রাস্তা পেরিয়ে বাস স্টপ বোর্ড আঁটা পোস্টের সামনে দাঁড়াবে না। একটু সরে দাঁড়ায় যেখানে গিরি তাকে দেখতে পাবে না। ও চলে যাবার পর গিরি কিছুক্ষণ অসহায় বোধ করে। মুহ্যমান হয়ে বসে থাকে। আবার বিকেলে বারান্দায় দাঁড়ায় রুনুর ফেরার সময়।
সেই সময় তার দোতলার ফ্ল্যাটের বারান্দায়ও দাঁড়ান নতুন বউটি। তার স্বামীরও অফিস থেকে ফেরার সময় হয়েছে। গিরি ওকে বারান্দায় দেখলেই পিছিয়ে আসে। স্ত্রী অফিস থেকে ফিরবে তাই স্বামী অপেক্ষা করছে এটা ভাবলেই সে কুঁকড়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক উলটো হওয়াই রীতি। রুনু প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বেরোয়, বাসে অফিসে রাস্তায় দিনের অনেকটা সময় অপরিচিত একটা জগতে কাটিয়ে ফিরে আসে। কত লোকের সঙ্গে কথাবার্তা, কাজ, গল্প করে যাদের গিরি চেনে না, দেখেনি বা শুধু নামটুকু মাত্র জানে। রুনুর সেই জগতে তার কোনও ভূমিকা নেই, অংশ নেই।
এ-জন্য তার কোনও ঈর্ষা হয় না। শুধু তার ভয়ংকর অসহ্য মনে হয় রুনুর অপসৃয়মাণ দেহটিকে। ওর অস্তিত্ব, প্রয়োজনীয়তা তখন সে তীব্রভাবে অনুভব করে।
এই মুহূর্তে রুনু আর অম্বর সিঁড়ি দিয়ে নামছে। দু’জোড়া পায়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসছে। দরজাটা বন্ধ করতে করতে গিরির মনে হল পনেরো বছর আগে রুনুই এইভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত। কান পেতে তার পায়ের শব্দ শুনত, তারপর ছুটে আসত বারান্দায়। বুকটা রেলিংয়ের বাইরে রেখে ঝুঁকে দাঁড়াত।
ওরা থিয়েটার দেখতে যাচ্ছে। গিরি ধীরে বারান্দায় দরজার কাছে এসে পর্দাটা একটুখানি সরিয়ে রাস্তায় চোখ রাখল। রুনু তাকে আবার অনুরোধ করেছিল। অম্বরও তাকে একবার বলেছিল।
গিরি একই উত্তর দিয়েছে, ”থিয়েটার আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আমার ভালো লাগে না বলে তোমরা কেন যাবে না?”
”না আমি যাব না।”
রুনু দুই মুঠো কোলে রেখে খাটে বসে থাকে অবাধ্য মেয়ের মতো।
পাশের ঘরে অম্বরের শিস শোনা যাচ্ছে। গিরি লক্ষ করেছে, গায়ে পাউডার দেবার বা জুতোর ফিতে বাঁধার সময় ও শিস দেয়। বেরোবার জন্য ও তৈরি হচ্ছে। গিরি কঠিন, বিরক্তি মাখানো স্বরে বলল :
”বসে রইলে কেন?”
দরজার বাইরে অম্বরের জুতোর শব্দ শোনা গেল, ”বউদি আমি কিন্তু রেডি।”
রুনু ফিসফিস করে বলল, ”আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।”
”তোমার জন্য পাস আনল…”
”আমি আনতে বলিনি।”
”না বললেই বা। তোমার কথা ভেবেই তো এনেছে।”
রুনু একদৃষ্টে গিরির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আমি যাই, এটা তুমি চাও না।”
”কে বলল চাই না?”
”আমি বুঝতে পারি।”
গিরি সচকিত এবং সাবধানী স্বরে বলল, ”কী বুঝতে পারো?”
রুনু কথা না বলে খাট থেকে উঠে পড়ল। দেরাজ খুলে শাড়ি বার করল। বেলেরপানা রঙের তাঁতের শাড়ি, যেটা একদিন সারা দুপুর ধরে গিরি রিপু করেছিল।
গিরি বারান্দায় বেরিয়ে এল। অম্বর বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। গিরিকে দেখেই সে ব্যস্ততার ভঙ্গিতে বলল, ”দাদা, আপনার চেনা ইলেকট্রিকের কোনও দোকান আছে? একটা পাখা ভাড়া না করলে আর চলছে না।”
”সিলিং ফ্যান?”
”হ্যাঁ। টেবিল ফ্যানে ঠিক করে সব জায়গায় হাওয়া পাওয়া যায় না। আপনি একটু দেখবেন?”
গিরি ঘাড় নাড়ল।
”আপনি থিয়েটারে যাবেন না?”
না প্রশ্ন না অনুযোগ। বারবার একই কথার জবাব একইভাবে দিতে হবে ভেবে গিরি বিরক্তি বোধ করে বলল, ”ফ্ল্যাটগুলোয় আজকাল চুরি হচ্ছে। একদম খালি ফেলে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।”
”শুনেছি বটে। শিক ভেঙে ঢুকেছিল আমাদের ফ্ল্যাটে।”
নিশ্চয়ই রুনুই বলেছে। গিরি মুখ ফিরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে গাড়ি চলাচল লক্ষ করতে লাগল।
”কই ঠাকুরপো, চলো।”
গিরি মুখ ফিরিয়ে তাকালও না। শুধু চোখের কিনার দিয়ে হলুদ রঙের একটা ঝলক দেখতে পেল বারান্দার দরজার কাছে।
বেরিয়ে যাবার সময় রুনুই চেঁচিয়ে বলল, দরজাটা বন্ধ করে দিতে।
বন্ধ করতে আসার সময় দরজার পাশেই জানলাটায় বসানো শিকটার দিকে তাকাল। কয়লা ভাঙা লোহাটা জানলায় হেলান দিয়ে রাখা থাকে, সেটা নেই। রুনু তা হলে রান্নাঘরে নিয়ে রেখেছে।
এরপর সে ধীরে ঘরে ঢুকে বারান্দার দরজার কাছে এসে পর্দাটা একটুখানি সরিয়ে রাস্তায় চোখ রাখল। ওরা দু’জন পাশাপাশি চলেছে। রুনু একবারও পিছন ফিরে বারান্দার দিকে তাকাচ্ছে না। অম্বর দু’হাত নাড়ল কিছু একটা বুঝিয়ে বলতে। রুনু মাথাটা হেলাল। দু’জন খুব কাছাকাছি হয়ে হাঁটছে। অম্বরের কনুই বোধহয় রুনুর বাহুতে লাগছে।
রাস্তা পার হবার জন্য ওরা দাঁড়িয়ে। অম্বর কী একটা বলতেই রুনু ওর মুখের দিকে তাকাল। অম্বর হাত তুলে ট্যাক্সি থামাল। রুনু ইতস্তত করছে। অম্বর দরজা খুলে কী যেন বলল। তারপর কনুই ধরে আলতো আকর্ষণ করতেই রুনু ট্যাক্সিতে উঠল।
গিরি অবসাদ বোধ করল। রুনুকে নিয়ে প্রথম ট্যাক্সিতে ওঠা মনে পড়ছে। তখন ওদের আলাপ সদ্য আপনি থেকে তুমি হয়েছে। ইউনিভার্সালের কাছে বাস স্টপে প্রতি শনিবার রুনু এসে দাঁড়িয়ে থাকত। মোহনকে এড়িয়ে সে আগেই বেরিয়ে পড়ত। ওরা হাঁটত, কোনওদিন কার্জন পার্কে, কখনও আউট্রাম ঘাটে, কখনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে। সন্ধ্যা হবার আগেই রুনুকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হত। গিরি বাদাম কিনত, রুনু খোসা ভেঙে দানাগুলো ওর হাতে তুলে দিত। মাঝে মাঝে গিরি আঙুলগুলো চেপে ধরত। কখনও কখনও পারত না। রুনু আগে বুঝে নিয়ে দানাগুলো তালুর উপর ফেলেই হাতটা সরিয়ে নিত।
