”কী ব্যাপার ফিরে আসছে যে! কিছু ভুলে গেছে বোধ হয়। যা ভুলো মন।”
গিরি শেষ বাক্যটির সুরে যেন খানিকটা স্নেহের আভাস পেল।
”রোববারও ওদের প্র্যাকটিস থাকে নাকি?”
”সোমবারে বন্ধ থাকে।”
গিরি তা জানে। অম্বরের প্রতিদিনের গতিবিধি, অবশ্য ফ্ল্যাটে বসে যতটুকু জানা সম্ভব, গিরির তা মুখস্থ। তবু সে জিজ্ঞাসা করেছিল অম্বরকে কথার মধ্যে ধরে রেখে রুনুর অভিব্যক্তি বা কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করে দেখতে।
”বউদি থলিটা।”
রাস্তা থেকে অম্বর চেঁচাল। চেয়ারে বসে গিরি রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে ওকে দেখতে পাচ্ছে না। রুনু ঝুঁকে নীচে তাকিয়ে হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলল।
”থলি কী জন্য?”
কথার উত্তর না দিয়ে রুনু ভিতরে ছুটে গেল। লঘু পদক্ষেপ, কোনও শব্দ হল না। অল্পবয়সি মেয়েদের মতো। গিরি সামনের বাড়ির দিকে তাকাল। জানলাটার পাল্লা এখনও বন্ধ। রবিবারে লোকটি ছেলেদের পড়ায় না।
বাজারের থলিটা পাকিয়ে ধরে বারান্দা থেকে রুনু ঝুঁকেছে।
”পারবে?”
হাত থেকে ছেড়ে দিল। তিন-চার সেকেন্ড পর উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখ। অম্বর তা হলে থলিটা লুফেছে।
”কী হবে থলি?”
”আজ আর তোমায় বাজার যেতে হবে না। ফেরার পথে অম্বর মুরগি আনবে নিউ মার্কেট থেকে।”
”কেন?”
”বলল আনব। হোটেল-ফোটেলে তো প্রায়ই খায়। খেয়াল হয়েছে আমার রান্না মুরগি খাবে আজ।”
”তুমি নিশ্চয় রাঁধার কথাটা তুলেছ। নিশ্চয় বলেছ, হোটেলের থেকে ভালো রান্না করি।”
”আমি!” রুনু অবাক হল। ”আমি তো মুরগি একদমই ভালোবাসি না, খাওয়ার কথা ভাবলেই কেমন যেন লাগে।”
”তা হলে বারণ করলে না কেন। কে খাবে?”
”তোমরা দু’জন খেয়ো।”
”ওর খরচ করার কথা নয়। এ-সব বাড়তি বাজার কেন করবে? যা টাকা দেয়, আমরা যা দিতে পারি, তার বেশি আমরা চাইও না, দিতেও পারব না।”
”এগুলো শখের ব্যাপার, এর সঙ্গে হিসেব নিকেশের সম্পর্ক কী?”
রুনুর কণ্ঠে ক্ষোভ এবং কিছুটা বিরক্তির আভাস পেয়ে গিরি আপসকারীর সুরে কথা বলার ভঙ্গি বদলাল।
”আমি তো বারণ করছি না। আসলে কেমন যেন লাগে ও খরচ করলে। ও সংসারের কেউ নয়, নিছকই পেয়িং গেস্ট। মাসে মাসে দেড়শো টাকা যেমন দেয় তেমনিভাবেই খাবে থাকবে। তার বেশি আমাদের কিছু নেওয়া উচিত নয়।”
”কিন্তু কিছু আনলে তখন তো মুখের উপর না বলা যায় না। ও তো তোমার দূর সম্পর্কের ভাই।”
গিরির বাবার খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে অম্বর। ওকে সে কখনও দেখেনি, চিনতও না। মাস ছয়েক আগে গত পুজোর ঠিক পর, মানিকতলায় পিসিমার বাড়িতে বিজয়া করতে গিয়ে গিরির সঙ্গে পরিচয় হয় অম্বরের। মেসে থাকে কিন্তু থাকতে ভালো লাগছে না। তার গোটা একটা ঘর চাই। গ্রামের বাড়ি হাসনাবাদের থেকে চার মাইল ভিতরে। সেখান থেকে কলকাতায় এসে খেলা এবং চাকরি সম্ভব নয়।
”গিরি তোর তো ঘর আছে একটা। অম্বরকে রাখ না। তোর সংসারেই খাবে, মাসে মাসে টাকা দেবে। অসুবিধে কী, তোরা তো মোটে দুটো লোক।”
.
পিসিমার প্রস্তাবটা গিরির কাছে ভালোই লাগে। টাকার বিশেষ দরকার। রুনুর মাইনেতে চলে না, চালিয়ে নিতে হয়। জিনিসের দাম অসম্ভব গতিতে চড়ছে। আয় বাড়াবার এই সুযোগ অপ্রত্যাশিত মনে হল তার কাছে।
সতর্কভাবে সে বলে, ”ঘরটা দেওয়া যায় বটে কিন্তু খাওয়াদাওয়ার তো অসুবিধে হবে। রুনু ন’টায় অফিসে বেরোয়, রান্না কিছুই হয় না। অফিস ক্যান্টিনেই ভাত খেয়ে নেয়। আমি নিজে যা-হোক রান্না করে খাই। রাত্রেও আমাদের-”
”ও আপনি কিছু ভাববেন না দাদা।” অম্বর হাত তুলে গিরিকে থামিয়ে দেয়। ”আমারও বাইরে বাইরেই বেশির ভাগ দিন খাওয়াটা হয়।”
গিরির মনে হয়েছিল চৌকো মুখ কৃষ্ণবর্ণ, স্কুল ফাইনাল পাশ তার এই জ্ঞাতি ভাইটি কিঞ্চিৎ চপল, ছটফটে অমার্জিত। দু’-তিন মিনিটের বেশি এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না। সামনের দুটি উঁচু দাঁত, কালো পুরু ঠোঁট, ব্রনের দাগে ভরা গাল, কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত ফুলে থাকা শিরার শাখা প্রশাখা এই সবের মধ্য দিয়ে বৃষ্টিভেজা বুনো ঝোপের গন্ধের মতো একটা তাজা অনুভব গিরি পাচ্ছিল।
কলকাতায় ফুটবলে অম্বরের এখন নাম হয়েছে। এটা গিরির কাছে কোনও ব্যাপার না। বছর কুড়ি ফুটবল খেলা দেখেনি। খেলা তার কাছে প্রাগৈতিহাসিক জিনিসে পরিণত হয়েছে।
”রুনুকে একবার জিজ্ঞাসা না করে আমি কিছু বলতে পারছি না।”
”আমি গিয়ে বউদিকে বলব, রাজি না হলে পায়ের ওপর পড়ব। দাদা, আর মেসে বাস করা সম্ভব হচ্ছে না। নানা ঝামেলা, টিকিট-ফিকিট তো আছেই তা ছাড়া রাতে ঘুমোতে পারি না, বড্ড চেঁচামেচি হয়।”
”গিরি উপভোগ করল নাটুকে ভঙ্গিতে হাতজোড় করা অম্বরের কৃত্রিম কাতরতা। মনে মনে সে তখন কিন্তু ভাবছিল, কত টাকা চাওয়া যায়। কত রোজগার করে? এখন ফুটবল খেলে হাজার-হাজার টাকা নাকি পাওয়া যায়। ক্লাব থেকে। তা ছাড়া শ’-চারেক টাকার চাকরি নিশ্চয় করে। ব্যাঙ্কে তো এখন ভালোই মাইনে দেয়, বিয়ে করেনি। বাড়িতে দাদারা ছাড়া কেউ নেই, সেখানে টাকা দিতে হয় না। ঠাকুর্দার আমলে সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় ধান জমি আর বিলগুলো ওরাই নিয়েছিল।
রুনুর সঙ্গেই বরং কথা বলুক। সম্পর্কিত ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চাওয়ার ব্যাপারে গিরি সংকোচ বোধ করেছিল। শ’খানেক টাকা হয়তো দিতে পারবে, তাই বা মন্দ কী। রুনুকে তাই বলে দেব।
