”বউদি কেমন আছে?”
”ভালো। ভালোই আছে।”
রুনু জলের গ্লাস নিয়ে দাঁড়াতেই মোহন উঠে বসল। জল খাওয়ার সময় ওর চোখ রুনুর মুখে নিবদ্ধ। রুনু মুখ ফিরিয়ে একবার গিরির দিকে তাকাল। রুনু গ্লাস নিয়ে চলে যাচ্ছে, মোহন কোনওরকম সংকোচের বালাই না রেখে ওর নিতম্বের দিকে যে-ভাবে তাকিয়ে থাকল তাতে গিরি অস্বস্তি বোধ করল।
মোহনকে সে চেনে, অসৎ এবং ইতর চরিত্রের। মোহন মারফতই রুনুর বা রুনুদের বাড়ির সঙ্গে সে পরিচিত হয়। তখন রুনু উনিশ-কুড়ি বছরের রোগা একটি মেয়ে, সবেমাত্র আই এ ক্লাসে ভরতি হয়েছে।
”তোর বউ তো দিনদিন বেশ সুন্দরী হয়ে উঠছে। আগেরবার এসে যা দেখেছিলুম, তার থেকেও বেশ-”
মোহন দু’হাতে গোলাকার একটা কিছু সন্তর্পণে শূন্যে তৈরি করে সেটিকে আলতো ধরে রইল।
গিরি অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। রুনুর যত বয়স বাড়ছে, ততই যেন লাবণ্য বাড়ছে। ভরাট হয়েছে, নিটোলত্ব পেয়েছে, ভাঁজ পড়েছে দেহের বহু জায়গায়। রাস্তায় পুরুষরা ফিরে ফিরে তাকায়। যখন তারা দু’জন একসঙ্গে বেরোয়, লক্ষ করেছে, পা-কাটা খোঁড়া লোকটার পাশের মেয়েটির দুর্ভাগ্যের জন্য পথচারীদের চোখে সমবেদনা ফুটে উঠত।
কিন্তু মোহন যে রুনুর জন্য সমবেদনায় কাতর হবে না, এটা গিরি জানে। বরং তার মনে হয় গিরিকে সে ঈর্ষা করে রুনুর জন্যই। হাসপাতালে থাকার সময়ই নিঃসঙ্গ দিনগুলো কাটাতে কাটাতে প্রায়ই তার মনে হত এবার রুনু বোধহয় তাকে ছেড়ে চলে যাবে। তারা বিবাহিত নয়। কিন্তু তারপরও পনেরো বছর তারা একসঙ্গে রয়েছে। রুনুকে কষ্ট কম করতে হচ্ছে না। কিন্তু কখনও সে অভিযোগ অবহেলা বা বিরক্তি জানায়নি। এ-জন্য গিরির কৃতজ্ঞতার অবধি নেই।
একবার মাত্র গিরি বিয়ের কথা তুলেছিল। হাঁটছিল ওরা সন্ধ্যায় গঙ্গার ধারে। কাশী মিত্র শ্মশানটা দেখিয়ে গিরি বলে, ”এখানে বাবাকে পোড়ানো হয়েছিল। আমি তখন বারো বছরের। রেঙ্গুন দখল করে জাপান তখন এগিয়ে আসছে ভারতের দিকে। কলকাতার লোক ভয়ে পালাচ্ছে। ব্ল্যাক আউটের মধ্য দিয়ে আমি আর-”
তারপরই মনে পড়ে এ-সব কথা রুনুকে সে আগেও বলেছে। কিন্তু রুনু অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে যখন শোনা-কথাই আবার শোনে, গিরি বুঝতে পারে ও ভান করে আছে। তার বাল্য ও কৈশোরের দুঃখ দুর্দশার গল্প বহুবার বলেছে এবং দেখেছে প্রত্যেকবারই রুনুর চোখ ছলছল করে ওঠে।
একটা মৃতদেহকে পোড়ানোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। ওরা রাস্তা থেকেই দেখছিল। অল্পই বয়স বউটির। সিঁথিতে কেউ উপুড় করে দিয়েছিল সিঁদুর কৌটো। লাল বেনারসিতে ঢাকা। পা দুটি আলতায় লাল। রুনু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ”বউটা যেন দোল খেলেছে। এমন লাল আমি দেখিনি।”
”মোহনের আঁচিলটা দ্যাখোনি?”
কেন হঠাৎ মোহনের কথা তার মনে এসেছিল! রুনু হাসবার চেষ্টা করে বলেছিল, ”আমিও যেন এইরকম সিঁথেয় সিঁদুর নিয়ে যেতে পারি।”
”কোথায় যেতে পারো?”
”স্বর্গে।”
”সেখানে তো পাপীরা যেতে পারে না।”
রুনু আহত চোখে তাকিয়েছিল। গিরি দ্রুত বলে, ”মানুষ মাত্রেই পাপ করেছে। নিশ্চয় কখনও নিজের অজান্তে করেছে।”
”আমি কখনও করিনি। আর অজান্তে পাপ করলে কোনও দোষ হয় না।”
রুনু গম্ভীর হয়ে গিরির পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। ক্রাচের খটখট শব্দটা যখন দু’জনের নৈঃশব্দ্যের মাঝে অসহ্য হয়ে উঠল তখন গিরি বলেছিল, ”সিঁদুর পরো বটে কিন্তু আমাদের বিয়ে এখনও হয়নি।”
রেললাইনের ধারে, কুমোরটুলির দিকে মোড় ফেরার রাস্তাটায় যে মৃদু মলিন আলো, তার দ্বারা গিরি দেখেছিল, রুনুর চোখ বিস্ময়ে ভরে গেল যেন তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।
”কেন?”
”কী কেন!”
”বিয়ের কথা তুললে কেন। বিয়ে করা বউ কি স্বামীকে ত্যাগ করে না?”
”ও-কথা তো আমি বলিনি।”
”আমার মনে হল, তুমি বোধহয় এইরকম কিছু একটা ভাবছ।”
”রুনু, আমি তোমায় ভালোবাসি।”
”আমিও।”
রুনু আলতো করে তার বাহুতে হাত রাখল। গিরি মুখ নামিয়ে বলল, ‘পাপের কথাটা এমনিই বলেছি। কিছু মনে কোরো না।”
”না, মনে করিনি। এ-ভাবে আমি কিছু ভাবি না। তবে মনে হচ্ছে তুমি যেন অসুখী।”
সেই মুহূর্তে দারোয়ানের সামনে দিয়ে লোহাটা নিয়ে বেরিয়ে আসার মতো বহুকাল আগের আতঙ্কটা তাকে পেয়ে বসেছিল কেন? ছোটোখাটো সাংসারিক কাজ আর সারাদিন বারান্দায় নয়তো খাটে বসে অপেক্ষা করা রুনুর ফেরার জন্য। অজস্র রকমের চিন্তা তখন তাকে ছেঁকে ধরে। চিন্তা করার জন্য তার সময়ও অজস্র। হয়তো তার স্নায়ুগুলো অত্যধিক চিন্তায় দুমড়ে গেছে বলেই আতঙ্কটা হয়েছিল।
”তুমি কাছে থাকলে আমি অসুখী বোধ করি না।”
”আর যখন কাছে থাকি না?”
”তখন অপেক্ষা করতে করতে ভাবি, কখন তুমি ফিরবে।”
”অজান্তে তোমাকে কি কখনও ব্যথা দিয়েছি?”
”না।”
মোহনকে ধীরে ধীরে দু’হাত দিয়ে নিজের গাল চেপে ধরতে দেখে এই মুহূর্তে গিরির মনে হল, এই লোকটা জীবনে কখনও সুখী হবে না। যেমন কোনও কোনও লোককে দেখে বলে দেওয়া যায়, তার মনের মধ্যে কোনও কুটুরি আছে কি না, প্রবল অশান্তি ঘটলেই যেখানে সে পালিয়ে যেতে পারে। মোহনকে দেখে মনে হচ্ছে, পালাবার পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
”আংটিতে ওটা কী? নতুন মনে হচ্ছে।”
”গোমেদ।”
”এইসবে তার বিশ্বাস এখনও গেল না।”
”অবিশ্বাসেরই বা কারণ কী! রত্ন ধারণ করে অনেকেরই তো অনেক কিছু হয়েছে।”
