অসীম ঘাড় বেঁকিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে বলল, ”আপনাকে কিছু ভাবতে হবে না। সব খরচ আমার।”
”স-অব!”
”দেখুন না, এমন সাজিয়ে নিয়ে যাব যে দেখলে আপনারই মরতে ইচ্ছে করবে।” বিরাট একটা বোঝা নামবার স্বস্তি অসীমের হাসিতে ফুটে উঠল। ডান পা টেনে টেনে সে দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা হল টাকা আনার জন্য। আভাদের জানলার সামনে দিয়ে যাবার সময় তার ইচ্ছা হল একবার উঁকি দিতে। বসবার ঘরটা অন্ধকার। হিরণ্ময়ের শোবার ঘরের জানলার পর্দা পাখার হাওয়ায় ফুলে উঠেছে। অসীম দেখতে পেল হিরণ্ময় পাঞ্জাবি খুলছে। শোভা চুল আঁচড়াচ্ছে। আভাকে দেখতে না পেয়ে সে একটু ক্ষুণ্ণ হল মাত্র।
পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে হিরণ্ময় বলল, ”খালি চিৎকার চেঁচামেচি আর ঝগড়া। তিষ্টোনো যায় নাকি। এর মধ্যে কারুর পড়াশোনা হতে পারে। আভাকে হস্টেলে রাখব ভাবছি।”
এই বলে হিরণ্ময় পকেট থেকে খামের মতো একটি ট্যাবলেটের প্যাকেট বার করল। তাই দেখে শোভা ঠোঁট টিপে হেসে বলল, ”বাব্বা, কতগুলো ছেলেমেয়ে ওই বউটার। মরে রেহাই পেল।”
হিরণ্ময় অস্ফুটে ”রেহাই” শব্দটি উচ্চচারণ করে শোভার থেকে চোখ সরিয়ে হেসে বলল, ”তুমি কিন্তু মোটা হয়ে গেছ।”
”থাক আর নজর দিতে হবে না।” শোভা পিঠ ফিরিয়ে চুল আঁচড়ে চলল।
লঘুস্বরে হিরণ্ময় বলল, ”পাড়ার সেই গম্ভীর ছেলেটিকে একটু আগে দেখলাম, একটা কালো ঢ্যাঙা মেয়ের সঙ্গে বেড়াচ্ছে রাস্তায়।”
.
মনীষাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার পর অনেকক্ষণ পার্কে শুয়ে ছিল দ্বারিক। বাড়িতে ঢোকার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে বলেছিল, ”তাহলে অফিস ছুটির পর আমরা মিট করব অ্যাসেম্বলির দক্ষিণ দিকের গেটে, কেমন?” মানু ঘাড়টা হেলিয়ে দিয়েছিল শুধু। সেই হেলানো মাথাটি বুকে নিয়ে ভোম্বল বহুক্ষণ ঘাসের উপর শুয়েছিল।
অবশেষে বাড়ি ফেরার জন্য পাড়ায় ঢুকে দেখল তাঁতিগলির মুখে একটি খাট রাস্তার উপর। অসীম আর আরও পাঁচ-ছটি ছেলে নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁশ বাঁধছে খাটের সঙ্গে। খাটে একটি শীর্ণ নারীমুখ দেখা যাচ্ছে। দেহটি প্রচুর গোলাপে ঢাকা।
একরাশ গোলাপের গন্ধে দ্বারিকের বুকের মধ্যেটা মোচড় দিয়ে উঠল। টুকরো টুকরো কথায় সে বুঝল ওদের সাহায্যকারী দরকার। অসীমের কাছে গিয়ে সে বলল, ”যদি দরকার হয় তো আমি যেতে পারি তোমাদের সঙ্গে।”
”তাহলে বোঁ করে বাড়ি থেকে একটা গামছা কী তোয়ালে নিয়ে চলে আয়।”
অসীম তুই বলায় দ্বারিক খুব খুশি হল।
ওরা খাটটাকে কাঁধে তোলামাত্র ডুকরে কেঁদে উঠল বড়োমেয়েটি। তাই দেখে শেফালির কোলের বাচ্চচাটিও। ওকে ভোলাবার জন্য শেফালি নাচাতে নাচাতে বলল, ”না না কাঁদে না, ওইতো মা এক্ষুনি আসবে। আমি ধরে নিয়ে আসব মাকে। চুপ করো সোনামণি, কাঁদে না।”
খাট নিয়ে ওরা জয়রাম লেন থেকে তারক কবিরাজ স্ট্রিটে পড়ামাত্র, যে লোকটা টলতে টলতে সামনে দিয়ে আসছিল হঠাৎ কীসের ভয়ে যেন দেয়ালে সেঁটে গেল। ওর পাশ দিয়ে খাটটা অতিক্রম করার সময় উঁচিয়ে দেখল, কে খাটের উপর। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ”যাক, সুকুমার নয় তাহলে।”
দরজায় খিল দেওয়া। অশোক রোজকার মতো খুটখুট করে কড়া নাড়ল। রোজকার মতো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খুলে গিয়ে দরজার পাল্লা ঘেঁষে কেউ একজন দাঁড়াল না। বারকয়েক কড়া নাড়ার পর ইলা এসে খুলে দিল। সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় অশোক বিড়বিড় করল, ”সব সমান, সব সমান।”
এরপর জয়রাম মিত্র লেন নিশুতি হয়ে গেল। শুধু রাধারানি দরজার একটা পাল্লা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে। সে শুধু ভাবছে, আলোর মধ্যে দিয়ে আসতে ওর লজ্জা করবে। হে ভগবান, গলিটাকে অন্ধকার করে দাও, আর একবার অন্ধকার করে দাও।
বারান্দা
বারান্দা – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
কলকাতার বহু পঞ্চাশ বছর বয়েসি বাড়িতে এইরকম বারান্দা পাওয়া যাবে। রাস্তার দিকে হাত চারেক বেরিয়ে, কোমর উঁচু জাফরি কাটা ঢালাই লোহার রেলিং, বারান্দাগুলো প্রতি তলায় থাক দিয়ে উঠে গেছে, মাথায় আচ্ছাদন নেই। উপরের বারান্দা থেকে নীচেরটি সম্পূর্ণ দেখা যায়। রেলিংয়ে বছর কুড়ি রং পড়েনি। তার উপরের কাঠগুলি হাত, কনুই, কাপড়, তোশক, রোদ ও বৃষ্টির ঘষায় মসৃণ। পিছনে সাধারণত দুটি ঘর থাকে, বারান্দা তাদের অন্যতম সংযুক্তকারী পথ। দরজা ছাড়াও ঘরের আয়তন অনুযায়ী একটি বা দুটি জানলা থাকে বারান্দার দিকে। এই সব দরজা-জানালায় পর্দা থাকা না থাকা প্রধানত নির্ভর করে ঘরের বিপরীত গৃহের অধিবাসীদের রুচির ওপর। গ্রীষ্মে, যখন সন্ধ্যায় দক্ষিণ থেকে বাতাস বয়, তখন অনেকেই লোভ সামলাতে না পেরে পর্দাগুলি গুটিয়ে স্প্রিংয়ের দড়িতে বা দরজার মাথায় তুলে দেয়।
তিনতলার বারান্দায়, ভারী সেগুন কাঠের চেয়ারে বসে গিরি, অর্থাৎ গিরিজাপতি জাফরিকাটা রেলিংয়ের ফাঁকা দিয়ে অঘোর ঘোষ স্ট্রিট ধরে পুব দিকে তাকিয়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর প্রায় কুড়ি মিটারের একটা চাকলা, একটা মোটর গ্যারেজের টিনের দরজা, চায়ের দোকানের বেঞ্চ, ফুটপাতে শিবমন্দিরের একদিকের দেয়াল এবং বাস স্টপে প্রতীক্ষমাণদের সে চেয়ারেবসা অবস্থায় দেখতে পায়।
ভোরের রেশ এখনও কাটেনি। ফিকের ছাই থেকে আকাশটার কিছু অংশ ফিকে হলুদ হয়েছে মাত্র। দ্রুত-সাইকেলে খবরের কাগজওলা, কিছু লরি, দুধের বোতল হাতে জনাতিনেক গেরস্থ, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, ভোরের ট্রেন ধরার জন্য সুটকেস নিয়ে বাস স্টপে অপেক্ষমাণ একজনকে ছাড়া গিরি আর কিছু লক্ষ করেনি। কারণ তার মন ও কান রয়েছে পিছনের ঘরে।
