”জানি, অনেক পরে আমায় বলেছিল।”
”আমার খুব ভালো লেগেছিল। দুটো কমলালেবুও হাতে করে এনেছিল।”
রুনু ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে গিরি বলল, ”বউদির হাসপাতালে গিয়ে আমাকে দেখার কথাটা বলছিলুম। তুমিও তো তখন ছিলে।”
”সেই আমি প্রথম দেখলাম। তোমার কপালে বুকে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।”
মোহন যেন অস্থির হচ্ছে। সিগারেটের মতো চা-টাও দ্রুত শেষ করে, কাপটা এগিয়ে দিল রুনুর দিকে। ”কী রাঁধবে, রোস্ট?’
”ওরে বাবা, ঘি পাব কোথায়?”
”ঠিক আছে, রোস্টই হোক। ঘি-ফি সব এসে যাবে। ফ্রায়েড রাইসও তা হলে। কী কী আনতে হবে লিস্টি করে দাও।”
রুনু বিব্রত চোখে গিরির দিকে তাকাল। গিরি মাথা হেলাল।
”তা হলে তো চালও আনতে হবে।”
”নিশ্চয়ই। চটপট লিখে দাও। আজ এখানেই চারটি খেয়ে যাব।”
রুনু বেরিয়ে যেতে মোহন আবার তামাক বার করল। মাথা নিচু করে মন দিয়ে চটকাচ্ছে। গিরি অপেক্ষা করতে লাগল।
”একটা মেয়ের সঙ্গে আমার ভাব হয়েছে।”
মৃদু ফিসফিস স্বরে মোহন বলল, ‘ভাব’ শব্দটা ওর মুখে বেমানান। ‘পটিয়েছি’ বললে গিরি এতটা অস্বস্তি বোধ করত না। মেয়েটি কে, কীভাবে, কবে, কত বয়স, কী করে নানাবিধ কৌতূহলের মধ্যে গিরি বাছাবাছি করে চলল।
”ঠিক করেছি আমরা দু’জন একসঙ্গে থাকব। একসঙ্গে মানে, ওকে একটা এই রকম ফ্ল্যাটে রাখব, আমি মাঝে মাঝে এসে থাকব। ফ্ল্যাটের অ্যাডভান্স করেই তোর কাছে আসছি।”
”ডাক্তারের কাছ থেকে নয়?”
”প্রথমে ডাক্তারের কাছে তারপর বাড়িওলা হয়ে আসছি। ফ্ল্যাটটা এই পাড়াতেই, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ঠিক ওপারে বনমালী সরকার লেনের একটু ভিতরে। তোর বারান্দা থেকে দেখা যাবে না।”
গিরি হঠাৎ কৌতূহল ও উত্তেজনার প্রকোপ অনুভব করতে শুরু করল। মোহনকে এত আন্তরিক কখনও সে দেখেনি।
”কী করে ভাব হল?”
”আমার ফিটারের মেয়ে। প্রাইভেটে গত বছর স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে। আমিই খরচ করেছি। বয়স হয়েছে কিন্তু বোঝা যায় না, ম্যালনিউট্রিশন। সতেরো বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। বিদ্যাসাগর মর্নিং-এ প্রি-ইউতে ভরতি করালাম, পড়ুক।”
মর্নিং-এ কেন, ডে-তে দিতে পারত। নাকি ছোকরাদের সঙ্গে পড়াবার ভরসা পাচ্ছে না। মোহনের বয়স এখন কত হবে, আটচল্লিশ-সাতচল্লিশ। দেখায় প্রায় ষাটের মতো। বছর দুয়েকের মধ্যে শরীরটা হঠাৎ ভেঙে পড়েছে। গিরি ওর থেকে বছর তিনেকের ছোটো।
”লোকটার চার মেয়ে। শুধু বড়টারই বিয়ে দিতে পেরেছে। আর তিনটের পারবে না। হাঁপানিতে শেষ হয়ে এসেছে। মিস্ত্রি হিসেবে খুবই ভালো। ওকে বলেছি বুলিকে হস্টেলে রেখে পড়াব।”
ফর্দ হাতে রুনু ঘরে ঢুকতেই মোহন উঠে দাঁড়াল।
”পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
মোহন চাহনিতে সাবধান করে দিল গিরিকে। আধ ইঞ্চি মাথা হেলাল গিরি। মিনিট দুয়েক পরে রাস্তায় স্কুটার স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শুনে সে উঠে বারান্দায় এল। মোহনকে বাঁ দিকে বেঁকে যেতে দেখল। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর ওপারে বনমালী সরকার লেনের বাড়িগুলোর দিকে সে তাকাল। রাস্তাটা তিরিশ গজ পরেই বাঁক নিয়েছে। তারপর কোনও একটা বাড়িতে সেই ফ্ল্যাটটা!
গিরি সন্তর্পণে চেয়ারে বসল। একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে সে আপন মনে বলল, ”মোহনের এতটা বাড়াবাড়ি করার কী দরকার।”
মোহন একদিন ছুটির পর হাতে তরল সাবান মাখতে মাখতে বলেছিল, ”বাড়ি ফিরে কী করবি?”
”কী আবার করব। গল্পের সেই বই পড়ব নয়তো সিনেমায় যাব।”
”তা হলে চল, এক জায়গায় নিয়ে যাব তোকে আজ।”
”আগে বল কোথায়।”
”চলই না। ভালো লাগবে তোর।”
কলে হাত ধুয়ে, হাতটা ঝাড়তে ঝাড়তে মোহন বলেছিল, ”আমার গার্লফ্রেন্ডের কাছে। প্রাইভেট নার্স।”
মোহনের হাসিটা বিরাট নিঃশব্দ এবং অর্থবহ ছিল।
”মাঝে মাঝে যাই।”
একতলা টালির চালের বাড়ি। বাইরের দরজায় সাদা অক্ষরে লেখা, ”মিসেস এস মজুমদার। প্রাইভেট নার্স।” দরজার পাশে সরু রক। জায়গাটা আধো অন্ধকার। গেঞ্জি গায়ে একটা লোক দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। মোহন আঙুলের গাঁটে ঠুকে টোকা দেবার মিনিট খানেক পর দরজা খুলে দাঁড়াল একটি স্ত্রীলোক। ঘরের আলো ওর পিছনে, মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। পরনে কালো পাড় সাদা বুটিদার তাঁতের শাড়ি।
”আরে, মোহনবাবু, কী ভাগ্যি, আসুন ভেতরে।”
পাশ ফিরে সরে দাঁড়াতে গিরি ওকে সম্পূর্ণ দেখতে পেল। চল্লিশ ছুঁয়েছে বা সদ্য অতিক্রম করেছে। শ্যামলা রং, টিকোলো নাক, চোখে হালকা সুরমা, পাউডারের গুঁড়ো থুতনির কাছে। স্থূল কোমর এবং তলপেট চর্বিতে ঝুলে পড়েছে, বুকের উপর মাংসের স্তূপকে জমাট করে রেখেছে ব্রেসিয়ার। কঠিন চাপের ফলে ব্লাউজের গলা উপচে ফুলে রয়েছে মাংস। গিরি অনাস্বাদিত উত্তেজনা বোধ করে ওকে দেখে।
”আমার এক বন্ধুকে নিয়ে এলাম, আলাপ করিয়ে দিতে। মাঝে মাঝে ও আসবে।”
মিসেস মজুমদারের চাহনি গাঢ় হল, মাথা হেলিয়ে বললেন, ”নিশ্চয়, এলে খুশি হব।”
”একা একদমই একা ছেলেটা। অত্যন্ত কুনো, জোর করেই ধরে আনলাম।”
”ভালোই করেছেন। চা খাবেন?”
মিসেস মজুমদার ঘাড় ফিরিয়ে ঘরের কোণের দিকে তাকালেন। একটা নীল পর্দা ঝুলিয়ে ঘরটার কিছুটা আলাদা করা। একটা টেবিল, তাতে সারি দিয়ে সাজানো বই। দেয়ালের দিকে মুখ করে একটি রোগা মেয়ে খোলা বইয়ের উপর ঝুঁকে। ওর পিঠ এবং ডান বাহুর অংশ মাত্র দেখতে পেল গিরি।
