”রুনু, দু’কাপ চা করে দিতে পারবে?”
অনুরোধের স্বর, কিন্তু বিনা বাক্যব্যয়ে দ্রুত রুনুর উঠে যাওয়া থেকে বোঝা যায় ওটা আদেশ।
মোহন এবং মিসেস মজুমদারের হালকা এবং অবান্তর কথাবার্তার মধ্যে গিরি চুপ করে থাকে। ঘরটায় ভ্যাপসা গন্ধ। প্রতিটি আসবাব জীর্ণ এবং মলিন। হাস্যকর লাগছিল দেয়ালে ঝোলানো পশমে বোনা একটি কাকাতুয়াকে। কাচটায় এত ধুলো যে কাকাতুয়াটাকে চিল মনে হচ্ছে। একটি বছর পাঁচ-ছ’য়ের ফ্রক পরা মেয়ে, চশমা পরা একটি লোকের কোলে সম্ভবত ছবি তোলবার লজ্জাতেই বা কোলে ওঠার জন্যই বুকে মুখ লুকোতে চাইছে। গিরির মনে হয়েছিল এটি ওই রুনু নামের মেয়েটি এবং লোকটি ওর বাবা।
রুনু চা আনল। নিস্পৃহ মুখে সে হাতে তুলে দিল। এবং চা খাওয়ার পর মিসেস মজুমদার হাতঘড়ি দেখে বললেন, ”আমার একটা কল আছে, ন’টায় বেরোতে হবে কিন্তু।”
”ওহ, তাই নাকি। একটা কথা বলার ছিল।” মোহন ইতস্তত করল।
”প্রাইভেট কথা?”
”একটু প্রাইভেট।”
”তা হলে ও ঘরে চলুন।”
একা বসে থাকতে থাকতে গিরির চোখ বারবার সেই নিথর পিঠটির ওপর গিয়ে পড়ছিল। মেরুদণ্ডে সূক্ষ্মভাবে বিদ্রোহের রেশ। দুটি কাঁধ করুণা প্রত্যাশায় ঝুঁকে রয়েছে ভ্যাপসা জীর্ণ নীরব ঘরটার মধ্যে। মেয়েটির পিঠ তাকে অসাড় করে রেখেছিল।
প্রায় আধঘণ্টা পর মোহন ফিরে এল একাই। রাস্তায় বেরোবার সময় গিরি মুখ ফিরিয়ে দেখেছিল পিঠটা একই রকম রয়েছে। রকের লোকটাও একই ভঙ্গিতে বসে। ফেরার পথে গিরি জিজ্ঞাসা করেছিল, ”রুনুও কি-”
”হতে পারে।”
তিন
”কী হতে পারে?”
গিরি চমকে পাশে তাকাল।
”বিড়বিড় করে কী বকছ?”
মুখ তুলে গিরি বিভ্রান্তের মতো রুনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ”রাতে ঘুম হয়নি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিশ্রি একটা স্বপ্ন… যাক গে। ক’টা বাজল অম্বর এসেছে?”
”না, তুমি কি পেঁয়াজ আদা ছাড়িয়ে দেবে? আমি চানটা করে নিতে পারি তা হলে।”
”এখানেই ছুরিটা আর ওগুলো দিয়ে যাও।”
তারপর মোহনকে আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি। সংকোচে নয়। যদি বলে হ্যাঁ মায়ের মতো রুনুও-। অনেক সময়ে সে বড়াই করে, বিশেষত মেয়েদের সম্পর্কে, মিথ্যাও বলে। গিরি ভয়ে জিজ্ঞাসা করেনি, পাছে বিষিয়ে ওঠে তার মন। ওই রকম একতলা বাড়িতে, প্রাচীন আসবাবের মধ্যে, নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে পিঠ ফিরিয়ে বসে থাকা একটি রোগা মেয়ে তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল।
অভ্যস্ত দক্ষহাতে আদার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে গিরি রেলিংয়ের মধ্য দিয়ে সামনের বাড়ির দোতলার ঘরে তাকাল। ঠিক এই সময়ই ফ্রক-পরা মেয়েটি রাইফেল বগলে ধরে সামনে তাক করে। মিনিট পনেরো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ড্রাই প্র্যাকটিস করে যায়। অসাধারণ ধৈর্য। বহুদিন গিরি ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, চেয়ারে বসেই একটা ক্রাচ তুলে রাইফেলের মতো ধরে থেকেছে। কিছু পরেই হাত ভার হয়ে আসে কেঁপে ওঠে। আড়চোখে দেখত মেয়েটি তখনও ধরে আছে কি না। তারপর লজ্জা পেত। ক্রাচের তলাটা ভারী লোহায় মোড়া। চলার সময় শব্দ হত। নীচের ফ্ল্যাটের জাঁদরেল গিন্নি একদিন রুনুকে ডেকে রবার লাগিয়ে নিতে পরামর্শ দেয়। রুনুই অফিসের স্টিলের চেয়ারের পায়া থেকে দুটো রবার খুলে নিয়ে আসে।
”এ-ভাবে নিয়ে আসাটা কিন্তু চুরিই।”
”ভারী তো চার আনা দামের জিনিস।”
খুব হালকা চালে বললেও রুনুর মুখ অপ্রতিভ হয়ে গেছল। গিরি বেদনা বোধ করেছিল উদ্দীপ্ত মুখটি হঠাৎ নিভিয়ে দেওয়ার জন্য। রবারের টুপি দুটো ক্রাচে লাগিয়ে ঘরে বার কয়েক চলাফেরা করল। রুনু কান পেতে শুনছে শব্দ হচ্ছে নাকি। একপায়ের উপর শরীরের ভর রেখে হালকাভাবে ক্রাচ ফেলে গিরি ঘোরাফেরা করতে করতে দেখল রুনুর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠেছে।
”বড্ড ঝগড়ুটে। নিজেদের সুবিধেটুকু ছাড়া আর কিছু বোঝে না। খটখট শব্দে নাকি বালি খসে পড়ে।”
”বাড়িটা অবশ্য পুরনো।”
”যত পুরনোই হোক, তাই বলে বালি খসে পড়ার মতো অবস্থা হয়নি। ওপরের ছেলেগুলো কম শব্দ করে? কই, আমরা তো বলতে যাই না।”
”চলো একবার বেরিয়ে ট্রায়াল দিয়ে আসি।”
”খেয়েদেয়ে বেরোব।”
”না, না, আজ বাইরেই খাব। অনেকদিন কচুরি খাইনি, খাওয়াবে?”
রুনু অত্যন্ত খুশি হল। গিরি তার কোনও ইচ্ছা বা সুখের কথা সহজে বলে না। তা হলে রুনুকে আর্থিক চাপের মধ্যে পড়তে হবে তো বটেই, তা ছাড়া ওর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার কথা ভাবলেই রুনুর বাবাকে তার মনে পড়ে।
বহুদিন আগে, তখনও ওরা একসঙ্গে বসবাস শুরু করেনি, তখন একদিন কথাপ্রসঙ্গে গিরি বলেছিল, ”তোমাদের বাড়িতে যতবার গেছি, রকে একটা লোককে বসে থাকতে দেখেছি। বরাবর একই ভঙ্গিতে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে, উপরের দিকে তাকিয়ে।”
রুনু ইতস্তত করে বলে, ”আমার বাবা। ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। তারপর একটা ব্যাপারে কিছুদিন জেলে ছিলেন।”
গিরি এরপর বহুদিন ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছে, কৌতূহলবশে রুনুকে তার বাবার কথা যদি কোনওভাবে জিজ্ঞাসা করে ফেলে। রুনুও সাবধানে এড়িয়ে চলে সেই সব বিষয়, যা তার বাবাকে টেনে আনতে পারে।
রুনু কখনও তার সামনে শাড়ি বদলায় না। কিন্তু সেদিন সায়া পরেই সে আলমারি থেকে ঘন বেগুনি রঙের সিল্কের শাড়িটা বার করল। ওই কাপড়ের ব্লাউজটাও বার করে, কী ভেবে আবার রেখে দিল।
