এই লোকটা পঞ্চাশের কাছাকাছি, অর্ধেক টাকপড়া, চুলে কলপ দেওয়া, রোগা লোকটা পালাচ্ছে, জীবনের অর্ধেক অংশ ফেলে রেখে। গিরির হঠাৎ মনে হল, ওকে কি ঈর্ষা করছি?
মোহন গ্লাস খালি করে আবার বোতল থেকে ঢালছে। তখন তাজা, ঝকঝকে রুনু সাবানের গন্ধ নিয়ে ঘরে ঢুকল। ভ্রূ কুঞ্চিত করল। গিরির হাতে গ্লাস নেই দেখে আশ্বস্ত হল। চুল থেকেও মিষ্টি গন্ধ বেরোচ্ছে, শ্যাম্পুর। চিরুনি নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় সে ঠোঙাটা ফাঁক করে দেখল।
”নিয়ে যাও, নিয়ে যাও। আমি খাব না, গিরি তুই?”
মাথা নাড়ল গিরি। শ্যাম্পু নিয়ে যখন কলঘরে যায়, তখন অম্বর বাড়ির বাইরে। ওকে না বলেই শ্যাম্পু ব্যবহার করেছে। হয়তো তোয়ালেও ব্যবহার করে। গত পনেরো বছর রুনুকে চুল নিয়ে শৌখিন হতে দেখা যায়নি।
রুনু ঠোঙাটা তুলে নিল।
”রান্নাঘরে যা গরম। আজ সকাল থেকে গুমোট শুরু হয়েছে।… বিরিয়ানিটা তুমি করবে?”
”না, তুমিই করো। অম্বর তো আছে হেল্প করার জন্য।”
গিরি তাকাল রুনুর মুখের দিকে। ছোটো রান্নাঘর। ঘেঁষাঘেষি করে ওরা বসবে। রুনু নিচু টুলটায়, অম্বর হাতকাটা সাদা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে চৌকাঠের কাছে উবু হয়ে।
”ভালো কথা, ঠাকুরপো তিনটে থিয়েটারের টিকিট এনেছে, আজকেরই। ওদের ক্লাবের একটা ছেলে অভিনয় করে, মুক্তাঙ্গনে আজ তাদের প্লে।”
অম্বর নয় ঠাকুরপো! গিরির কানে ধরা পড়ল। আগে কখনও ঠাকুরপো বলেনি। সন্দেহ এড়াবার জন্যই এটা বলা।
”আমি যাব না। থিয়েটার আমার ভালো লাগে না।”
”বাঃ টিকিট তা হলে নষ্ট হবে?”
”তোমরা দু’জনে যাও।”
”তা কী করে হয়।”
গিরির মনে হল রুনুর মুখে চাপা উত্তেজনা, সারা সন্ধ্যা পাশাপাশি দু’জন কাটাতে, অন্ধকার অডিটোরিয়ামে দু’জনে মুঠো জড়াজড়ি করতে পারবে।
”না হবার কী আছে? একটা টিকিট বিক্রি করে দিলেই হবে।”
”টিকিট নয়, পাস।”
”কাউকে দিয়ে দেবে। নেবার অনেক লোক পাবে।”
গিরি এক দৃষ্টে রুনুর মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে হতাশা ছায়া ফেলেছে। মুখ নামিয়ে রুনু অন্যমনস্কের মতো চিরুনি দিয়ে চুলে আঁচড় টানল। গিরির বুকের মধ্যে একদলা বাতাস চাপ দিয়ে তাকে বিষণ্ণ করছে।
”ক’দিন ধরে ভালো ঘুম হচ্ছে না, শরীরটা কেমন লাগছে। ভাবছি সন্ধেবেলায় ঘুমোব।”
মোহন চুপ করে শুনে যাচ্ছে-আর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে।
”মুক্তাঙ্গনটা সাউথে না? রাসবিহারির মোড়ে তো?”
গিরি মাথা নাড়ল।
কথা না বলে রুনু বেরিয়ে গেল। দুঃখ পেয়েছে। কিন্তু নতুন কোনও জায়গায় রুনুর সঙ্গে যেতে তার অস্বস্তি হয়, বিশেষ করে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকতে হলে। একবার মাত্র সে রুনুর অফিসে গিয়েছিল। সকলের নজর প্রথমেই ক্রাচের উপর, তারপর রুনুর মুখে পড়ে। প্রত্যেকের চোখে সে একটি কথাই ফুটে উঠতে দেখেছিল; এমন সুশ্রী মেয়ের কিনা এমন খোঁড়া স্বামী, বেচারা। হয় তার জন্য, নয়তো রুনুর জন্য লোকে করুণা বোধ করে। বাড়ির এক মাইল বৃত্তের মধ্যে কেউ এখন আর তাদের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় না। সকলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
”বুলি ভীষণ থিয়েটার দেখতে ভালোবাসে। একসঙ্গে বার চারেক আমরা দেখেছি।”
”ওর বয়স কত?”
”বেশি নয়, ডলির থেকে বছর চারেকের বড়ো।”
”তোর তো প্রায় মেয়ের বয়সি।”
মোহন যেন সুখবোধ করল কথাটা শুনে। খালি গ্লাসটা দু’হাতের তেলোয় ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ”বয়সটা কাঁচাই তবে মেনটালি যথেষ্ট ম্যাচিওরড। আমাকে খুব খরচ করতে দেয় না। বাড়ির খোঁজখবর, তোর বউদির কথা, এ-সব জিজ্ঞাসা করে।”
”তুই ওর বাবাকে কত টাকা দিস?”
ওর ত্রস্ত সতর্ক হয়ে ওঠা দেখে গিরি মনে মনে হাসল।
”তার মানে? বুলি সে টাইপের মেয়েই নয়। টাকা কামাবার ধান্দা একদমই নেই। ওর বাবাও খুব সরল, সিম্পল মানুষ।”
”তা হলে তোদের সম্পর্কটা কী দাঁড়াচ্ছে? বুলি চিরকাল এইভাবে বসবাস মেনে নেবে?”
মোহন কুঁজো হয়ে ঝুঁকে গলাটা লম্বা করে বলল, ”তোরাও তো সেইভাবে বসবাস কচ্ছিস আজ প্রায় ষোলো বছর। অবশ্য অ্যাডভানটেজ তোর রয়েছে, পেছনে বউ ছেলেমেয়ে এ-সব নেই।”
গিরি চুপ করে শুধু একদৃষ্টে লাল আঁচিলটার দিকে তাকিয়ে রইল।
”রুনু আর তুই, তাই বলে কি সুখী নোস? খোঁড়া লোককে নিয়ে রুনু পনেরো বছর কাটাল, তুই কি ভাবিস অসুখী হলে ও থাকত? কবে লোক জুটিয়ে নিয়ে ভেগে পড়ত!
হাতটা তুলে প্রচণ্ড একটা চড় কষাল গিরি মনে মনে। পনেরো বছর ধরে অপেক্ষা করে আসছে, পনেরো বছর যথেষ্ট সময়। সব কিছুই ঘটতে পারে এমন অনুমানের, যে-কোনও ধরনের সর্বনাশ সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পক্ষে প্রচুর সময় সে পেয়েছে। আর সেই ভাবনাটাই মোহন…
সে হাসল।
”কী কষ্ট করে রুনু যে তোকে…”
পুষছে। মোহন উচ্চচারণ করতে পারল না শব্দটা কিন্তু ওটা হওয়া উচিত ”সহ্য করছে।”
”…শ্রদ্ধা হয়। মেয়েমানুষ যে কীসে সুখী হয়, বোঝা বড় শক্ত। বুলিকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলুম।”
ডান দিকে ঝুঁকে, টেবিল থেকে বোতলটা তুলে নিল মোহন। ”বড্ড তাড়াতাড়ি খাচ্ছি, মাসখানেক পর তো। বুলির জন্যই কমিয়ে দিয়েছি। ও পছন্দ করে না।”
গিরি ক্রমশ বিরক্ত বোধ করছে। একটি কুদর্শন অতীত আড়মোড়া ভেঙে পিট পিট করছে তার মাথার মধ্যে। রান্নাঘর, খাওয়ার টেবিল থেকে কথাবার্তার টুকরো ভেসে আসছে। নিচু স্বরে ট্রানজিস্টারে হিন্দি গান হচ্ছে। মাঝে মাঝে পাশের ঘরে পায়ের শব্দ।
