সেই মুহূর্তের আতঙ্কটা গিরির মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। তখন বুকের মধ্যে ড্রাম বাজানো মতো, ক্ষীণ গুড়গুড় শব্দ ওঠে। কিছুক্ষণের জন্য তার মনে হয়, কারা বোধ হয় সদলবলে আসছে। তারা হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ইউনিভার্সালের ম্যানেজার প্রকাশ মেহরার সামনে তাকে দাঁড় করাবে। মেহরা তোবড়ানো গাল দুটো আরও চুবড়িয়ে বলবে, ”আপনাকে তো অনেস্টম্যান বলেই জানতাম।” ইদানীং এইরকমই তার মনে হয় এবং অদ্ভুত একটা অস্বস্তিতে সে গুম হয়ে ওঠে। বাচ্চচাদের মতো অসহায় বোধ করে। লোহাটাকে চোখের আড়াল করার জন্য মাসখানেক রান্নাঘরের তাকে তুলে রেখেছিল। তাতে কোনও কাজ হয়নি।
.”চা অত বেশি খাও কেন, উঁউ? খুব খারাপ।”
রুনুর বলার ধরনটায় গিরি আবার অস্বস্তি বোধ করল। চা তৈরি হয়ে গেছে। ওরা তা হলে এখন টেবিলে। রুনু দাঁড়িয়ে থাকবে ওর অভ্যাস মতো। নাভিটা টেবিলের কিনারে চেপে দাঁড়ায়। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে কি? কীভাবে তাকাচ্ছে? কাপটা এগিয়ে দেবার জন্য ঝুঁকবে, দরকার না থাকলেও ঝুঁকবে; ব্লাউজের গলাটা ঢিলে হয়ে তখন রাক্ষুসে হাঁ করবে আলজিভ দেখিয়ে। অম্বরের চোখ কোথায় থাকবে? তখন কি হাতটা বাড়িয়ে রুনুর হাত বা আর কোথাও-।
রুনুর হাসি শুনতে পেল গিরি। হাত বাড়িয়ে পর্দাটা তুলে সে মাথা হেলাল। কোনও কথা, বা ধ্বনি পেল না। হতাশ হল। সে আশা করেছিল কিছু একটা বুঝতে পারবে। ওরা দু’জন কতটা সম্পর্কিত এটা তার জানা দরকার। না জানা পর্যন্ত সে নিজেকে কোথাও স্থিরভাবে রাখতে পারছে না। ভালোবাসা, ঘৃণা বা দীনতা-এর মধ্যে একটা কোথাও সে বাস করতে চায়।
”তোমার চা।”
গিরি মুখ তুলল। রুনু তার দিকেই তাকিয়ে। গিরির মনে হল চাপা একটা আভা ওর মসৃণ পাতলা কফি রঙের চামড়ার নীচে সারা মুখে ছড়ানো। তাজা ঝরঝরে দেখাচ্ছে, যেন এইমাত্র স্নান করে উঠেছে। নিতম্বচুম্বী দীর্ঘ ভারী চুল হাত-খোঁপা করে ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখছিল আধঘণ্টা আগেও। কিন্তু এখন পিঠে কেন ছড়িয়ে?
গিরি হাত বাড়িয়ে কাপটা ধরল। রুনুর নখে চটা ওঠা লাল রং। টসটসে আঙুলগুলো পুরন্ত কাঁচালঙ্কার মতো। পনেরো-ষোলো বছর আগে এমন ছিল না। তখন গাঁটগুলো উঁচু দেখাত।
”চুলগুলো জটের মতো দেখাচ্ছে।”
রুনু বাঁ হাতে এক গোছা চুল সামনে ধরে বলল, ”আজ শ্যাম্পু করব।”
শ্যাম্পু! গিরি বিস্ময় চাপতে চায়ে চুমুক দিল ঘাড় নিচু করে। সে ভালোভাবেই জানে তাদের সংসারে ও বস্তুটি নেই। তা হলে রুনু বলল কেন? অম্বরের ঘরে কি শ্যাম্পু আছে!
”অনেকদিন পর পরশু তোমাকে বেণি ঝোলাতে দেখলাম।”
রুনু হাসল। ”কেমন দেখাচ্ছিল?”
গিরির মনে হল কণ্ঠস্বরে আগ্রহ নেই। ”কলেজে তুমি এইরকম বেণি ঝুলিয়ে যেতে।”
”কেন, তারপরও তো বেণি কেরছি।”
গিরি মনে করার চেষ্টা করল। সম্ভবত এই ফ্ল্যাটে উঠে আসার পর নয়। হাসপাতালে যখন তাকে দেখতে যেত, তখন বোধ হয় দু’-চারদিন রুনুর বেণি দেখেছে।
”অফিসে কেউ কিছু বলেনি?”
”কী বলবে!”
”ঠাট্টা করেনি, বুড়ো বয়সে বেণি ঝুলিয়েছ বলে?”
রুনু উত্তর দিল না। পাশের ঘরে অম্বর সুর ভাঁজছে। ফিল্মের গান। গিরি কান পেতেই বুঝল এখন সে চুল আঁচড়াচ্ছে।
”দত্তগুপ্তর ব্যাপারটা এখনও চলছে, না মিটে গেছে?”
রুনুর অফিসে অশোক দত্তগুপ্ত নামে একটি ছেলে বিয়ের পরই মরে গেছে। তার বিধবাকে চাকরি দেওয়ার দাবিতে ইউনিয়ন লড়াই করে যাচ্ছে এক মাস ধরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।
”মিটে যাবে। গ্র্যাজুয়েট নয় মেয়েটা, নইলে অ্যাতো ঝামেলা হত না।”
”বউদি দরজাটা বন্ধ করে দিয়ো।”
রুনু ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকিয়ে বলল, ”ভেজিয়ে দিয়ে যাও।”
রাস্তাটা তিরিশ ফুট চওড়া। সামনের বাড়ির জানলা খুলে একটি লোক ওদের দিকে তাকিয়েই একটা পাল্লা বন্ধ করে পিছিয়ে গেল। লোকটি এখন যোগব্যায়াম করবে। তারপর জানলা খুলে দিয়ে দুটি ছেলেকে পড়াতে বসবে এবং মিনিট পাঁচেক পরই জানলা আবার বন্ধ করবে। তখন বন্ধ জানলার ওপার থেকে ছেলে দুটির আর্তনাদ ভেসে আসবে।
অম্বর দ্রুত পায়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিকে চলেছে। টকটকে লাল নাইলনের গোলগলার গেঞ্জি, চামড়াসাঁটা ঘিয়ে প্যান্ট, প্রায় ছ’ফুট লম্বা শরীরটা চাবুকের মতো দেখাচ্ছে চলনের দোলায়। সরু কোমর, দেহটা বিরাট নয়, কিন্তু সর্বত্র মাংস মানানসই হয়ে ছড়ানো। ঘাড় ঢেকে রয়েছে লম্বা রুক্ষ চুলে। অতিরিক্ত চুলের জন্যই ওর শরীরে একমাত্র মাথাটাকে বেঢপ দেখায়। কপালটার আধখানা ঢেকে চুল।
গিরি তীক্ষ্ন চোখে ওর হাঁটা দেখতে লাগল। সপ্তাহ তিনেক ধরে রোজই দেখছে। দেখার জন্য সে ভোর থেকে অপেক্ষা করে। সামনে ঝুঁকে হাঁটছে ছোটো ছোটো দ্রুত পদক্ষেপে। ঊরুর ও পাছার মোড়ের পেশি টেরিলিন প্যান্টে ভাঁজ ফেলছে। পায়ের ডিমের কাঠিন্য আঁটো কাপড়ে ফুটে উঠছে। কোমর সামান্য দোলে কিন্তু হাত দুটি দোলে না হাঁটার সময়।
রুনু অলস চোখে তাকিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে। গিরি শূন্য কাপ ওর হাতে দেবার সময় দেখল মৃদু চাপা একটা হাসি ওর ঠোঁটে। কিছু মজার ব্যাপার মনে পড়লে এরকমভাবে ঠোঁটে সেটা ফুটে ওঠে।
চোখাচোখি হতেই ঠোঁট দুটো চমকে কুঁকড়ে গেল। গিরি ভ্রূ কুঞ্চিত করল।
অম্বর বাস স্টপ থেকে ফিরে আসছে লম্বা পা ফেলে। বারান্দায় রুনুকে দেখে দূর থেকেই হাত তুলে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করল।
