”আমি তো কুষ্ঠি-ঠিকুজি গ্রহ নক্ষত্র বিশ্বাস করি না তা হলে আমার কেন এ-রকম হল?”
গিরি মিটিমিটি করে হাসতে লাগল। ইউনিভার্সালের অনেকের মতো তারও ধারণা মোহনের গাফিলতিতেই দুর্ঘটনা হয়েছে। হয়তো মোহনও মনে মনে সেটা স্বীকার করে।
ইউনিভার্সালের সেই দেড় টনের হাইড্রালিক লিফটটার বসানোতেই গোলমাল থাকায় ব্যালান্সের হেরফের ছিল। একদিকে সামান্য হেলে থাকত। তাতে গ্যাসকেটে জখম হয়ে নিয়মিত তেল বেরিয়ে যেত। হেলে থাকার জন্য লিফটের মোটা লোহার থামটা, হাওয়া বার করে দেবার পরও নামত না, সিলিন্ডারের গায়ে আটতে থাকত। ধাক্কা দিলে ঝপ করে নেমে আসত গাড়ি সমেত। ঘষাঘষিতে মসৃণ ঝকঝকে থামটার গায়ে আঁচড় পড়ে গেছিল। এ ছাড়া হাওয়া বার করে দেবার ভালভেও লিক দেখা দিয়েছিল। ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো ভালভ সিট ও ভালভ ককের ফাঁক দিয়ে প্রচণ্ড চাপের হাওয়া নিঃসাড়ে বেরিয়ে যায়, একথাটাও মোহনকে জানিয়েছিল একজন মেট। সে বলেছিল, ”আচ্ছা দেখছি।”
যদি দেখত! গিরি ডান পায়ের কাটা ঊরুর দিকে চোখ নামাল। মোহন চোখ সরিয়ে নিল কেন?
ইউনিভার্সালে যারা মাল সরবরাহ করে তাদের সঙ্গে ওর কমিশনের বন্দোবস্ত আছে, এ-রকম একটা কথা সে ফিটার-মেকানিকদের মহলে শুনেছিল। প্রকাশ মেহরাও নাকি তার ভাগ পায়। মোহন কী বলবে- ”নীচস্থ বুধ তৃতীয়ে ছিল” বা ”রাহু সাড়ে বাইশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে থেকে সোজা তাকিয়ে আছে!”
কৌটো থেকে তামাক বার করে ও তালুতে চটকাচ্ছে। ভিতরে ভিতরে অধৈর্য, বিরক্ত এটা বোঝা যায়। গিরির মনে হল ওগুলো বার করে দেবার জন্যই সে এসেছে।
”ছেলেটার কার্ডিয়াক রিউম্যাটিসম। ডাক্তারের কাছ থেকেই এখানে আসছি। কার্ডিয়োগ্রাম করে ধরা পড়েছে। মেয়েটার অ্যামিবিক কোলাইটিসে চিকিৎসা চলছিল, তারপর বলল অ্যাপেন্ডিসাইটিস, ইউরিন টেস্ট করে এখন বিকোলাইয়ের জার্ম পাওয়া গেছে। রমুকে পনেরো দিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে, ভাত খাওয়া বন্ধ, চান করা বন্ধ, মাটিতে শোয়া কোনওদিনই চলবে না, বৃষ্টিতে ভিজতে পারবে না।”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে মোহন এত নির্লিপ্তভাবে সিগারেট পাকাচ্ছে, তার মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ, অবশ্যই নিজের ভাগ্যের প্রতি, ধিকিধিকি জ্বলছে। গিরি দুঃখ বোধ করল রমুর জন্য। ছটফটে তেরো বছরের ছেলেটা পনেরো দিন বিছানায় থাকবে কী করে! সে নিজে সাড়ে চার মাস বিছানায় ছিল। গোছ থেকে গ্যাংগ্রিন ধরা পা কাটাতে ঊরু পর্যন্ত বাদ দিতে হয়েছে। তখন বয়স ছিল তিরিশ আর রমুর তেরো। অঙ্গ না হারিয়ে চৌকো একটা প্রায় ৩০ বর্গফুট এলাকায় বন্দি থাকার অসহনীয়তা কিছুটা সে আন্দাজ করতে পারে।
”ভাবলে কষ্ট হয়।”
”রমুর জন্য?”
মোহন ফিকে হাসল। সে যেন প্রত্যাশাই করছিল রমুর দুঃখেই গিরি এ-কথা বলবে। একটা অস্পষ্ট অভিমান ওর ঠোঁটে চিবুকে নড়াচড়া করে পালাবার মুহূর্তে গিরির নজরে ধরা পড়ে গেল।
”তোর জন্যই।”
”কেন?”
”বউদির সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে?”
”অসম্ভব।”
গিরি মোহনের বউকে শেষবার দেখেছে হাসপাতালে। রক্তাল্পতায় ভোগা, হাড় আর চামড়া সর্বস্ব, খিটখিটে, অশিক্ষিত স্ত্রীলোক। গিরি প্রথম যখন মোহনের বাড়িতে যায়, তখন রমু জন্মায়নি, বড়মেয়ে ডলি তিন-চার মাসের। আলমারির মাথার উপর থেকে দিশি মদের বোতলটা নামিয়ে মোহন অপ্রতিভ চোখে তাকিয়েই সেটা দেয়ালে ছুড়ে মারল। কাচ ছড়িয়ে পড়ল। ওতে এক ফোঁটা মদও নেই। তিন-চার পা এগিয়েই বউয়ের গালে প্রচণ্ড চড় কষাল।
বাধা দেবার সময় পাওয়া গেল না। গালে হাত দিয়ে, চোখ দুটোকে ঠেলে বার করে এনে মোহনের বউ চিৎকার করেছিল, ”মারলে, মারলে, বাইরের লোকের সামনে বউয়ের গায়ে হাত তুললে?… বে-এ-এশ করব, আবার আনো নর্দমায় ফেলে দোব।”
কাছের এক বস্তিতে খাটিয়ার উপর বসে চোলাই খেতে খেতে মোহন বলেছিল, ”জীবনটা নষ্ট করে দিল এই মাগি, তুই আর যাই করিস, বিয়েতে যাসনি। পুরুষমানুষের মন মেজাজ বোঝার ক্ষমতা খুব কম মেয়েরই আছে। ওদের ধারণা পুরুষরা বুঝি শুধু শরীরের ওই একটা জায়গাই চায়।”
মোহন এ-রকম ভাবে সেদিনও খেদভরে মাথাটা নাড়ছিল।
”অসম্ভব কেন? বছর কুড়ি তো কাটিয়েছিস। বাকিটাও কেটে যাবে।”
মোহন দ্রুত টান দিচ্ছে সিগারেটে।
”বাকিটাকে আমি আর নষ্ট করব না। আমি ঠিক করে ফেলেছি নষ্ট করার কোনও মানে হয় না, যুক্তি নেই। এবার আমি নিজের কিছু করছি।… আচ্ছা, এক কাপ চা করতে রুনু এত সময় নিচ্ছে কেন! জনতা জ্বেলে করলেই তো হয়।”
মোহন খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরে যাচ্ছে, রুনু দু’কাপ চা হাতে ঢুকল।
”আজ মুরগি রাঁধছে রুনু, খেয়ে যা।”
”বটে, কোথা থেকে কিনলি?”
”আমি নয়, অম্বর কিনে আনবে মাঠ থেকে ফেরার পথে।”
প্রথম চুমুক দেওয়ার পর কাপ নামিয়ে মোহন বলল, ”বড্ড চিনি দিয়েছ, একটু লিকার এনে দাও।”
মোহন এবার তাকাল না রুনুর পিছনে। গিরি ভেবে রেখেছিল মোহন তাকাবে এবং ভ্রূকুটি করে সে বিরক্তি প্রকাশ করবে।
”অম্বর খেলে কেমন? অনেকদিন আর মাঠের খোঁজ খবর রাখি না।”
”আমি দেখিনি কখনও, শুনেছি নাম হয়েছে।”
মোহন যেন কিছু একটা বলতে চায়, ছেলেমেয়ের অসুখের কথাই শুধু জানাতে এসেছে মনে হয় না। গিরি আন্দাজ করার চেষ্টায় বলল, ”হাসপাতালে আমাকে দেখতে বউদি একদিন একা এসেছিল, তুই তো তা জানিস?”
