এক শনিবার গিরি হঠাৎ একটা খালি ট্যাক্সি থামিয়ে বলল, ”চলো লেকে যাই।”
”বাসে করেই তো যাওয়া যায়।”
”তা যায়, কিন্তু আজ যাব না?”
”কেন পয়সা কি কামড়াচ্ছে?”
ট্যাক্সিওয়ালা ভ্রূ কুঁচকে ওদের লক্ষ করছে দেখে গিরি দরজা খুলে ওর কনুই ধরে ফিসফিস করে বলল, ”চটপট মোহন আসছে।”
ব্যস্ত হয়ে ট্যাক্সিতে ঢোকার সময় রুনুর মাথাটা ঠুকে গেছল। রুনুর একমাত্র ভয় ছিল মোহনকে। যদি মাকে বলে দেয়।
এইমাত্র অম্বর ট্যাক্সির দরজা খুলে কী বলল? গিরি অধৈর্য হয়ে কথাটা তৈরি করার চেষ্টা করতে লাগল।
”ওঠো ওঠো, বারান্দা থেকে দেখতে পাবে না।”
কিংবা, ”বারান্দায় কেউ নেই চটপট উঠে পড়ো।”
কিংবা ”দেখছে তো দেখুক, ওঠো।”
অম্বর রুক্ষ অমার্জিত। হয়তো ‘ল্যাংড়া’ শব্দটাও ব্যবহার করে থাকতে পারে। পাশের ফ্ল্যাটের তাসের আড্ডায় তর্কাতর্কি চলছে। রাস্তায় বাচ্চচারা চিৎকার করে খেলা করছে। সামনের বাড়ির যোগব্যায়ামবীরের স্থূলাঙ্গী স্ত্রী গিরির নীচের ফ্ল্যাটের গিন্নির সঙ্গে চেঁচিয়ে গল্প করে যাচ্ছে।
শব্দ আর শব্দ। মাথার মধ্যে শব্দের আঘাতে দুমড়ে যাচ্ছে অতীত। অবাস্তব চেহারা নিচ্ছে। গিরি ভেবে উঠতে পারছে না, কী করে সে তার দুটি পা নিয়ে অসম্ভব-প্রায় সেই অদ্ভুত জীবনটার মধ্যে বাস করে এসেছে। দুঃখ পাচ্ছে না, তিক্ততা বোধ করছে না, শুধু বিস্ময় লাগছে এখন। পনেরোটা বছর এক পায়ে কাটাল। তারা দু’জন তবু একসঙ্গে, এক ঘরে রয়ে গেছে। এই পনেরোটা বছর সে অপেক্ষা করেছে প্রতিদিন একটি কোনও অমোঘের জন্য।
এবং সেই অবশ্যম্ভাবী এইবার আসছে। অত্যন্ত ধৈর্যবান সে। সারাজীবনই ধৈর্য ধরে রয়েছে। সে জানে কীভাবে অপেক্ষা করতে হয়, প্রতিদিনই সে করে। রুনু কি সত্যিই সুখী এই পনেরো বছর? চিন্তাটা তাকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চিবিয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার মিনিট পঙ্গুর সঙ্গে কাটিয়ে কেউ কি হাঁফিয়ে পড়বে না? নিশ্চয় পড়বে।
মোহন কি পড়েছে?
গিরির চিন্তা মোহনকে কেন্দ্র করে পাক দিয়ে উঠতেই তার মনে পড়ল কয়লা ভাঙা লোহাটা কোথায়?
রান্নাঘরে এল গিরি। ডেকচির ঢাকা খুলে দেখল বিরিয়ানির প্রায় অর্ধেক রয়েছে। নোংরা, অগোছালো করে রান্নাঘর রুনু কখনও রাখে না। সে সপ্রশংস চোখে সার দিয়ে রাখা কৌটো এবং শিশিগুলোকে দেখল। বাসনগুলো ঝকঝকে। খেয়ে উঠে দুপুরেই মেজে রেখেছে রুনু।
লোহাটা রান্নাঘরে নেই। দালানের কোথাও নেই। কলঘরের গলিটা পরিষ্কার। জুতোর র্যাকে থাকা সম্ভব নয়। কলঘরের মধ্যেও উঁকি দিল সে। প্লাস্টিকের বালতিটা বোধহয় ফাটা। সাবান জল চুঁইয়ে মেঝে দিয়ে নর্দমায় গেছে।
গিরি বিব্রত হয়ে পড়ল। যখন তার দুটি পা ছিল, তখনকার একমাত্র অবশিষ্ট জিনিস এই লোহাটি। ওটার জন্য তার অস্বস্তি এবং দুর্বলতা, উভয়ই আছে। রুনুকে সে বলেছিল,পুরনো লোহার দোকান থেকে দু’টাকায় কিনে এনেছে। মিথ্যা কথা সে অনেক বলেছে, কিন্তু চুরি এই প্রথম।
মোহনই তাকে চুরি করতে বলে। কীভাবে গেটের দারোয়ানের সামনে দিয়ে বেরোতে হবে দেখিয়েও দেয়। মোহনই জানে একটা দুপুরে সে রুনুদের বাড়িতে গেছল। এই দুটি কথা রুনুকে কখনও গিরি জানায়নি। রুনুকেও সে জিজ্ঞাসা করতে পারেনি মোহনের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল কি না; রুনুর মা নিখোঁজ হবার পর মাস দুয়েক রুনু আর তার বাবার সংসারটি কীভাবে চলেছিল গিরি আজও তা জানে না। এটি ওর জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি সময় যেখানে ও কখনও ঢোকে না। সযত্নে পাহারা দিয়ে গেছে, যাচ্ছে কৌতূহলীদের কাছ থেকে। রুনু তাকে এ সম্পর্কে একটি কথাও বলেনি, এমনকী মার নিখোঁজ হওয়ার কথাও চেপে গেছল। সেই দুপুরের পর থেকে গিরি আর ওদের বাড়ি যায়নি। যাতায়াত থাকলে নিশ্চয়ই জানতে পারত।
জানত মোহন। সে-ও চেপে গেছল। কেন? শুধু চাপাচাপি আর গোপনীয়তা রক্ষা। আজও তার জের টেনে চলতে হচ্ছে। রুনুর মার রোজগারেই তাদের চলত। তার অবর্তমানে দুটি মাস কীভাবে চলেছিল, কে চালিয়েছিল? মোহন!
বারান্দায় চেয়ারে বসে গিরি রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে ব্যথা অনুভব করল। দিনের আলো পড়ে আসছে। দুর্বিষহ চিন্তাগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া ছাড়া আর কোনও কাজ তার নেই।
অম্বরের পাখা ভাড়ার ব্যাপারটা আছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতেই পাশাপাশি দুটো দোকান। বৃহস্পতি না রবিবারে বন্ধ থাকে? সিলিংয়ে হুকের দুটো ঘরেই লোহার ‘এস’ ঝুলছে। এই ফ্ল্যাটে আগে যারা থাকত তাদের পাখা ছিল।
গিরি দরজায় তালা লাগিয়ে অভ্যাসমতো টানল। সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে প্রতিবারই নামে। প্রথম কয়েকদিন রুনু পাশে পাশে নামত। বাহুটা শক্ত করে ধরে থাকত। টাল হারিয়ে তার একশো চৌদ্দ পাউন্ড ওজনের শরীরটা উলটে পড়লে যেন ও সোজা করে রাখতে পারবে!
হাসি পেল গিরির এবং একতলার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিটা মুখে রেখেই সামনে তাকাল।
রুনু আসছে। গিরিকে দেখতে পেয়েই দূর থেকেই লাজুক হাসল। মুখ নামিয়ে চলার বেগ দ্রুত করল।
”ভীষণ মাথা ধরেছে, তাই ফিরে এলাম।”
গিরি পিট পিট করে তাকিয়ে হাসছে।
বিব্রত হয়ে রুনু বলল, ”হাসছ যে?”
”চলো একটু হাঁটি।”
ওরা একবারও থিয়েটারের কথা তুলল না। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর মোড়ে পৌঁছে বাঁ দিকে ঘুরল।
