গিরি আবার মুখের মধ্যে বাসি গুড়ের স্বাদ অনুভব করল। চৌবাচ্চচার পাড়ে বসে, দুটো ক্রাচে বগলের ভার রেখে সে বালতিটার দিকে তাকিয়ে থাকল। কাপড় কাচার গুঁড়ো সাবান অম্বরের। রুনু যেন ক্রমশ অম্বরকেও তার অন্ধকারের গণ্ডির মধ্যে টেনে নিচ্ছে।
রাগ হচ্ছে না তার। কোনও ব্যাপারে কখনও সে রুনুর সঙ্গে রাগারাগি করেনি। বরং সে অবাক হয়েছে, দিনে দিনে অভিভূত হয়েছে ওর আন্তরিকতায়, একটা অকেজো মানুষকে মুখ বুজে সহ্য করায়। এক সময় সে নিজেই ভেবেছিল, রুনু যদি কিছু করে, ও যদি চায় কারুর সঙ্গে…
সাত-আটজনের কথা সে ভেবেছিল। অফিসের সহকর্মী, বিশেষ করে দত্তগুপ্ত। রুনু ওর নামটা প্রায়ই করত। দত্তগুপ্ত মারা গেছে। পাশের ফ্ল্যাটের অঙ্কের অধ্যাপক, সামনের বাড়ির যোগব্যায়ামকারী, বাড়ির নীচে লন্ড্রির মালিক কাপ্তান ছোকরা, এদের মুখ একবার করে ভেসে উঠেছিল।
কিন্তু সব থেকে জ্বালা বোধ করেছিল মোহনের মুখ মনে পড়ায়। কেন মনে হয়েছিল! সব কথাই ও বলে, কিন্তু রুনু সম্পর্কে একবারও কিছু বলেনি গিরিকে। রুনুও কিছু বলে না মোহন সম্পর্কে। নিশ্চয় চেষ্টা করেছিল। হয়তো সফলও হয়েছে। রুনুর মা চেয়েছিল মেয়েকে তার পথেই আনতে। মোহনকে হয়তো সুযোগ দিয়েছিল রুনুকে বাধ্য করাতে।
এ-প্রসঙ্গ তোলা যায় না রুনুর কাছে, মোহনের কাছে। এখন তুললে তো হাস্যকর হয়ে পড়বে। কিন্তু এ-সব কথা এখন কেন মনে হচ্ছে?
”…আমি জানি তুই ওকে সেটা বলতে পারবি না।” ঠিকই, রুনুকে সে বলতে পারেনি। এখন সে-কথা বলার অর্থ হয় না।
একদিন দুপুরে গিরি একা হাজির হয়েছিল রুনুদের বাড়ি। সেই লোকটি বাইরের রকে বসে ছিল দেয়ালে ঠেক দিয়ে। পুরনো ঢিলে ফুলশার্ট বোতাম ছিল না। একদৃষ্টে ফাঁকা আকাশে তাকিয়ে। তখনও সে জানত না লোকটি রুনুরই বাবা।
মোহনের মতোই সে আঙুলের গাঁট দিয়ে দরজায় টোকা দেয়। এই সময় রুনু কলেজে থাকে। কিন্তু কোনও কারণে যদি বাড়ি ফিরে এসে থাকে স্ট্রাইক বা প্রোফেসার আসেনি কিংবা শরীর খারাপের জন্য! ভয় হয়েছিল টোকা দেবার সময়। একটা অজুহাত অবশ্য তৈরি ছিল। যদি রুনুই দরজা খোলে, তা হলে বলবে, ”কাল মোহন একটা চাবি ফেলে গেছে।”
কাল ওরা দু’জন এসেছিল। যথারীতি ‘প্রাইভেট কথা’ বলতে মোহন উঠে গেছল ভিতরের ঘরে। গিরি একা বসে তাকিয়েছিল পর্দার ওধারে ফাঁকা চেয়ারটায়। রুনু ঘরে ছিল না। কথা প্রসঙ্গে ওর মা জানিয়ে দিয়েছিল, রুনু একটা টিউশনি পেয়েছে।
পুরনো ভ্যাপসা, ম্লান ঘরটা হঠাৎ গিরিকে কোণঠাসা করে ফেলে। অন্যান্য দিন আর একটি মানুষের উপস্থিতি তাকে সজাগ রাখত। বিষণ্ণতার মতোই একটা অনুভব, নিঃসঙ্গ ঘরে সে বোধ করতে শুরু করে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছল ভিতরের ঘরটার দিকে।
দরজা বন্ধ ছিল। সে আশা করেছিল, অশ্লীল বইয়ে পড়া, নানাবিধ শব্দের মতো কিছু কিছু শব্দ শুনতে পাবে। হতাশ হয়ে সে বাইরের ঘরটায় ফিরে আসে। নৈঃশব্দ্যে ধীরে ধীরে তাকে পুরুষোচিত উত্তেজনায় আক্রান্ত করে।
ফেরার সময় সে মোহনকে বলে, ”বড্ড দেরি করিস, অতক্ষণ লাগে কেন?”
”কোথায় দেরি করেছি? বরং আজ তো তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। তোর কি বিরক্তি লাগে?”
”লাগবে না!”
”তোর কথা আজ বলছিল, এসে শুধু শুধু বসে থাকে ছেলেটা। আমি বললুম, এখনও এ-সব করে-টরেনি, লজ্জা পাচ্ছে। বলল, একা আসতে বলুন না। যাস তো চলে যা একদিন। টাকা দশেকের তো ব্যাপার, দুপুর-টুপুরেই যাস।”
গিরি পরদিন দুপুরেই যায়।
ভিতরের ঘরে সে দেয়ালে একটা যুবতী স্ত্রীলোকের কোলে একটি শিশুর ছবি দেখেছিল। প্যান্ট খুলতে খুলতে সে ছবি থেকে চোখটা সরিয়ে নেয়। স্ত্রীলোকটি তার সামনেই নিজেকে শিথিল করে দিয়ে খাটে শুয়ে রয়েছে। কিন্তু শিশুটি কি রুনু?
কোনওদিনই সে রুনুকে জিজ্ঞাসা করে কৌতূহলের নিরসন ঘটাতে পারেনি। ভিতরের ঘরের কোনও কিছুর উল্লেখ করলে তার থেকে একটি কথাই স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসবে, যেটা সে রুনুকে জানাতে চায় না। একবার মনে হয়েছিল রুনুর মাকে বলে, তার এই আসার কথা কাউকে যেন না জানায়। লজ্জায় বলতে পারেনি। রুনুর মা তখন বিছানা ঠিক করায় ব্যস্ত। এই বিছানাতেই রাত্রে রুনুও মার সঙ্গে হয়তো শোয়।
”কী হল, এত দেরি হচ্ছে কেন?”
বন্ধ কলঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে রুনু। উৎকণ্ঠিত, শঙ্কিত স্বর।
গিরি চৌবাচ্চচার পাড়ে বসেই চেঁচিয়ে বলল, ”ঠিক আছি। ভয়ের কিছু নেই।”
গিরি একবার কলঘরের শ্যাওলায় ক্রাচ সমেত পিছলে পড়ে কোমরে চোট পেয়েছিল। রুনু ওকে তুলেছিল। সেই থেকে প্রতিদিন কলঘরের মেঝে, রুনু ঝাঁটা দিয়ে একবার ঘষবেই।
”এতক্ষণ ধরে কী করছ?… মোহনবাবু চলে গেলেন এইমাত্র।”
”কেন?”
”বললেন, ছেলেটা হয়তো হুটোপাটি করছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে ওকে শোয়াতে হবে। কিছুতেই আর বসলেন না।”
স্নান সেরে ঘরে এসে গিরি দেখল মোহন আধ ভরতি অবস্থায় বোতলটা ফেলে রেখে গেছে।
চার
রুনু যখনই বাইরে যায় গিরি তখন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। দ্রুত পায়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ অভিমুখে যেতে যেতে রাস্তা পার হবার আগে অন্তত একবার ও ফিরে তাকাবেই বারান্দায় দাঁড়ানো গিরির দিকে। সেই মুহূর্তে প্রতিবারই বুকটা ধক করে ওঠে। হয়তো বিদায় নিচ্ছে। এই বোধহয় শেষ বারের জন্য তাকে দেখে নিচ্ছে। আর ফিরবে না।
