া হবে। তাই সক্কাল বেলায়ই ছুটেছেন মিলে খবর নিতে। মিল অবশ্য বন্ধ, ওই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে জটলা হবে। এরকম কতবার কত আশ্বাস যে দু-বছরে শোনা হল।’
‘দাদুকে কি তারপর আর দেখতে গেছেন?’
‘না, বড্ডই দূর তা ছাড়া সময়ও করে ওঠা যায় না।’
‘কাল ওঁকে বাড়িতে আনা হবে। আসবেন ওঁকে দেখতে?’ শ্রীমন্তর সন্দেহ হল তার মুখে আবেদন জানানোর মতো কিছু একটা বোধ হয় ফুটে উঠল। নয়তো অসীমার কপালের চামড়া নড়ে উঠবে কেন?
‘পারলে যাব, আপনাদের ওখানে ভিজিটিং আওয়ার্স নেই তো?’
শ্রীমন্ত হাসল। এই সময় রান্নাঘর থেকে ‘খুকু’ ডাক শুনে অসীমা উঠে গেল এবং ফিরে এসে বলল, ‘আপনি কাঁঠাল খান?’
কাঁঠালে তার আসক্তি নেই কিন্তু আরও কিছুক্ষণ অসীমার সান্নিধ্য পাবার ইচ্ছাটাকে ফলপ্রসূ করতে হলে তাকে উৎসাহ দেখাতে হবে। ‘নিশ্চয় খাই। বহুদিন খাইনি।’
একটা বাটিতে মুড়ির উপর পাঁচ-ছটি বড়ো আকারের কোয়া নিয়ে এল অসীমা। ‘খাজা, রসা কাঁঠাল নয়, মা মুড়িও দিয়ে দিল।’
খেতে খেতে শ্রীমন্ত বলল, ‘সকালে আমাদের জলখাবার ছিল মুড়ি, ফুলুরি, আর পেট ভরিয়ে জল, ব্যস, দুপুর পর্যন্ত নিশ্চিন্তি।’
‘এদেশি লোকেরা তেলেভাজাটা খুব খায়।’
‘এদেশি লোকেরা নয় গরিবরা। ওই যে বললাম তেলেভাজার উপর জল, ওতে অনেকক্ষণ খিদে মেরে রাখে।’
‘আপনারা গরিব নাকি!’ অসীমা দ্বিধাগ্রস্ত চোখে তাকাল।
‘খুদিনগরের ওই বাড়িতে থাকি বলে কী আপনি ধরে নিয়েছেন আমি বড়োলোক? আপনাকে সেদিন বলেইছি তো এটা মামার বাড়ি। আমার নিজের বাড়ি দর্জিপাড়ায়…যথেষ্টই গরিব আমরা।’ কথাটা এই পরিবেশে এই বাড়িতে বসে বলতে পেরে শ্রীমন্ত অত্যন্ত তৃপ্ত বোধ করল। অসীমার সঙ্গে যেন একই স্তরে নিজেকে আনতে পারল। আরও সহজভাবে তারা কথা বলতে পারবে।
‘আপনাকে দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। ধুতি-পাঞ্জাবিতে সেদিন…’
‘ব্যস ব্যস, ওই একটাই ধুতি আর একটাই র সিল্কের পাঞ্জাবি। মামার দেওয়া পাবলিক রিলেশন করার ইউনিফর্ম, চটিটাও। ভালো কথা, সেদিন সাংবাদিকদের দেবার জন্য উপহার ছিল একটা করে প্যান্ট পিস, আপনাকে দেখে খুব বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। ফট করে একটা মেয়ে এসে হাজির হবে এটা তো আর ভাবিনি! বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম, প্যান্ট পিস নিয়ে আপনি কী করবেন? তবু রক্ষে আপনি উপহার রিফিউজ করেছিলেন।’
‘আরে আপনি আগে বলবেন তো কী উপহার দিচ্ছেন! বাড়িতে তো প্যান্ট পরার লোক থাকতে পারে।’ অসীমা মজা করেই বলল কিন্তু শ্রীমন্তর কানে ক্ষীণভাবে যেন একটা আক্ষেপও ধরা পড়ল।
‘একটা পিস কিন্তু এখনও রয়ে গেছে।’ শ্রীমন্ত বাজিয়ে দেখতে চায় আক্ষেপটা সত্যিই কিনা। ‘এনে দেব?’
অসীমা হাসছে। ‘লেখাটা বেরিয়ে গেছে আর সেটা ব্রজরাখাল মুখোপাধ্যায়ের মনোমতো হবে বলে তো মনে হয় না। ‘স্বাগত ভাষণ দেন’ বলে শুধু তাঁর নামটুকু বেরিয়েছে… এর পরও উপহার দেবেন?’
‘কেন দেব না! মামার প্রচুর টাকা, ব্ল্যাকমানি, অ্যাম্বিশন মন্ত্রী হওয়া এবং কোনো একটা ডান কী বাম পার্টিতে ঢুকে একদিন হবেনও। বাবা বিপ্লবী, বাড়িতে পুষে রেখেছেনও এক বিপ্লবীকে সুতরাং-।’
‘কিন্তু অক্ষয়ধন মিত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মাসে মাসে যে টাকা খরচ করতে হবে সেটা কী করবেন?’ অসীমা তার সন্দেহটা জানিয়েই শ্রীমন্তর হাত থেকে খালি বাটিটা নিয়ে উঠে গেল, ফিরে এল জলের গ্লাস হাতে।
‘মামার মাথায় ঢোকাতে হবে, এটার দারুণ একটা পাবলিসিটি ভ্যালু আছে। বিপ্লবীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা মানে তো বিপ্লবকেই বাঁচাবার চেষ্টা, সেজন্য অকাতরে অর্থব্যয় করে আপনি নিজেই একজন বিপ্লবীর ইমেজ পেয়ে যাবেন আর ইন দি লংরান এটা আপনাকে বহু দূর, রাইটার্স পর্যন্তও নিয়ে যাবে-বুঝলেন, এইভাবে যদি বোঝাতে পারি তাহলে মামার হাত থেকে টাকা গলবে।’
মাথাটা ডানদিকে কাত করে অসীমা বেশ জোরেই হাসছে। হাসির দমকে দেহ কাঁপছে। ব্রেসিয়ার না পরার জন্য যে আন্দোলন শ্রীমন্ত স্বচ্ছন্দ মনেই তা দেখতে দেখতে হঠাৎই রেবার চেহারাটা মনের উপর দিয়ে ভেসে গেল। ‘মাসে আড়াই শো দেয়’, কথাটার মানে কী? অমন করেই বা বলল কেন?
‘তাহলে তো উপহার নিতেই হয়, উফফ… এত বোকা লোক!…।’
‘প্যান্টের কাপড়টা কী আমি এখানেই-‘
কথাটা শেষ করার আগেই শ্রীমন্তর মনে পড়ল দিপুকে। তাকে সে কথা দিয়ে এসেছে। বলেও এসেছে, প্যান্ট পিস শ্যামলের জন্য কিনে রেখেছে। তাহলে? …তাহলে?
