দরজার কাছে গলাখাঁকারির শব্দে ওরা দু-জন তাকাল। বিজয় আঙুল দিয়ে ব্রজরাখালের অফিসঘরের দিকে খোঁচা দিয়ে বলল ‘ডাকছে।’
‘পরে লিখে দেব, এখন এটা তোমার কাছেই রাখ।’ শ্রীমন্ত ব্যস্ত হয়ে খাট থেকে নেমে চটির দিকে এগোল। রেবা দরজার কাছে গিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘মাসে আড়াইশো দেয়।’ কথাটা বলেই দ্রুত বেরিয়ে গেল।
ভেজানো দরজা খোলাই রয়েছে। মামার হাতে সমাচার। উপর থেকে নীচ সরসর করে চোখ ওঠানামা করছে। একটা খবরও পড়ার যোগ্য বলে তার মনে হচ্ছে না।
‘আয়, বোস।’
আর একবার কাগজে চোখ বুলিয়ে ব্রজরাখাল গম্ভীর মুখে শুরু করতে যাবার আগেই শ্রীমন্ত বলল, ‘অকাদাদুর অবস্থা কেমন? দেখতে যাব, আছেন কোথায়?’
‘ভালোই আছেন।’ ব্রজরাখাল সহজ নিরুদবিগ্ন গলায় দুটি শব্দেই বুঝিয়ে দিলেন অক্ষয়ধন মিত্র বিষয়ে কথাবার্তা এখন চলবে না। ‘কিশোরী আর মনুর কাছ থেকে কতকগুলো খবর পেলাম। পার্টি থেকে এবারও বিমল চক্রবর্তীকে চেয়ারম্যানের জন্য ক্যান্ডিডেট করবে না, আমাকেই আবার করবে। তাইতে বিমল পার্টি ছাড়বে কিনা সেটা পরে পরিস্থিতি বুঝে ঠিক করবে। আমার মনে হচ্ছে, শোধ নেবার জন্য ও বামফ্রন্টকে ডোবাবে। তার মানে, আগের বারের মতোই আমাকে চেয়ারম্যান হতে দেবে না। তিনটে কমিশনার তিনটে ভোট ওর হাতে।’
শ্রীমন্ত মামার মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব রইল। এখন তার কথা বলার দরকার নেই। তার মাথায় এখন অকাদাদু। চোখে ভেসে উঠছে শেষবার তাকে দেখার ছবিটা… সেই তাকানো, সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া।
‘এইবার যে কাজটা সেটা কিশোরীদের কাছে একদম গোপন রেখে করতে হবে। মনে আছে তুই সেদিন কী বলেছিলি? রিয়েল পলিটিসিয়ানের মতো এবার কাজ করতে হবে। …বিমল চক্রবর্তীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলতে হবে। হ্যাঁ ওর প্রাপ্য ওকে তো দিতেই হবে। ব্যাবসা করি, এটা আমি মানি।…আট বিঘে জমি চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। বহু বহু লাখ টাকা ওর দাম। আমারই জমি অথচ আমার তাঁবে নয়, আমি মালিক নই! এর থেকে অন্যায় অন্যায্য ব্যাপার আর হতে পারে?’ ব্রজরাখাল চেঁচিয়ে উঠে হাতের কাগজটা টেবল-এ ছুড়ে ফেললেন। রাগে জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে।
‘দুটো কিডনিই নাকি নষ্ট হয়ে গেছে?’
ব্রজরাখালের ক্ষোভ ভেদ করে প্রশ্নটা ঢুকতে সময় লাগল। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘রাখ তো তোর কিডনি। নষ্ট হয়ে গেছে তো আমি কী করব? ডাক্তার বলেছে এখন থেকে ডায়ালিসিসের উপরই রাখতে হবে, তাই করে যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়।’
‘আমি ওঁকে দেখতে যাব। কোথায় আছেন?’
‘সান ফ্লাওয়ারে, পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোর কাছে। তোর ওই রিপোর্টার মেয়েটা, কী যেন নাম, ওরই চেনা স্পেশালিস্ট ডাক্তারকে কল দিয়ে আনিয়েছিল, খুব কাজের মেয়ে। …কাগজগুলো দেখেছিস রজতজয়ন্তীর রিপোর্ট?’
‘না। মাথায় এই চোটটা পেলাম, সিলিং থেকে টালি খুলে পড়েছিল। কিছু পড়া টড়ার মতো মাথার অবস্থা এই ক-দিন আর ছিল না।’ শ্রীমন্ত আশা করছে না, তার মাথার চোট নিয়ে মামা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তবু যদি তার সুস্থতা বিষয়ে উদবেগ দেখান তাহলে কী কী বলবে সেটাও সে তৈরি করে রেখেছে। শুধু তার একটাই অস্বস্তি, দিপুর বিয়ের কথারই যে সূত্র থেকে মামা জেনেছেন সেখান থেকেই হয়তো মাথা ফাটার আসল কারণটাও জেনে যাবেন।
সমাচার তো আমার সম্পর্কে কিছুই লেখেনি, শুধু অক্ষয়ধন মিত্রেরই কথা। বিপ্লব মানে জাগরণ, এই নিয়েই ফলাও করে লেখা, এটা কী মিটিং-এর রিপোর্ট? পরিবেশ দূষণ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে, রাজনীতিকরা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে…আরও কীসব হাবিজাবিতে ভরা, আসল জিনিসটাই রিপোর্টে নেই? আমার কথা বাদ দাও, আরও তো অনেক ডিগনিটারিজ বক্তৃতা দিয়েছে তাদের উল্লেখও তো দু-চার লাইন থাকবে!… ওই মেয়েটাই তো লিখেছে?…ঠিকমতো খাতিরযত্ন করেছিলি?’
‘খায়নি, উপহারও নেয়নি।…আমার পড়া হয়নি, কাগজগুলোর কাটিং আছে?’
ব্রজরাখাল হাত বাড়িয়ে পাশের র্যাক থেকে একেকটা খাতা তুলে শ্রীমন্তর সামনে ছুড়ে দিলেন।
‘পরে পড়িস। এখন যা বলছি শোন।’ ব্রজরাখাল টেবলে ঝুঁকে পড়লেন। আড়চোখে দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘বিমল চক্রবর্তীর সঙ্গে এবার গিয়ে কথা বল। ও স্ট্রেটকাট লোক। বেশি ধানাইপানাই করতে হবে না, সোজাসুজিই বলবি, ব্রজরাখাল মুখুজ্জে অন্যায় করেছে, এবার সেটা শুধরে নিতে চায়। সুপারমার্কেটে তিনতলায় দুটো ঘর এখনও খালি আছে, দুটোই দেব, কোনো সেলামি লাগবে না। তার বদলে কী চাই, তা তুই ওকে বলবি।’
‘যদি রাজি না হয়?’
‘রাজি করাতে হবে… সেজন্যই তো আছিস।’
শ্রীমন্তর বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল। এইজন্যই মামা তাকে মাসে মাসে টাকা দেয়। আর রাজি করাতে না পারলে যেকোনোদিনই তাকে বিদায় করে দেবে।
‘যদি আরও বেশি কিছু চেয়ে বসে?’
‘আর কী চাইবে! টাকাপয়সা?’
‘হতে পারে! ও তো একা নয়, অনেককেই কিছু কিছু খাওয়াতে হবে। তা ছাড়া জমির ব্যাপারটা একটা সেপারেট ইস্যু। ওটার জন্য বিমল চক্রবর্তী আলাদা দাম চাইবেই।’
ব্রজরাখাল চিন্তায় পড়ে গেলেন। চোখ বুজে কিছুক্ষণ কাটিয়ে বললেন, ‘ঠিকই বলেছিস। তুই গিয়ে আগে কথা বল। ওর কী রিয়্যাকশন সেটা আমায় জানা, তারপর দেখব। …পারলে আজকেই যা। আমি এখন কলকাতায় যাব। প্রেসে একটা কাজ সেরে তারপর যাব নার্সিং হোমে। মামাকে আজ ডায়ালিসিস করবে। ওঁকে নিয়েই আসব ভাবছি, দিনে দুশো টাকা গচ্চচা দিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। বাড়ি থেকে গিয়েও তো ডায়ালিসিস করিয়ে আসা যায়।…তুই বিমল চক্রবর্তীকে দ্যাখ।’
