”চাঁদপানা বউ আনব। দেখিস বছর বছর বিয়োবে। আহা, ঘর ভরে উঠবে গো। কচুরমুখী আনতে বলবি তো বউ?”
সেও আঁটকুড়ি থাকবে। পারুল মনে মনে বলল, সেও আমার মতো হবে। মানত, জলপড়া, মাদুলি, হত্যে দেওয়া, যত্তোসব বাজে। ইলার ছেলে হয়েছে-পারুল পাশ ফিরে ভাবল, আমারও হবে।
.অন্ধকারে হিরণ্ময় জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। পর্দা সরানো। রাস্তায় যেন অন্ধকারটা আরও বেশি মনে হচ্ছে তার।
খসখস শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল। কে যেন ঢুকেছে ঘরে! আলমারির পাল্লা খোলার শব্দ হল। চোর? হিরণ্ময় সন্তর্পণে এগোল। একটা টিনের ঢাকনা পড়ার শব্দ হল। নিচু হল যেন কুড়োতে। চিনতে পারল সে।
”কী করছ তুমি?”
”আলমারিটা খোলা ছিল, বন্ধ করতে ভুলে গেছি।” আভার গলার স্বর বিচলিত হয়ে কথাগুলোকে কাঁপিয়ে দিল।
হিরণ্ময় এগিয়ে এসে ওর হাত ধরল।
”দেখি কী নিচ্ছ।”
”কিছু না।”
”মুঠো খোল।”
হিরণ্ময় চেষ্টা করল আভার মুঠো খুলতে। পারল না। আভা টান দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল। আর সঙ্গে সঙ্গে রাগে কেঁপে উঠল হিরণ্ময়। গায়ের জোর বেশি। শুধু এইটুকুর জোরে তাকে অগ্রাহ্য করল। হাতটা পিছনে অনেকখানি তুলে চড় মারার জন্য হিরণ্ময় তৈরি হতেই আভা ঝাঁপিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল।
”আমি রেহাই চাই। হিরণ্ময়, হিরণ্ময় আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি যে তোমাকে ভালোবাসি। কী করব বলে দাও আমায়, দয়া করে বলে দাও।” টপ টপ করে আভার হাত থেকে ঘুমের ট্যাবলেটগুলো মেঝেয় পড়তে থাকল।
”আমি জানি না আভা। সত্যি বলছি, আমি কিছুই জানি না। বেঁচে থাকার কী মরে যাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ এখনও খুঁজে পাইনি।”
আভাকে খাটের উপর বসাল হিরণ্ময়। রাস্তায় কীসের একটা গোলমাল চলছে। আভার থুতনি ধরে ওর মুখটি তুলে হিরণ্ময় নিজের মুখ নামিয়ে এনে বলল, ”এইসব ছোটোখাটো বাজে কারণে মরার কোনো অর্থ হয় না। ভয় নেই, ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি এখন হিমাংশুর কাছে যাব। তুমি এগুলো কুড়িয়ে তুলে রাখো। আর এবার থেকে আমরা সাবধান হব।”
এই বলে হিরণ্ময় পাঞ্জাবি পরতে শুরু করল।
.শেফালির মনে হল কিছু একটা বলতে চাইছে যেন। ঝুঁকে মুখটা নিয়ে গেল মুখের কাছে। শুধু একটা ঘড়ঘড় শব্দ শুনল।
বাচ্চচাটা শোভার কোলে চুপ করে বসে। দু’হাতে আঁকড়ে রয়েছে তার হাত। ইলা গা ঘেঁষে রয়েছে শোভার। ছেলে দুটি মোমবাতি কিনতে গেছে এখনও ফেরেনি।
”জানলাটা খোলা মাত্রই-” ইলা চুপ করে গেল হঠাৎ। শোভা কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরেছে।
”আমার কেমন ভয় করছে।” ইলা আবার বলল, ”দেখেছেন কী ঠান্ডা মেঝেটা। মরা মানুষের গায়ের মতো। যেন একটা মড়ার উপর বসে আছি।”
”চুপ করুন তো।” শোভা চাপা ধমক দিল। সিরসির করে উঠছে তার বগলের দুপাশ। মোমবাতি এলেই চলে যেতে হবে। তার মনে হচ্ছে, আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে অন্ধকার তার গায়ে ঠান্ডা হাত রাখবে।
শেফালি আবার ঝুঁকে পড়ল। ফিসফিস করে বলল, ”আমি আছি, ওদের আমি দেখব, অত ঘাবড়াচ্ছ কেন?” তারপর মাথা তুলে ঘরের সবাইকে শুনিয়ে বলল, ”বোধহয় মারা গেল।”
তাই শুনে কেউ একটা কথাও বলল না।
এগারো
আলো জ্বলে উঠেছে জয়রাম মিত্র লেনে। আকাশি-নীল স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডটা কখন যে চলে গেছে অন্ধকারের মধ্যে কেউ খেয়াল করেনি, বাড়িতে বাড়িতে রেডিয়ো বাজছে, পাখা ঘুরছে। রাস্তা দিয়ে লোক চলছে। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পর স্বাভাবিক হয়ে গেছে পাড়াটা।
সত্যচরণ বালতি হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।-”দেখলে গা, যা বলেছিলুম তাই হল। এখন কাক-চিলে ওই মরা বিড়াল-বাচ্চচা নিয়ে টানাটানি করে পাড়াটা ছয়লাপ করুক!”
ব্যস্ত হয়ে চলেছে শেফালি। এই নিয়ে তিনবার সে তাঁতিগলিতে ঢুকল দু ঘণ্টায়। ওকে দেখে সত্যচরণ বলল, ”কী রে, তখন থেকে দেখছি যাচ্ছিস আর বেরোচ্ছিস।”
”সত্যদা, শ’দুই টাকা না হলে তো মড়া বার করা যাচ্ছে না। দিতে পারো?”
”আমি!” সত্যচরণ এতবড়ো বিস্ময়ের সম্মুখীন জীবনে এই প্রথম হল যেন। ”আমি পাব কোত্থেকে? পাঁচটা টাকাও হাতে নেই।”
”কী যে করি।” শেফালি উৎকণ্ঠা ভোগ করতে করতে বলল, ”অনন্তদার কাছে চাইলে পাব?”
”দ্যাখ চেষ্টা করে।” সত্যচরণ টিউবওয়েলে জোরে জোরে পাম্প শুরু করল। পাঁচশো টাকার মতো লাগবে মেয়েটাকে বালা গড়িয়ে দিতে। মড়া পোড়াবার খরচ জোগাতে গিয়ে আঙুরকে হারানোর মতো বোকামি করতে সে রাজি নয়। হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল সত্যচরণ। আঙুরের মেয়েটার মুখ ভুতি-টুনির মতোই। হুবহু ওদের বোন বলেই মনে হয়।
অনন্ত সিংহ বাড়ি নেই। আহিরিটোলায় শীলেদের বাড়ি গেছে, এখনও ফেরেনি। আলো নিভে যাওয়ায় মেয়ে দেখানো যায়নি। ওরা যাতে আর একবার দেখতে আসে তারই তদ্বির করতে গেছে। ফেরার পথে কুলগুরুর বাড়িতেও যাবে। গোপীনাথের গায়ে বল লাগার ফলে কোনোরকম সর্বনাশ ঘটতে পারে কি না, সে সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আসবে।
শেফালি ফাঁফরে পড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। অসীমকে আসতে দেখে বলল, ”ফ্যালা, ভাই একটা উবগার করবি? শুনেছিস তো বউটা মরে গেছে। লোকটার হাতে দশটা টাকাও নেই, তুই কোথাও থেকে শ দুয়েক টাকা অন্তত যদি জোগাড় করে দিস-”
”কত টাকা?” অসীম হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে গেল।
”দুশো। ঘাট খরচের টাকাটাও অন্তত যদি পাওয়া যায়।”
