খাতাটা হাতে নিয়ে শ্রীমন্ত উঠে দাঁড়াল। ব্রজরাখাল চেয়ারে হেলান দিয়ে শিথিল হয়ে বললেন, ‘সেই সার্ভের কথাটা মনে রাখিস।’
‘কোন সার্ভে?’ প্রশ্নটা করেই শ্রীমন্তর মনে পড়ল। ‘ওহ হ্যাঁ, সমাচারের নিউজ এডিটারের সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা করবে তবে দূরেরগুলো আগে শুরু করবে, কলকাতার কাছেরগুলো পরে। ভালোই হল, ইলেকশনের কাছাকাছি সময়ে হলে ইমপ্যাক্টটা টাটকা থাকবে।’
‘ওই মেয়েটাই তো লিখবে।’
সেইরকমই ঠিক হয়ে আছে।’ একটুও না ভেবে শ্রীমন্ত জবাবটা দিল।
‘ওকে একটু জপা। ইয়াং মেয়ে …বাড়িতে গিয়ে আলাপ টালাপ কর।’ ব্রজরাখাল তির্যক চোখে তাকিয়ে হাসিটাকে রহস্যময় করলেন।
ঘর থেকে বেরিয়েই শ্রীমন্ত ভাবল, অসীমার বাড়িতেই বরং এখন যাই। অকাদাদুর জন্য ডাক্তার ডেকে এনেছে, নিশ্চয় তাহলে জানে ওঁর অসুখের অবস্থাটা কেমন। সে ডায়ালিসিস শব্দটিই শুনেছে মাত্র। এটার দ্বারা অকাদাদুকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এর মানেটা কী?
কলঘর থেকে বালতি হাতে রেবা বেরিয়ে আসছিল, শ্রীমন্তকে উঠোনের ওধার দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে ধমকে দাঁড়াল। শ্রীমন্ত সেটা লক্ষ করেও না দাঁড়িয়ে দালান পেরিয়ে চলে গেল কেননা দোতলার বারান্দায় মামি নাতিকে কোলে নিয়ে টিয়াপাখির সঙ্গে তখন কথা বলছে। ফর্ম ভরার কাজ অন্য সময়েও করা যাবে।
বাসে চড়ে কলকাতায় অফিস করতে যাওয়ার সময় পেরিয়ে গেলেও, ভিড় প্রচণ্ড। শ্রীমন্ত ঘড়ি দেখল। এইটুকু তো পথ তাই সে বাসে ওঠার কথা ভাবল না। সেদিন ন-টার সময় অসীমা টিউশনি থেকে ফেরেনি, বাবা বললেন এখনি ফিরবে। এখন পৌনে দশটা, নিশ্চয় ফিরেছে।
বেড়ার আগলটা ঠেলে শ্রীমন্ত দু-পা এগোতেই দেখল রান্নাঘরে পিছন ফিরে অসীমা উবু হয়ে ঝুঁকে কিছু খাচ্ছে। পরনে রং ফিকে হয়ে যাওয়া লাল ছাপা শাড়ি, খয়েরি ব্লাউজ। নিতম্ব থেকে কাঁধ পর্যন্ত দেহের পিছন দিক এত প্রখরভাবে বস্ত্রের আচ্ছাদনকে অগ্রাহ্য করছে যে শ্রীমন্ত ঝটতি চোখ সরিয়ে বাইরের দালানের দিকে তাকাল। সেখানে তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন এক প্রৌঢ়া, যাঁর মুখে অসীমার আদল। শ্রীমন্ত গলাখাঁকারি দিল।
ওরা দু-জনে একই সঙ্গে ফিরে তাকাল।
‘আরে আপনি!’ অসীমা উঠে দাঁড়াল। ‘আসুন, আসুন…আগেও একবার এসে ফিরে গেছেন শুনলাম।’
হাত ধুয়ে অসীমা ঘর থেকে টুল এনে বাড়ির ছায়ায় রেখে, ঠিক ওর বাবার মতোই বলল, ‘এখানে বসুন, হাওয়া আছে।’
‘টিউশনিতে গেছলেন, আমি আর অপেক্ষা করিনি…একটা কথা জানতে এসেছি।’ টুলে বসেই শ্রীমন্ত লক্ষ করল অসীমার শাড়িতে সেলাই, ব্লাউজের কাঁধেও।
‘বসুন বসুন, চা খাবেন? গতকাল থেকে পড়াতে যাচ্ছি না, ছাত্রীর হাম হয়েছে।’
‘খাব।’
অসীমা রান্নাঘরের দরজা পর্যন্ত গিয়ে, মাকে চা করার কথা বলে ফিরে আসা পর্যন্ত শ্রীমন্ত ওর উপর থেকে চোখ সরায়নি। একটু হতাশই হল, কেননা ‘অসীমা শাড়ির আঁচল দিয়ে ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বাঙ্গ মুড়ে ফেলেছে।
‘বলুন?’ দালানে পা ঝুলিয়ে অসীমা মুখোমুখি বসল।
‘দাদুর কী হয়েছে?’
‘টার্মিনাল রেনাল ফেলিয়োর…বুঝলেন কিছু? আমিও বুঝি না আর বেশি বোঝার চেষ্টাও করি না। কিডনি আর কাজ করছে না, শুধু এইটুকুই জানি।’
‘আপনি গিয়ে দেখলেন কী? আপনার সঙ্গে ওনার কথাবার্তা হয়েছে?’
‘কথা বলার মধ্যেই তো বাথরুমের দিকে যেতে গিয়ে টলে পড়লেন। আর এই রোগে অসুস্থ মানুষের চেহারা কেমন হয় তা আমার দেখা আছে। ওঁকে দেখেই কেন জানি মনে হল, তাই জিজ্ঞেস করতে বললেন, চারদিন ধরে পেচ্ছাপ বন্ধ।’
শ্রীমন্ত জিজ্ঞাসু চোখে শুধু তাকিয়ে রইল। অকাদাদু খুবই চাপা স্বভাবের। অসুখের কথা কাউকেই বলবেন না, মরে গেলেও নয়। কিন্তু অসীমার কাছে বলেছেন। হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন আর চেপে রাখাটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া অল্পক্ষণের মধ্যে আস্থা জিতে নেবার ক্ষমতা অসীমার আছে।
‘আপনাকে উনি বললেন, চারদিন বন্ধ?’
‘হ্যাঁ, তখনই তো বুড়ো মতন কাজের যে লোকটি, তাকে বললাম বাড়িতে কে আছেন শিগ্গিরি ডেকে আনুন। ডেকে আনল আপনার দিদিমাকে। তাঁকে বললাম এক্ষুনি একজন ইউরোলজিস্টকে আনুন। তিনি আর কী বোঝেন, আমাকেই তখন ফোন করে ডাক্তার সুবিমল পাইনকে আনতে হল। আমাকেই সঙ্গে করে সানফ্লাওয়ার নার্সিংহোমে যেতে হল। টাকার অভাব যখন নেই তখন ভালো জায়গাতেই যান। তা ছাড়া ওখানে ডায়ালিসিস করা হয়…কিডনি ট্র্যান্সপ্ল্যান্টও।’
‘তা হলে অবস্থাটা এখন?’
‘তিনদিন অন্তর ডায়ালিসিস করে করে ওনাকে বেঁচে থাকতে হবে। প্রতিবারের জন্য খরচ ধরুন, আটশো-সাড়ে আটশো।’ অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে অসীমা কথাগুলো বলে দিল।
শ্রীমন্ত হতবাক। মাসে তা হলে তো প্রায় আট-ন হাজার টাকা! অকাদাদুকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি মাসে এত টাকার দরকার? এটা তো একটা অবাস্তব কথা, অবিশ্বাস্য! এত টাকা কী মামা খরচ করে যাবে? সে অন্যমনস্ক হয়ে একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘চা ধরুন।’
মা-র হাত থেকে কাপটা নিয়ে অসীমা এগিয়ে ধরল। নেবার সময় অসীমার আঙুলে তার আঙুল স্পর্শ করল কিন্তু শিহরন বোধ করার মতো মনের অবস্থা তার তখন নেই। শুধু অস্ফুটে বলল, ‘বাঁচিয়ে রাখতে হলে এত টাকা লাগবে?’
‘ওঁর যা বয়স, তাতে এমনিতেও তো আর কতদিন বাঁচবেন?’
