‘তা বটে।’ চায়ে চুমুক দিল শ্রীমন্ত। চিনি আর গরম জল। ‘কিন্তু তাই বলে ওঁর মতো লোককে তো মরে যেতে দেওয়া যায় না।’
‘দেবেন কেন মরতে, আপনার মামার তো প্রচুর টাকা…এক কাজ করুন, ওনার একটা কিডনি বদলে ফেলুন। তা হলে আর ডায়ালিসিসের ঝামেলা থাকবে না।’
‘হ্যাঁ তা করলেও হয়। মামাকে বলতে হবে। ব্যাপারটা কী জানেন, আপনি যাবার আগের দিন রাতে দাদুর সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি খুব অন্যায় একটা কথা ওঁকে বলেছি। দেশটাকে পলিটিশিয়ানরা খুবলে খুবলে যখন শেষই করে দিচ্ছে তখন আপনি আর বিপ্লবী না থেকে, এদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার কাজে না নেমে পাশ কাটিয়ে, শুধু পরিবেশ দূষণের কথাই বলছেন। এটা পলায়নি মনোবৃত্তি।…কথাটা ওঁকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে। আমি ওঁর মুখ দেখেই বুঝেছি খুব কষ্ট পেয়েছেন। উনি আমার সঙ্গে তারপর আর একটিও কথা বলেননি।’ শ্রীমন্তর গলা ধরে এল। ‘জীবনের শেষে এসে এমন কথা ওঁকে শুনতে হল।…আমি কিন্তু সিরিয়াসলি মোটেই বলিনি।’ অসহায়ের মতো শ্রীমন্ত তাকিয়ে রইল অসীমার গম্ভীর এবং বিব্রত মুখের দিকে।
‘আপনার মাথায় কী হল?’ প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য অসীমা বলল।
‘সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পিছলে পড়ে ঠুকে গিয়েছিল।’ কোনোক্রমে জবাবটা দিয়েই শ্রীমন্ত তার আগের কথার জের ধরে বলল, ‘…কেন জানি, আমার এই অকাদাদুকে খুব ব্যর্থ বলে মনে হয়। ওঁকে আবার একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। মানে, উনি একটা ভালো, দরকারি কাজই তো করতে চাইছেন, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে সঙ্গে এদেশের মানুষেরও মঙ্গল হোক চাইছেন,…আপনার কী মনে হয়?’ শ্রীমন্ত ব্যগ্র প্রত্যাশা ভরা চোখে তাকাল। অসীমার মুখে হালকা কৌতূহল বিচরণ করছে।
‘আপনি একটু উপরের স্তরে বিচরণ করছেন। পৃথিবী, দেশ, মানবজাতি এইসব লেভেলে ওঠা আমার মতো লোকের পক্ষে একটু কঠিনই। আমার বাবা একটা খুব বড়ো কাগজের মিলে কাজ করতেন, সেই মিল আজ দু-বছর বন্ধ, দু-বছর মাইনে পান না। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ছেলের বউ আর চার বছরের নাতি, তারা খাবে কী? না, না, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন একটা মাত্র পরিবারের কথা নয়, আমাকে লেখার জন্য ঘুরে ঘুরে তথ্য জোগাড় করতে হয়েছে। এই রাজ্যে কমপক্ষে একশো তিরিশটা বড়ো কলকারখানা বন্ধ। ছোটো-ছোটো আঠারো-উনিশ হাজার শিল্প বন্ধ। মোট প্রায় তিন লাখ লোকের কাজ বন্ধ। এদের পরিবারের লোক যদি ধরেন তা হলে উপোসী মানুষের সংখ্যাটা কত হবে? এর সঙ্গে যোগ করুন সরকারি খাতায় নাম লেখানো তেতাল্লিশ লাখ বেকারকে।…এই সব সংখ্যাগুলো দিয়ে অক্ষয়ধনবাবুকে প্রশ্ন করেছিলাম, পরিবেশ দূষণের থেকেও আমাদের সামাজিক-রাজনীতিক-আর্থনীতিক দূষণটা বেশি মারাত্মক কি না?’
শ্রীমন্ত নিষ্পলক তাকিয়ে অসীমার মুখের দিকে। একটা প্রবল আবেগ কোনো মেয়ের মুখের চামড়ার নীচে ধিকধিক করলে তাকে যে কত উজ্জ্বল দেখায় এটা সে এই প্রথম দেখছে।
‘উনি সরাসরি জবাব না দিয়ে অনেকক্ষণ ভাবলেন।’ অসীমার মুখের উজ্জ্বলতা এখন অনেকটাই কমে এল। গলার স্বর নামিয়ে এনে বলল, ‘তারপর এলোমেলোভাবে ভেজাল, ঘুস, পণপ্রথা নিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বললেন, আজ যে এই দূষণ দেখছ এসব হঠাৎ তো হয়নি, নানান গলদ গোড়া থেকেই ঘটে গেছে। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরা, বিশেষ করে বাঙালি ছেলেরা বোমা-পিস্তল নিয়ে এত বড়ো একটা দেশকে স্বাধীন করবে, তা কখনো হয়? এই বলে তিনি ওঁর জানা একটা ঘটনার উল্লেখ করলেন। খুব ইন্টারেস্টিং গল্পটা। কলকাতার এক বন্দুকের দোকানের জন্য ইংল্যান্ড থেকে দশবাক্স পিস্তল আর গুলির চালান আসে। সেই পিস্তল, সংখ্যায় পঞ্চাশটা, বিপ্লবীরা হাতিয়ে নেয় খিদিরপুর থেকে আসার পথে। বিপ্লবীদের মধ্যে চুয়াল্লিশটা বিলি হয় আর ছ-টা নিয়ে একজন বিপ্লবী সরে পড়ে।
‘এরপর তিনবছরের মধ্যে সারা বাংলায় চুয়ান্নটা ডাকাতি হয়, খুনও যথেষ্ট হয়। আর এই সব খুন ডাকাতির নায়ক সেই একজনই। পরে সে ধরা পড়ে আর পুলিশের অত্যাচারে সব স্বীকারও করে। ফাঁসি হওয়ার বদলে তার মাত্র দেড় বছরের জেল হল। জেল থেকে তার বেরোবার পরেই বিপ্লবীদের কয়েকটা গোপন ডেরায় পুলিশ হানা দিল, কিছু বিপ্লবী ধরা পড়ল, বিপ্লবীদের বহু প্ল্যান পুলিশ কীভাবে যেন জেনে যেতে লাগল। শেষকালে তারা জানতে পারল তাদের মধ্যেই একজন পুলিশকে ভিতরের খবর পাচার করছে আর সে হল এই লোকটিই যে দেড় বছর জেল খেটে বেরিয়ে এসেছে। বিপ্লবের জন্য টাকা তোলার নামে ডাকাতি আর খুন করে সে টাকা আর গহনার অর্ধেকটাই নিজের কাছে রাখত।
‘সাব্যস্ত হল ওকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে হবে। এ কাজের জন্য ভার দেওয়া হল এমন একজনকে যার বোনকে বিয়ে করেছে সেই বিশ্বাসঘাতক।’
অসীমা এই পর্যন্ত বলে থেমে রইল। শ্রীমন্তর বুকের মধ্যে হঠাৎই জেট বিমানের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। শেষ বাক্যটা তার কীরকম যেন চেনা লাগল। সে প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করল অকাদাদু সেদিন ঠিক কী বলেছিলেন…’রামুদা ছিল টেররিস্ট, পিস্তল নিয়ে মানুষ…থাক ওসব কথা।’ কেন প্রসঙ্গটা বন্ধ করলেন?
সে যখন বলল ‘দেশ স্বাধীন হবার আগেই নাকি বড়োলোক হয়ে গিয়েছিলেন, মা-র কাছে শুনেছি’, তখন দাদুর চোখমুখ আচমকাই কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কেন হয়ে গিয়েছিল?
