ঘরের চাবি থাকে রুনুর কাছে। অথচ এক-একদিন অম্বর দুপুরেই ফিরে এসে তালা খুলে ঘুমোয়। চাবি কি আর একটা আছে নাকি, রুনুর অফিসে গিয়ে চাবিটা আনে? হয়তো একটাই চাবি। রুনুর সঙ্গে গল্প করতে, সান্নিধ্য পেতে চাবি আনার ছুতো করে যায়। কিন্তু অফিসে কাজ করার মধ্যে গল্প করতে কি দেবে? রুনু বলেছিল, ওদের বসার জায়গা নতুন করে সাজানো হয়েছে। ওর টেবিলের মুখোমুখি নতুন ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্টের টেবিল। গম্ভীর ছোকরা। মেয়েদের প্রতি একটু বেশি কড়া।
হয়তো ক্যান্টিনে বসে ওরা কথা বলে। কিন্তু কতক্ষণ বসতে পারে? এখন নাকি ঘড়ি ধরে টিফিনে যাওয়া-আসার সময় রাখছে ডেপুটি ছোকরা। এমনকী ইউনিয়নের ছোটোখাটো ডিলাররাও হুট হুট সিট ছেড়ে ঘোরাঘুরি বন্ধ করেছে।
কিংবা এ-সব কিছুই হয়নি। আগের মতোই লামসডেন অ্যান্ড মেহরোত্রা অফিস চিৎকার, ঝগড়া, খিস্তিতে ভরা আছে। অম্বর গেলেই রুনু উঠে পড়ে। পাশের চেয়ারে ওর বন্ধু সবিতাকে হয়তো বলে যায়- ”কেউ খুঁজলে বলিস, ওষুধ কিনতে বেরিয়েছি।” রুনু একদিন অফিসের গল্প করতে করতে বলেছিল, ”সবিতার বয়-ফ্রেন্ড এলেই ওরা অফিস থেকে বেরিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। আর আমাকে তখন সামলাতে হয় ওর কাজের ঝামেলাগুলো।”
রুনু যে ওইভাবে অফিস থেকে বেরোয় না বা বেরোবার কোনও উপায় নেই এটা বোঝাবার জন্যই হয়তো নতুন করে সাজানো বসার ব্যবস্থার, নতুন এক কড়া ছোকরা উপরওলার গল্প বানিয়ে বলেছে।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে উঁচু ফ্ল্যাট বাড়িটার গা ঘেঁষে সূর্য এবার উঠে এসেছে। রোদ্দুরটা মুখে এসে লাগছে গিরির। কাল রাতে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙেছে, যা কখনও আগে হত না। হাতটা সন্তর্পণে এগিয়ে দিয়ে দেখেছে রুনু বিছানায় আছে কি না। বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনার জন্য কান খাড়া করে থেকেছে।
চোখ জ্বালা করছে গিরির। খানিকটা ঘুমোলে চোখ দুটো ঠিক হয়ে যাবে। ওঠার জন্য সে হাত বাড়াল দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা ক্রাচ দুটোর দিকে। সেই সময় তার নজরে পড়ল মোহন স্কুটারে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে অঘোর ঘোষ স্ট্রিটে ঢুকছে।
ক্রাচ দুটো বগলে লাগিয়ে গিরি উঠে দাঁড়াল। মোহন মুখ তুলে তাকে দেখে হাসল। ফুটপাথ ঘেঁষে স্কুটারটা থামাল।
গিরি ঝুঁকে চিৎকার করে বলল, ”রাস্তায় রাখিসনি, ফুটে তুলে দেয়াল ঘেঁষে রাখ। ছেলেরা এখুনি বল খেলা শুরু করবে।”
দুই
অম্বর বেরিয়ে যাবার পর দরজা বন্ধ করেনি রুনু। পাল্লা দুটো খুলে গিরি অপেক্ষা করতে লাগল।
পাশের ফ্ল্যাট থেকে ঝগড়ার শব্দ আসছে। প্রায়দিন সকালেই বউটির সঙ্গে স্বামীর কথা কাটাকাটি মিনিট দুয়ের মধ্যেই চিৎকারে পৌঁছয়। সাত বছরের দম্পতি ওরা। লোকটি দু’চারবার জোরে কথা বলেই নীরব হয়ে যায়। বউ একদা তার ছাত্রী ছিল। বয়সের পার্থক্য কুড়ি বছরের। লোকটি অঙ্কের অধ্যাপক, প্রচণ্ড নেশা কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলার।
চারতলা থেকে, টাক মাথা গম্ভীর দত্তবাবু বাজারের থলি হাতে নামতে নামতে শুকনো হাসল গিরিকে দেখে। পালটা হাসল গিরি। লোকটির বিধবা বোনের মাথার গোলমাল আছে।
মোহন উঠতে দেরি করছে।
”দাঁড়িয়ে যে, কেউ আসছে নাকি?”
রুনু উনুনে কয়লা সাজাচ্ছে কলঘরের গলিতে। গিরি অস্পষ্ট স্বরে বলল, ”মোহন আসছে।”
”অনেকদিন পর।”
সে তাকাল না রুনুর দিকে। সিঁড়িতে পায়ের শব্দটা উঠে আসছে। খুবই ধীরে, অসুস্থ মানুষের পদক্ষেপের মতো শব্দগুলো সময় নিচ্ছে। মোহন আসছে প্রায় তিন মাস পর।
মাথার সামনের চুল উঠে গিয়ে অর্ধেক খুলি মসৃণ বাদামি। বাকি চুল ঘন কালো। কপালটা উঁচু এবং গড়ানে। রগ থেকে কেঁচোর মতো একটা শিরা কানের উপরে পড়ে। সিঁড়ির বাঁকটায় মোহন দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। গিরি শুধু দেখতে পাচ্ছে মাথাটুকু।
নীল বুশ শার্টের দু’ধারে শীর্ণ ফ্যাকাশে দুটি হাত ঝুলছে। চোয়ালের নীচে প্রবাল রঙের আঁচিল। গিরি ইউনিভার্সালে প্রথম যখন মোহনকে দেখে সর্বাগ্রে আঁচিলটাতেই চোখ পড়ে। এত ঝকঝকে, নিটোল এবং এমন লাল আঁচিল কখনও সে দেখেনি। ষোলো-সতেরো বছরে ওটা এখন প্রায় বৈঁচির আকার পেয়েছে। ওর হাতে সিগারেট তামাকের কৌটো। গিরি দরজা থেকে সরে দাঁড়াল পথ ছেড়ে দিয়ে।
”কী রে, এত সকালেই এদিকে?”
মোহন বেলেঘাটায় থাকে। বউ এবং দুটি ছেলেমেয়ে নিয়ে। ইউনিভার্সালে সে সিনিয়ার ফোরম্যান ছিল। মোহনই বলেছিল অ্যাকসেলের টুকরোটা কোটের মধ্যে লুকিয়ে নিতে। প্রতিদিনই টুকটাক যন্ত্রপাতি মোহন এইভাবে নিয়ে বেরিয়ে যেত। বছর বারো আগে সে ইউনিভার্সাল ছেড়ে একটা রিপেয়ারিং গ্যারেজ খোলে। ধীরে ধীরে সেটা বড়ো করে তুলেছে। এখন এন্টালিতেও ছোটোখাটো একটা কারখানা খুলেছে দুটো লেদ মেশিন নিয়ে। সল্ট লেকে পাঁচ কাঠার প্লট কিনেছে।
মোহন প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে রুনুকে লক্ষ করে বলল, ”এক গ্লাস জল দাও রুনু, তারপর চা।”
ঘরে এসে মোহন লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল চটি পরা পা দুটো খাটের বাইরে রেখে। চটির তলায় ধুলোর চিহ্ন দেখতে পেল না গিরি। নানা সময়ে ব্যবহারের জন্য মোহনের নানারকম জুতো আর চটি। এইটাই ওর বাবুয়ানি।
গিরি মোড়াটায় বসে ক্রাচ দুটো খাটের উপর শুইয়ে রাখল। বাঁ পা টান করে সামনে ছড়িয়ে আবার গুটিয়ে নিল।
