মাঝে মাঝে কথার টুকরো ভেসে আসছে। শব্দগুলো অস্ফুট হয়ে যাচ্ছে পর্দা ভেদ করে আসতে আসতে। ঘাড় ফিরিয়ে গিরি তাকাল। পর্দাটা একটুখানি সরিয়ে দেবার জন্য হাত বাড়িয়ে ঝুঁকেও হাতটা ফিরিয়ে আনল।
”…মোজা জোড়া বড্ড ছেঁড়া… ক’টা লাগে বছরে!”
”এখন চাইলে পাব না, লিগ শুরু হলে…”
”তোমাদের অফিসের ক্যান্টিনে ক’টা থেকে ভাত পাওয়া যায়?… ওখানেই রাখো আমি কেচে দেবখন। রুমাল আর আছে তো?”
”না। তোমারটা…’
গিরি আর কিছু শুনতে পেল না। সম্ভবত ওরা খাবার টেবিলটার দিকে সরে গেছে।
স্থির হয়ে সে বসে রইল; অদ্ভুত ধরনের অস্বস্তি, অস্বাচ্ছন্দ্য সে বোধ করছে, কিন্তু কেন, বুঝতে পারছে না। মনে মনে সে এখন ওদের দু’জনকে অনুসরণ করে যাচ্ছে।
দালানের মতো জায়গাটা প্রায় চৌকো, আয়তনে অনেকখানি। একদিকে জুতোর র্যাক, তার পাশ দিয়ে দেড় গজ চওড়া গলি। লম্বায় পাঁচ গজ। গলিতে আছে পর পর কলঘর ও পায়খানা। জুতোর র্যাকের পিছনে জানলা। পাল্লা খুলেই সিঁড়ির তিনতলার চাতালটা দেখা যায়। মাস দশেক আগে জানলাটার শিক খুলে চোর ঢুকেছিল। গিরি বা রুনু কিছুই টের পায়নি। তার ঘুম গভীর কিন্তু রুনু তো বেড়াল হেঁটে গেলেও জেগে ওঠে। ঘুমের মধ্যে গায়ে হাত লাগামাত্র হাতটা সরিয়ে দেয়। কিন্তু রুনুও শুনতে পায়নি শিক ভাঙার, চোরের বা চোরেদের চলাফেরা, জিনিস নাড়ানাড়ির শব্দ। রুনু নিজেই বহুবার অবাক হয়ে বলেছে, ”আমার এত গভীর ঘুম! অফিসে তো সেদিন খুব বেশি কাজ ছিল না।”
চোর বা চোরেরা বিশেষ কিছুই পায়নি। অ্যালুমিনিয়ামের একটা সসপ্যান, একটা ডেকচি, স্টিলের হাতা আর দড়িতে শুকোতে দেওয়া একটা ভয়েলের শাড়ি। মাস দুয়েক আগে রিডাকশানে শাড়িটা কিনেছিল রুনু ছত্রিশ টাকায়। আসল দাম নাকি আটচল্লিশ। সাদা শাড়ি, এক বিঘৎ নীল নকশার পাড়। ওটা সে লন্ড্রিতে দিত না পাছে জখম হয়। নিজে কেচে ইস্ত্রি করত। ওটার জন্য সে মুষড়ে পড়ে। গিরি কিন্তু অন্য কারণে খুশি হয়ে বলেছিল, ”দেখলে তো, চিনেমাটির প্লেট কত পয়সা বাঁচল। স্টিলের থালা পেলে ঠিক নিয়ে যেত।”
দুটি লোকের জন্য বাসন কয়েকটি মাত্রই যথেষ্ট ছিল। ঝি-চাকর নেই, প্রয়োজনও হয় না। দুটো ঘরের একটি এতকাল অব্যবহৃত বন্ধ ছিল। রান্না, কাপড়কাচা, বাসনধোয়া, ঘরের মেঝে পরিষ্কার গিরিই করত, দুপুরে। রুনু আপত্তি জানিয়েছিল।
”কেউ তো আর দেখতে পাচ্ছে না, ঘরে কী কচ্ছি, না কচ্ছি।”
”তা হোক। পুরুষমানুষের এ-সব কাজ করা মানায় না। লোকে জানলে আমায় কী বলবে? তা ছাড়া উবু হয়ে বসে এ-সব কাজ করায় তোমার যে কষ্ট হয়, আমি তা বুঝতে পারি।”
প্রায় জল এসে গেছল রুনুর চোখে। গিরি আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বাঁ হাত তুলে বলেছিল, ”না না, কষ্ট হয় না। তোমার সামনে একদিন নয় কাপড় কেচে দেখাব।”
”কিচ্ছু দেখাতে হবে না।”
”আচ্ছা আর করব না।”
”বাসন যেমন এঁটো থাকে থাকবে, আমি অফিস থেকে ফিরে মাজব।”
জানলার শিকটা চোর নিয়ে গেছে। ওখান দিয়ে একটা মানুষ গলে আসতে বা বেরোতে পারে। গিরির স্থির বিশ্বাস, আর চোর আসবে না। বাসন বা কাপড় যা আছে সেগুলোর জন্য খাটুনির মজুরি তুলতে পারবে না, এটা নিশ্চয় ওরা জেনে গেছে। গহনা কিছুই নেই একটা সোনার বালা ছাড়া। সেটা রুনুর হাতেই থাকে। ওর হাতঘড়িটা টেবিলের উপর থাকে। সেটা নিতে হলে খাটটাকে ঘুরে মাথার কাছে আসতে হবে। চোরের পক্ষে তা হলে খুবই ঝুঁকি নেওয়া হবে। কাঠের আলমারিতে রুনুর মাইনের টাকা থাকে শাড়ির ভাঁজে। অল্প কিছু থাকে হাত ব্যাগটায়, একটা সিগারেটের তামাকের কৌটোয় রেজগি। সাড়ে চারশো টাকা মাইনের যতটুকু অবশিষ্ট থাকে চোরকে আগ্রহী করার পক্ষে সেটা যথেষ্ট নয়।
রুনুর ধারণা আবার চোর আসবে। তারই পীড়াপীড়িতে গিরি মাপমতো একটা শিক কিনে এনে জানালায় লাগিয়েছে। কোনওরকমে ওপর-নীচে কাঠের গর্তে শিকটাকে ঢুকিয়ে রাখা মাত্র। যে-কেউই খুলে নিতে পারে। তলার গর্তটা বড়ো করে দিয়ে গেছে চোরেরা। গিরি বলেছিল, ”কাঠটা না বদলালে শিক লাগাবার মানে হয় না। কীরকম ঘুণ ধরে ক্ষয়ে গেছে দেখেছ?”
”তা হোক। চট করে কেউ বুঝতে পারবে না। তলাটা নড়নড় করছে, খানিকটা পুডিং দিয়ে এঁটে দিলেই হবে।”
”তা হবে।” শিকটায় ঝাঁকুনি দিয়ে সে কতটা আলগা পরীক্ষা করে।
”এ বাড়ির কেউ কি দেখেছে?”
”দেখেছে মানে!”
”শিকটা যখন লাগাচ্ছিলে, কেউ কি তখন সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করেছে?”
”লক্ষ করিনি, মনে তো হয় না।… ওহ, ওপরের পাগলিটা তখন একবার নেমেছিল বটে। আমাদের তলা পর্যন্ত নামেনি, সিঁড়িতে কী একটা কুড়িয়ে আবার উঠে চলে গেল।”
”আর কেউ?”
”কেন, দেখলেই বা!”
”শিকটা আলগা, এটা বাইরের লোকের না জানাই ভালো।”
গিরির হেসে উঠতে ইচ্ছে করেছিল। কিন্তু তা না করে সে গম্ভীর হয়ে বলে, ”জানালাটা বন্ধই থাকুক। ওর পেছনে এমন একটা কিছু রাখা যাক, পাল্লা খুললেই যাতে সেটা পড়ে গিয়ে শব্দ হবে।”
রুনু ভেবেচন্তে কয়লা ভাঙার লোহাটাকে জানলার চৌকাঠের লাগোয়া ইঞ্চি চারেক জায়গাটায় লম্বালম্বি পাল্লার গায়ে হেলান দিয়ে রেখে দেয়। লোহাটা মোটরগাড়ির অ্যাকসেলের হাতখানেক লম্বা একটা টুকরো। ইউনিভার্সাল মোটর সার্ভিসিং-এর থেকে বছর পনেরো আগে এনেছিল গিরি। ওটাকে দেখলে কখনও কখনও তার অস্বস্তি হয়। চুরি করে আনা জিনিস। ইউনিভার্সালের ফোরম্যান গিরিজাপতি বিশ্বাসকে গেটের দরোয়ানরা তল্লাস করবে না, এই সুযোগ নিয়ে সে কয়লা ভাঙার জন্য লোহাটাকে আনে। শীতকাল ছিল। কোটের মধ্যে ঢুকিয়ে বগলে চেপে সে যখন দরোয়ানটার সামনে পৌঁছয় তখন হঠাৎ একটা চাপা আতঙ্ক তার হৃৎপিণ্ডটাকে আঁকড়ে ধরে। হাতটা কেঁপে ওঠে মনে হয়েছিল ওটা বোধ হয় পড়ে যাবে। লোহাটা প্রাণপণে মুঠোয় ধরে ঘাতকের মতো সন্তর্পণে সে দরোয়ানকে অতিক্রম করে। বহু দূরে এসে অকারণেই পিছনে ফিরে তাকায়।
