”তুই কি একদমই খাবি না?”
”না।”
মোহন গ্লাসটা মুখের কাছে ধরে যেন চিন্তায় ডুবে গেল। বোধহয় চাইছে, কৌতূহলে ছটফট করিয়ে অবশেষে ঘোষণা করবে ওর বুলির বক্তব্যটি। গিরি বাঁ পা ছড়িয়ে মালাইচাকিটা নাড়াতে লাগল হাত দিয়ে।
”রমু পনেরো দিন বিছানায় কী করে থাকবে। ভাবতে পারিস? দুরন্ত ছটফটে ছেলে নয়তো সিরিয়াস দিকে টার্ন নিতে পারে অসুখটা। এ-সব রোগে মারাও যায়।”
”তোর খরচ অনেক বাড়ল।”
”ডাক্তার যা বলল, তাতে মনে হল খুব একটা খরচের ব্যাপার নয়।”
”চিকিৎসার খরচের কথা বলছি না। তোর নিজের সংসার, বুলিকে নিয়ে আর একটা সংসার। রোজগার কত তোর?”
”এ-কথাটা ও তুলেছিল। কারখানা আর গ্যারেজ থেকে যা পাই তাতে আরও দুটো সংসার মোটামুটি চালিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমার পয়েন্টটা হচ্ছে টাকা খেটেখুটে আয় করা কী জন্য, সুখের জন্য নিশ্চয়?”
মোহনের গলা ক্রমশ চড়ে উঠছে। গিরির মনে হল, উত্তেজনাটা শুধু মদের কারণেই নয়। বহু বছর ধরে যে-সব জট ওকে ঘিরে রয়েছে তাই থেকে বেরোবার জন্য নিজেকে শানাচ্ছে আর ভাবছে এবার লণ্ডভণ্ড করে মুক্ত হবে। কিন্তু হওয়া যায় কি!
”টাকা আমি উড়িয়ে যাব, কিছু রাখব না। ওদের জন্য একটা বাড়ি করে দিয়ে যাব আর ব্যবসাটা, ব্যস।”
”বুলির কী হবে? তুই তো বুলির অনেক আগে মরবি, ও তখন করবে কী?”
মোহন বোধহয় এতটা দূর পর্যন্ত ভেবে দেখেনি। থতিয়ে গেল।
”তার এখন অনেক দেরি।”
”কত আর দেরি। বছর পনেরো-কুড়ি তুই বাঁচবি। তখন ওর বয়স কত হবে! দেখতে কেমন?”
মোহনকে আশ্বস্ত দেখাল। গ্লাসে নিশ্চিন্ত মনে চুমুক দিয়ে বলল, ”বুলির একটা চোখ কানা। কেউ ওর দিকে ফিরেও তাকাবে না। ছোটোবেলায় পক্স হয়েছিল। মুখে এখনও দাগ আছে, ও আর মিলোবে না।”
দালানে দু’জনের হালকা হাসি শোনা যাচ্ছে। মোহন দরজার দিকে তাকাল। কিছু দেখতে পাবে না। খাট থেকে রান্নাঘরের দিকটা দেখা যায় না। গিরি কান পেতে শোনার চেষ্টা করল।
”থাক থাক। আর অত সেবা করতে হবে না।.. বারণ করছি না।”
”বড্ড ঘেমে গেছ।”
ঘেমে গেছে রুনু। সেবা করছে অম্বর। কীভাবে? ও কি তোয়ালে দিয়ে মুখ, গলা ঘাড় মুছিয়ে দিচ্ছে! গিরির ইচ্ছে করছে কোনও একটা ছুতোয় উঠে গিয়ে দেখে আসে। অম্বর যতক্ষণ ফ্ল্যাটে থাকে সে নিশ্চিন্ত বোধ করে না। রুনু যতক্ষণ বাইরে থাকে সে নানা নোংরা সন্দেহে ছটফট করে। তখন রুনুর আগের এবং এখনকার কথা, আচরণগুলো অন্য আর এক অর্থ পায়। একমাত্র সে আর রুনু যখন একা থাকে, তখনই এ-সব ভাবনা তার হয় না। কিন্তু কতক্ষণই বা। সব থেকে কষ্ট পায় যখন তার মনে হয় এই সব চিন্তার কোনওটাই অসম্ভব নয়, বেশির ভাগ লোকই রুনু সম্পর্কে এই রকমই ভাবতে পারে হয়তো, ভেবেও থাকে। সে নিজেও তাদের মতো ভাবছে।
”গিরি, এ-সব কথা কিন্তু রুনুকে বলিস না।”
”কেন, বললেই বা।”
”দরকার কী বলার। মেয়েরা এ-সব ব্যাপার খুব অপছন্দ করে। ওরা সব সময় স্ত্রীর পক্ষ নিয়েই বিচার করে তো।”
”রুনু তা করবে না। ও তোকে জানে।”
”জানুক, সে জানা দিয়ে মানুষকে বোঝা যায় না। ও জানে আমি মাতাল লম্পট। ওদের বাড়িতে যেতুম শুধু-ভালো কথা, ওকি তোর সেইটে জানে?”
গিরি সচকিত হল।
”কোনটে?”
”সেই যে একদিন দুপুরে তুই-”
মোহনের ধূর্ত চোখে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারল না গিরি। অবধারিত দৃষ্টি আঁচিলে সরে গেল। ওখানে একটা গভীর গর্ত নিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে শুকিয়ে ডেলা হয়ে রয়েছে যেন। ভাবল বলে- হ্যাঁ, রুনু জানে।
”আমি জানি, তুই ওকে সেটা বলতে পারবি না।”
গিরির মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। মোহনের এই নিশ্চিত স্বরটা তার পছন্দ হচ্ছে না। অন্যে কি পারবে বা পারবে না, সেটা ওর ইচ্ছানুসারেই যেন ঠিক হয়ে যাবে। তার সঙ্গে রুনুর বোঝাপড়া কতদূর পর্যন্ত হতে পারে, এটা যেন ও মেপেই রেখেছে।
কিন্তু মোহনের মাপে ভুল নেই। ও ঠিকই অনুমান করেছে গিরি সে-কথাটা বলতে পারেনি। বাকি জীবনটাকে চেটেপুটে নিয়ে মোটামুটি সেটাকে সম্পূর্ণ করতে ব্যগ্র এই লোকটা তাকে একটা পর্যায়ে ফেলে রেখেছে, অক্ষম কাপুরুষদের পর্যায়ে।
”আমি সে-কথা রুনুকে বলেছি।”
”বলতে পারলি!”
”কেন পারব না। লুকিয়ে কী লাভ।”
”সত্যি! আমি কিন্তু রুনুকে জিজ্ঞাসা করব।”
”করিস।”
করবে না। জিজ্ঞাসা করতে সাহস দরকার। ক্রাচে ভর দিয়ে গিরি উঠে দাঁড়াল।
”আমি চানটা করে আসি, তুই একটু বোস।”
শব্দ না করে গিরি ঘর থেকে বেরোল। ওদের অপ্রস্তুত অবস্থায় সে দেখতে চায়।
রুনু রান্নাঘরে টুলে বসে। চুল পিঠে ছড়ানো। এত গরমেও মুখটি তাজা, শ্রান্তির ছাপ নেই। ঠোঁট চেপে রয়েছে। এইমাত্র যেন একটা হাসি সম্পূর্ণ করল। খাওয়ার টেবিলে কনুইয়ে হেলান দিয়ে অম্বর চেয়ারে। টেবিলে একটা রঙিন হাতপাখা। নিশ্চয়ই ওটা তারই। গায়ে গেঞ্জি।
টেবিলের তলায় ওর নগ্ন বাম হাঁটুর উপর ডান পায়ের গোছ দেখতে পেল গিরি। খেলার খাটো প্যান্টটাই পরে আছে। তাকে দেখেই অম্বর ডান পা নামিয়ে নিল।
গিরি সেটা লক্ষের মধ্যে না এনে, রুনুকে শুধু বলল, ”চান করতে যাচ্ছি।”
ছোট্ট কলঘর। চৌবাচ্চচাটা ফুট তিনেক উঁচু। তার গায়ে দেয়ালে ফুট চারেক উঁচুতে জলের কলটা বেরিয়ে। বাঁশের ডোঙা লাগিয়ে কল থেকে চৌবাচ্চচায় জল আসে। প্লাস্টিকের বালতিতে সাবান-জলে ডোবানো কিছু কাপড়। গিরি আঙুল দিয়ে তুলে দেখল রুনুর ব্লাউজ সায়ার নীচে অম্বরের মোজা রুমাল গেঞ্জি।
