”নেতাজি সুভাষ রোডে রুনুর অফিস লামসডেন অ্যান্ড মেহরোত্রা। দোতলায়, সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডান দিকে হলঘর, পূর্বে ঠিক জানলা ঘেঁষে। ওর টেবিলে আরও দু’জন মেয়ে একজন পুরুষ বসে। রুনু বিশ্বাস বললেই যে-কেউ দেখিয়ে দেবে। ওখানে দেখা করাটাই সুবিধে। তোমার অফিসের কাছেই হবে।”
”খুব কাছে। অফিসটা আমি চিনিও। বউদিকে খুঁজে নিতে কিছু অসুবিধে হবে না। অম্বর বিশ্বাস হাজির হলে চার-পাঁচজন তো এগিয়ে আসবেই।”
অম্বরের বড় দাঁত দুটো হাসিতে বেরিয়ে এল। গিরির তখন মনে হয়েছিল তাদের বংশে এত বড় দাঁতওলা আর কেউ নেই। রুনু দেড়শো টাকা চেয়েছিল, অম্বর এককথাতেই রাজি হয়ে যায়।
”হলেই বা জ্ঞাতি ভাই, অম্বর বাইরেরই লোক। ওদের সঙ্গে আমাদের কোনওকালে সদ্ভাব ছিল না। ওর বাবা অত্যন্ত মামলাবাজ ছিল। তার জন্যই আমাদের সব গেছে, মানে, আমরা সম্পত্তি বিক্রি করে পাট চুকিয়ে পরানহাটি থেকে চলে আসি। তারপর থেকে বছর তিরিশ কোনও সম্পর্ক নেই। শুধু ওই পিসিমা ছাড়া আমার যে আর কেউ আছে-”
গিরি থেমে গেল। তার রুনু আছে। বস্তুত পৃথিবীতে একমাত্র রুনুই আছে। গত পনেরো বছর ধরে একমাত্র তার কাছেই সে নিরাপদ বোধ করে। জীবনের সঙ্গে তার যোগাযোগের নিকটতম সূত্র।
রুনু অপেক্ষা করছে বাকি কথাটা সম্পূর্ণ হবার জন্য। গিরি সেটা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে হেসে বলল।
”পরশু গরমের কথা বলছিল?”
”ওর ঘরটায় হাওয়া তেমন ঢোকে না।”
দুটো ঘরে পাখা নেই। তিনতলায় পুব খোলা ঘরে গ্রীষ্মে যতটুকু হাওয়া আসে তাতে ওরা প্রয়োজন বোধ করেনি পাখার। কখনও কখনও গুমোট পড়ে। দরদর ঘাম ঝরে। ঘরের আলো নিভিয়ে অন্ধকার বারান্দায় গিরি খালি গায়ে বসে। রুনু মাদুর পেতে শোয় ব্রেশিয়ারের উপর আঁচল মেলে। কিন্তু গুমোট যখন দিনে হয় এবং প্রায়ই হয়, তোয়ালে ভিজিয়ে গায় জড়িয়ে থেকে ফ্যাকাশে হয়ে যায় চামড়া। দিনের অনেকটাই অন্তত আট ঘণ্টা রুনু বাইরে থাকে, যে-সময় দিনের তাপ সর্বাধিক। ওদের অফিস এয়ারকন্ডিশনড।
”তা হলে একটা পাখা কিনুক, কিংবা ভাড়া নিক। আমার মনে হয় ভাড়া নেওয়াই উচিত।”
”আমিও তাই বলেছি।”
বলা তা হলে হয়ে গেছে। গিরি মুখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। ছুটির দিন সকালে বাস স্টপে ভিড়টা বেশি হয়। এখনও তেমন হয়নি। সপরিবার যাত্রীই বেশি দেখা যায়। সামনের রাস্তাটায় আজ বয়স্ক ছেলেরা রবারের বল খেলতে শুরু করবে দশটা-সাড়ে দশটা থেকে। ওদের মধ্যে দু’-চারজন চাকুরে, বিবাহিতও থাকে। প্যান্ট গুটিয়ে একদিন অম্বরকে ওদের সঙ্গে খেলতে দেখেছে গিরি। তাতে ওরা যেন সম্মানিত বোধ করছিল। পাশের ফ্ল্যাটে তাসের আড্ডা বসবে, চলবে সারা দুপুর।
রুনু বারান্দায় নেই। ঘরে বালিশ চাপড়ানোর শব্দ হচ্ছে। বিছানা ঠিক করছে। এরপর ঘর ঝাঁট দেবে। তারপর পাশের ঘরে যাবে। গিরি অন্যদিনের মতো আজও ফুলঝাড়ুর মসৃণ খসখসানি শোনার জন্য কান পেতে রইল।
”কাগে এ এ জ।”
রাস্তা থেকে কাগজওলার চিৎকার শুনেই গিরির মাথার উপরের বারান্দায় পায়ের শব্দ হল।
দড়ি বাঁধা পাকানো কাগজটা তার চোখের সামনে দিয়ে উড়ে চারতলায় বারান্দায় পড়বে। নিখুঁত টিপ লোকটার। কবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে, কাগজটা আবার নীচে পড়ে যাবে, গিরি প্রত্যেকবার সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করে। একদিনও পড়েনি।
কাগজটা ফুড়ুত করে লম্বাভাবে উড়ে গেল। গিরি উপর দিকে তাকাল। এইবার একটা কাড়াকাড়ির শব্দ হবে। তারপর গম্ভীর গলায় ধমক। সব শান্ত। রুনু খবরের কাগজ পড়ে না। অম্বর শুধু খেলার পাতাটুকু দেখে এবং সে-জন্য তার কাগজ কেনার দরকার হয় না। ডিটেকটিভ আর সিনেমা মাসিক পত্রিকা প্রায়ই আনে। রুনুর হাতে একবার সে ডিকেটটিভ পত্রিকা দেখেছে। গিরি কোনওরকম আগ্রহ বোধ করে না খবর জানার জন্য। তার কাছে কাগজ পড়ার অর্থ অযথা ঝামেলা বাড়ানো।
পাশের ঘরে শব্দ বন্ধ হল। কয়েক মাস আগেও শব্দের প্রতি গিরির আকর্ষণ এত বেশি ছিল না। আগের থেকে অনেক বেশি জোরে সে এখন শুনতে পায়। সামনের বাড়ির ছেলে দুটো মার খেয়ে যখন চেঁচায় তখন তার কানে যন্ত্রণা শুরু হয়। রুনু এখন কী করছে? ফুটবলারের ঘরে হয়তো এক ধরনের কঠিন ঘেমো আঁশটে গন্ধ থাকে। অনেকক্ষণ ধরেই ও-ঘরে রয়েছে। রুনুর কি ভালো লাগে এই গন্ধ? ইউনিভার্সাল থেকে ফেরার পর এক-একদিন রুনু বলত, ”ঘরে ঢুকলেই কেমন একটা গন্ধও তোমার সঙ্গে ঘরে আসে।”
”কেন খারাপ গন্ধ?” গিরি উদ্বিগ্ন স্বরে খোঁজ করেছিল। ”ভালো করে সাবান ঘষে চান করে, তবেই বেরিয়েছি।”
”গন্ধটা বেশ লাগে আমার।”
ফুটবলারের গায়ে, জামা-প্যান্টে নিশ্চয় পেট্রল, ডিজেল, মোবিল অয়েল বা গ্রিজের গন্ধ নেই। একদিন অম্বরের গেঞ্জি সে শুঁকে দেখেছে। পাউডারের গন্ধের সঙ্গে শুকনো বাসি ঘামের গন্ধ ছাড়া আর কিছু গিরি পায়নি।
কিংবা সিনেমা পত্রিকার ছবি দেখছে। স্টিলের ছোটো টেবিলটায় অনেকগুলো পত্রিকা আছে। সকালে রুনু যখন ঘরটা পরিষ্কার করে তখন খোলা দরজার সামনে দিয়ে গিরি যাতায়াত করে এক পলক দেখেছিল ট্রানজিস্টর রেডিয়োটা বিছানায়, দেয়ালে কাগজ আঁটা তার উপরে হ্যাঙ্গারে দুটো প্যান্ট ঝুলছে, টেবিলে অনেক রকমের শিশি, পেস্টের টিউব, আয়না এবং রঙিন ছবির মলাট দেওয়া পত্রিকা। খাটের নীচে পুরনো একজোড়া বুট। দরজার পাশের দেয়ালের দিকে কী আছে সে জানে না। ওদিকে একটা দেয়াল-তাকও আছে।
